আঙুলের গাঁট ফাটালে কি সত্যিই আর্থ্রাইটিস হয়? জানুন গবেষণার ফল
অরিত্রী চন্দ, কলকাতা: ছোট শিশু থেকে মাঝবয়সী মানুষ, অনেকেই আঙুলের গাঁট চেপে ‘পটপট’ শব্দ (Knuckle Cracking) করতে পছন্দ করেন। কেউ এই শব্দটিকে মজার বা স্বস্তিদায়ক…
অরিত্রী চন্দ, কলকাতা: ছোট শিশু থেকে মাঝবয়সী মানুষ, অনেকেই আঙুলের গাঁট চেপে ‘পটপট’ শব্দ (Knuckle Cracking) করতে পছন্দ করেন। কেউ এই শব্দটিকে মজার বা স্বস্তিদায়ক মনে করেন, আবার কেউ দীর্ঘক্ষণ কাজের পর আঙুলের জড়তা কমানোর জন্য অভ্যাসবশত গাঁট ফাটান। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত একটি ধারণা হল, নিয়মিত আঙুলের গাঁট ফাটালে নাকি ভবিষ্যতে আর্থ্রাইটিস হতে পারে।
সত্যিই কি এমনটা হয়? বর্তমান গবেষণা বলছে, সাধারণভাবে আঙুলের গাঁট ফাটানোর সঙ্গে অস্টিওআর্থ্রাইটিস হওয়ার সরাসরি সম্পর্কের প্রমাণ নেই।
গাঁট ফাটালে আসলে কীসের শব্দ হয়?
আঙুলের অস্থিসন্ধির ভিতরে সাইনোভিয়াল ফ্লুইড নামে একটি তরল থাকে। এই তরল অস্থিসন্ধিকে পিচ্ছিল রাখতে এবং হাড়ের মধ্যে মসৃণ নড়াচড়ায় সাহায্য করে।
আঙুল টানলে বা গাঁটের উপর চাপ দিলে অস্থিসন্ধির ভেতরের চাপ দ্রুত পরিবর্তিত হয়। এর ফলে সাইনোভিয়াল ফ্লুইডের মধ্যে সাময়িক গ্যাসীয় গহ্বর তৈরি হওয়ার সঙ্গে এই ‘পপ’ শব্দের সম্পর্ক রয়েছে বলে গবেষণায় দেখা গিয়েছে। এই প্রক্রিয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ক্যাভিটেশন বা ট্রাইবোনিউক্লিয়েশন-এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তবে শব্দটি ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়, তা নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এখনও কিছু প্রশ্ন রয়েছে।
অর্থাৎ, গাঁট ফাটানোর সময় হাড় ভেঙে যাচ্ছে বা অস্থিসন্ধি ক্ষয়ে যাচ্ছে, এমন ধারণা ঠিক নয়।
নিয়মিত গাঁট ফাটালে কি আর্থ্রাইটিস হয়?
এই জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি ভুল ধারণা রয়েছে। দীর্ঘদিনের অভ্যাসগত গাঁট ফাটানো এবং হাতের অস্টিওআর্থ্রাইটিসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
২১৫ জনের উপর করা একটি গবেষণায় গাঁট ফাটানোর অভ্যাস থাকা এবং না থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে অস্টিওআর্থ্রাইটিসের হার তুলনা করা হয়েছিল। গবেষণায় গাঁট ফাটানোর অভ্যাসের সঙ্গে অস্টিওআর্থ্রাইটিসের উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। এমনকি কত বছর ধরে বা কতবার গাঁট ফাটানো হয়েছে, তার সঙ্গেও অস্টিওআর্থ্রাইটিসের উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক দেখা যায়নি।
আরেকটি চিকিৎসাবিষয়ক পর্যালোচনাতেও দেখা যায়, গাঁট ফাটানো এবং অস্টিওআর্থ্রাইটিসের সম্পর্ক নিয়ে যে গবেষণাগুলি হয়েছে, সেগুলির বেশিরভাগই এমন কোনও নির্ভরযোগ্য সম্পর্ক দেখাতে পারেনি। তাই শুধু নিয়মিত আঙুলের গাঁট ফাটানোর অভ্যাস রয়েছে বলেই ভবিষ্যতে আর্থ্রাইটিস হবে, এমন কথা বলা ঠিক নয়।
তবে অতিরিক্ত জোরে গাঁট ফাটানো কি নিরাপদ?
আঙুলের গাঁট স্বাভাবিকভাবে ফাটানো এবং জোর করে অস্থিসন্ধিকে মুচড়ে বা টেনে শব্দ বের করার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ব্যথা, অস্বস্তি বা অস্বাভাবিক চাপ তৈরি করে বারবার কোনও অস্থিসন্ধি নাড়াচাড়া করা উচিত নয়। বিশেষ করে যদি গাঁট ফাটানোর সময় ব্যথা, ফুলে যাওয়া, অস্থিসন্ধি শক্ত হয়ে যাওয়া, নড়াচড়ায় সমস্যা বা দুর্বলতা দেখা দেয়, তাহলে অভ্যাসটি বন্ধ করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। কারণ গাঁট ফাটানোর শব্দ নিজে আর্থ্রাইটিসের প্রমাণ নয়। কিন্তু কোনও অস্থিসন্ধিতে আগে থেকেই সমস্যা থাকলে সেখানে বারবার জোর প্রয়োগ করা পরিস্থিতিকে আরও অস্বস্তিকর করে তুলতে পারে।
আঙুলের গাঁট আর ঘাড় ফাটানো এক নয়
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, আঙুলের গাঁট ফাটানোর সঙ্গে ঘাড় জোর করে মুচড়ানো বা নাড়াচাড়া করাকে এক করে দেখা উচিত নয়।
ঘাড়ের অস্থিসন্ধিতে জোরালো ম্যানিপুলেশন করলে অস্থিসন্ধি, পেশি ও অন্যান্য টিস্যুর উপর আলাদা ধরনের চাপ পড়তে পারে। তাই শুধু দুই ক্ষেত্রেই ‘পপ’ শব্দ হয় বলে দুটিকে একই ধরনের প্রক্রিয়া মনে করা ঠিক নয়। চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণাতেও জয়েন্ট ম্যানিপুলেশনের সময় হঠাৎ অস্থিসন্ধি আলাদা হওয়ার কারণে পেশি ও লিগামেন্টে দ্রুত চাপ তৈরি হওয়ার বিষয়টি আলাদা করে আলোচনা করা হয়েছে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
শুধু শব্দ হওয়ার কারণে সাধারণত আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে গাঁট ফাটানোর সঙ্গে যদি নিয়মিত ব্যথা, ফোলা, জড়তা, নড়াচড়া কমে যাওয়া বা অস্থিসন্ধির দুর্বলতা থাকে, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ এই উপসর্গগুলির পেছনে আঘাত, প্রদাহ, অস্থিসন্ধির অন্য সমস্যা বা আর্থ্রাইটিসের মতো বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।
তাহলে গাঁট ফাটানো নিয়ে শেষ কথা কী?
আঙুলের গাঁট ফাটানোর অভ্যাস নিয়ে বহুদিন ধরে আর্থ্রাইটিসের ভয় থাকলেও বর্তমান গবেষণায় অভ্যাসগত গাঁট ফাটানোকে হাতের অস্টিওআর্থ্রাইটিসের কারণ হিসেবে প্রমাণ করা যায়নি। তবে গাঁট ফাটানোর সময় ব্যথা হলে বা জোর করে অস্থিসন্ধি মুচড়ানোর প্রয়োজন হলে সেই অভ্যাস এড়ানোই ভালো। আর অস্থিসন্ধিতে ব্যথা বা ফোলা থাকলে শুধু শব্দটিকে দায়ী না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, গাঁট ফাটানোর শব্দ শুনেই অস্থিসন্ধি ক্ষয়ে যাচ্ছে বা আর্থ্রাইটিস হচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।