অন্ধকারে জ্বলছে দু’চোখ! পাহাড়ের ভূত, না ত্রাতা?
যার দেখা পেতে অভিযাত্রী, ফোটোগ্রাফাররা দিনের পর দিন হত্যে দিয়ে পড়ে থাকে, যাকে কেন্দ্র করে অ্যাডভেঞ্চার আর ফটোগ্রাফি ট্যুরিজ়মের আলাদা একটা বিভাগই তৈরি হয়ে গেছে, সে এত অবলীলায় ধরা দিল? টি-হাউসের সান্ধ্য আড্ডায় স্থানীয়রা বলে, শাবোর উৎপাত এখানে নতুন কিছু নয়। মানুষ দেখলে পালায়, কিন্তু ওদের জ্বালায় ভেড়া বকরি চমরি নিয়ে শান্তিতে থাকা দায়। নেপালের এই অঞ্চলে স্নো লেপার্ডদের ডাকনাম শাবো, ভালো নাম হিঁউ চিতুয়া। ‘আমরা তো দেখতে পেলেই…’ মুখ ফসকে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন নেশায় টলতে থাকা একজন। নেপালিতে কিছু বলে তাঁকে চুপ করিয়ে দেন টি-হাউসের দাই। তবু যেন বিভোর হয়ে তিনি বলেই চলেন। যার তর্জমা করলে দাঁড়ায়, পাহাড়ের অশরীরীরা শাবো সেজে ঘুরে বেড়ায়। শিকারের পর শুধু শিকারের রক্তই খায় ওরা, মাংস নয়। রক্ত খেয়ে মাতাল হয়ে আরও শিকার করতে ছোটে। শিকার বলতে এই অঞ্চলের পাহাড়ে দলে দলে ঘুরতে থাকা ভারাল বা ব্লু-শিপ, আর বাঁকানো খাঁজকাটা শিং ওয়ালা পাহাড়ি ছাগল আইবেক্স। মনে পড়ে দু’দিন আগের কথা। বরফে মিলেছিল ওদের থাবার ছাপ। সেই ফেলুদার গল্পের বর্ণনার মতো— ছাপ দেখে মনে হবে বাঘ দু’পায়ে হাঁটে, কারণ চলার সময়ে পিছনের পা-টা সব সময়ে সামনের পায়ের জায়গাতেই পড়ে। শাবোর ক্ষেত্রে পায়ের ছাপগুলোর মাঝখান দিয়ে গতিপথের সমান্তরালে একটা লম্বা দাগ থাকে। ওদের বিশাল লোমশ লেজ লুটিয়ে চলে পিছন পিছন।
এই বিশাল লেজের সঙ্গে গোটা একটা স্নো লেপার্ডকে কোলে তুলে দাঁড়িয়ে আছেন এক ব্যক্তি। ঘুনসার ক্যাফের দেওয়ালে ছবিটা দেখে চমকে ওঠে ওরা। ক্যাপশন বলছে, লেপার্ডটির দেহে প্রাণ নেই। ঘুনসা থেকে আরও উপরে কাংবাচেন গ্রামের বাইরে মিলেছিল দেহটা। ক্যাফের মালিক শেরিং তাশি লামা শেরপাকে জিজ্ঞেস করে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়। এটাই বলছিলেন আগের দিনের ওই মাতাল লোকটি। প্রত্যন্ত নেপালের এই গ্রামগুলোতে আজও পোষ্যরাই মূল সম্পদ। তাই বারবার তাদের উপর হামলা মানে রুটিরুজিতে টান। ফলে শাবোদের সঙ্গে ওদের সম্পর্ক সাপে-নেউলে। মানুষের পাতা ফাঁদে পড়ে, অস্ত্রের কাছে হেরে সংখ্যায় কমতে থাকে শাবোরা। গত কয়েক বছরে আইইউসিএন-এর লাল তালিকায় ‘এনডেঞ্জারড’ থেকে ‘ভালনারেবল’-এ নেমে গেছে ওরা। উষ্ণায়নে হিমবাহ আর বরফ ঢাকা এলাকা কমে বাসস্থান সঙ্কট, চোরাশিকারির দাপট তো রয়েছেই, কমেছে শিকারের সংখ্যাও। পেটের জ্বালায় লোকালয়ে এসে লড়াই লাগছে স্থানীয়দের সঙ্গে।