৩ দিনের সফরে পাহাড়, জঙ্গল ও সমুদ্রের গল্প
পার্থময় চট্টোপাধ্যায়
আমার ভ্রমণের চরম ব্যস্ততা শুরু হয় যখন প্রকৃতিতে শীতের হালকা স্পর্শ নামে। সাধারণত প্রকৃতিপ্রেমীদের ভ্রমণ শুরু হয় কাশফুলের শুভ্রতায়, আর শেষ হয় পলাশের আগুন নিভে গেলে। অর্থাৎ সেপ্টেম্বর থেকে এপ্রিল—এই সময়টাই যেন প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়ার আদর্শ ঋতু।
কালীপুজোর পরের এক রবিবার সন্ধ্যার আড্ডায় হঠাৎ করেই ঠিক হয়ে গেল—চল, তিন দিনের জন্য পাহাড়, জঙ্গল আর সমুদ্র—তিনটিকেই একসঙ্গে দেখে আসা যাক। গন্তব্য ওড়িশার বালাসোর।
শুক্রবার সকালে কলকাতা থেকে আমরা দশজন, দুটি গাড়ি নিয়ে রওনা দিলাম। এনএইচ-১৬ ধরে বাগনান, কোলাঘাট, ডেবরা পেরিয়ে খড়্গপুর শহরকে পাশ কাটিয়ে বোম্বে রোডের তিন রাস্তার মোড়ে একটু চা আর ধূমপানের বিরতি। সকাল সাতটায় গড়িয়াহাট থেকে যাত্রা শুরু করে নয়টার সময় কোলাঘাটে প্রাতরাশ, তারপর ডেবরায় ছোট্ট বিরতি নিয়ে সোজা ওড়িশার পথে। জলেশ্বর পেরিয়ে দুপুর তিনটের দিকে পৌঁছে গেলাম পঞ্চলিঙ্গেশ্বরে। কলকাতা থেকে প্রায় ২৭৭ কিলোমিটার, আর বালাসোর থেকে মাত্র ৩৭ কিলোমিটার দূরে।
না গরম, না ঠান্ডা—প্রকৃতির এক মিষ্টি আবহ আমাদের স্বাগত জানাল।
এক নজরে
-
এক সফরেই পঞ্চলিঙ্গেশ্বর, কুলদিহা ও চাঁদিপুর ঘোরা যায়।
-
পঞ্চলিঙ্গেশ্বরে পাহাড়, ঝরনা ও পাঁচ শিবলিঙ্গ প্রধান আকর্ষণ।
-
কুলদিহা অভয়ারণ্যে জঙ্গল সাফারির সুযোগ রয়েছে।
-
চাঁদিপুরের জোয়ার-ভাটার অনন্য দৃশ্য পর্যটকদের টানে।
-
কলকাতা থেকে সড়ক, ট্রেন ও বাস—সব পথেই যাওয়া সহজ।
আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল ওড়িশা পর্যটন উন্নয়ন নিগমের পান্থনিবাসে। নীলগিরি পাহাড়ের পাদদেশে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই অতিথিশালার অবস্থান সত্যিই মনোমুগ্ধকর। ঘর বড়, বারান্দা সুন্দর, খাবারের মানও ভালো এবং দামও সাধ্যের মধ্যে। তবে কর্মীর সংখ্যা কম হওয়ায় রক্ষণাবেক্ষণে কিছুটা ঘাটতি চোখে পড়ে। তবুও চারপাশের অপরূপ সৌন্দর্য সেই অভাব অনেকটাই ভুলিয়ে দেয়।
পান্থনিবাসের পাঁচিল ঘেঁষেই শুরু হয়েছে নীলগিরি পাহাড়ের সবুজ বিস্তার। খুব কাছেই পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের পবিত্র তীর্থ।
দীর্ঘ পথের ক্লান্তি কাটাতে স্নান সেরে দুপুরের অসাধারণ ভোজন সারলাম। আমরা দুই চালক একটু বিশ্রাম নিলেও বাকি আটজন লনে ছবি তুলতে আর পাহাড়ের দিকে ঘুরে বেড়াতে বেরিয়ে পড়ল।
সন্ধ্যায় লনে এসে বসতেই অন্য এক পরিবেশ। পাহাড়ের গায়ে টিমটিম করে জ্বলতে থাকা আলো দেখে বুঝলাম, এই পাহাড়েও মানুষের বসবাস আছে। দূর থেকে ভেসে আসছে পঞ্চলিঙ্গেশ্বর মন্দিরের ঘণ্টা আর শঙ্খধ্বনি। পান্থনিবাসের বাইরে ছোট্ট এক চায়ের দোকানে পর্যটক আর স্থানীয় আদিবাসীদের ভিড়। চা, গরম চপ আর গল্পে সন্ধ্যাটুকু দারুণ কেটে গেল।
পরদিন ভোরে হালকা শীতের ছোঁয়ায় ঘুম ভাঙল। কিছু না খেয়েই রওনা দিলাম পঞ্চলিঙ্গেশ্বর দর্শনে।
ঝরনার স্রোতের মধ্যে পাথরের ওপর শুয়ে হাত ডুবিয়ে পাঁচটি শিবলিঙ্গ স্পর্শ করার অভিজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। প্রবল জলের স্রোত শরীর ভিজিয়ে দিচ্ছিল, আর মনে হচ্ছিল সমস্ত ক্লান্তি যেন ধুয়ে যাচ্ছে।
আরও একটু ওপরে উঠে একটি সমতল জায়গায় পৌঁছলাম। সেখানে বসেছে আদিবাসীদের ছোট্ট গ্রাম্য মেলা। প্রকৃতির কোলে সেই সরল জীবন যেন অন্য এক পৃথিবীর স্বাদ দিল।
জনশ্রুতি রয়েছে, এই পাঁচটি শিবলিঙ্গ দেবী সীতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নীলগিরি পাহাড়ের বুকে তাই পঞ্চলিঙ্গেশ্বর শুধু একটি ধর্মস্থান নয়—এটি প্রকৃতি, পাহাড়, ঝরনা ও আধ্যাত্মিকতার এক অপূর্ব মিলনক্ষেত্র।
প্রাতরাশ সেরে এবার রওনা দিলাম কুলদিহা জঙ্গলের উদ্দেশে। দূরত্ব মাত্র ১৮ কিলোমিটার হলেও পারমিট সংগ্রহ ও প্রবেশমূল্য দিয়ে সজনগড় হয়ে কুলদিহা অভয়ারণ্যে পৌঁছতে প্রায় দেড় ঘণ্টা লেগে গেল।
নিজের গাড়ি নিয়েই জঙ্গলের ভিতরে প্রবেশ করা যায়। ছবিতে হাতি, বাঘ, হরিণের দেখা মিললেও বাস্তবে আমাদের ভাগ্যে জুটল এক বৃদ্ধ ময়ূর, কয়েকটি হরিণ, কিছু পাখি আর বিশাল এক বাজপাখি।
প্রায় ২৭০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই অভয়ারণ্য সিমলিপালের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ায় এখানে হাতির আনাগোনা যথেষ্ট। থাকার জন্য রয়েছে সুন্দর বনবাংলোও।
আমাদের মধ্যে স্বায়ত চালাচ্ছিল মারুতি রিটজ, আর আমি হোন্ডা সিটি। এখানেই বোঝা গেল গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্সের গুরুত্ব। কাঁচা, মোরাম আর পাথুরে রাস্তা দিয়ে রিটজ অনায়াসে এগিয়ে গেলেও আমার হোন্ডা সিটির নিচে একটি বড় পাথর এমনভাবে আটকে গেল যে গাড়ি আর সামনে-পিছনে নড়ছিল না। রিশিয়া ড্যামের কাছাকাছি গভীর জঙ্গলের মধ্যে সেই মুহূর্তে বেশ চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। অনেক চেষ্টা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে শেষ পর্যন্ত গাড়িটিকে উদ্ধার করতে পেরেছিলাম।
সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরে শরীর আর সায় দিল না। দুপুরে ঠিকমতো খাওয়াও হয়নি। কিছুক্ষণ লনে আড্ডা দিয়ে রাতের খাবার খেয়ে সবাই তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম।

পরদিন ছিল আমাদের এই সফরের শেষ দিন। তাই পাহাড় আর জঙ্গল দেখার পর সমুদ্রকে বাদ দেওয়া যায় না।
সকাল ন’টায় হোটেল থেকে বেরিয়ে ৪৮ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে পৌঁছলাম চাঁদিপুরে।
বঙ্গোপসাগরের তীরে দাঁড়িয়ে আমার সবসময়ই এক অদ্ভুত গর্ব হয়। পশ্চিমবঙ্গ যেমন হিমালয়ের স্পর্শ পেয়েছে, তেমনই পেয়েছে সুন্দরবনের মতো বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য, গঙ্গার পবিত্র ধারা এবং নিজের নামে পরিচিত এক সমুদ্র—বঙ্গোপসাগর।
এই “বে অফ বেঙ্গল” শুধু ভারতের নয়; বাংলাদেশ, মায়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার উপকূলও তার স্পর্শে ধন্য।
বহু বছর পর সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে আবেগে ভেসে যাচ্ছিলাম।
চাঁদিপুর যেন লুকোচুরি খেলতে ভালোবাসে। কখনও জল অনেক দূরে সরে গিয়ে বিশাল বালুচর রেখে যায়, আবার কখনও ধীরে ধীরে ফিরে এসে নিজের রূপ উন্মোচন করে। এই জোয়ার-ভাটার খেলাই চাঁদিপুরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
পূর্ণিমার রাতে রুপালি আলোয় এই বিস্তীর্ণ বালুচরে দাঁড়ালে মনে হয় যেন চাঁদের আলো মাটির বুক জুড়ে বিছিয়ে রয়েছে। যারা কচ্ছের রণ দেখেননি, তারাও এখানে এসে সেই বিস্ময়ের কিছুটা অনুভব করতে পারবেন।
আমরা সৈকতের পাশের একটি হোটেলে দুপুরের খাবারের অর্ডার দিয়ে সমুদ্রের ধারে এসে বসেছিলাম। দেখলাম ধীরে ধীরে জল বাড়ছে। প্রকৃতির এই পরিবর্তন চোখের সামনে দেখা এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। ঘূর্ণিঝড় আইলার ক্ষতচিহ্ন আজও কোথাও কোথাও চাঁদিপুরের শরীরে রয়ে গেছে।
তিন দিনের এই সফরে পাহাড়, জঙ্গল, সমুদ্র আর আমার নয়জন প্রিয় সহযাত্রী—সব মিলিয়ে মনটা ভরে গেল।
চাঁদিপুরে আমাদের রাত কাটানোর গল্প থাক আরেক দিনের জন্য। আজ শেষ রাত পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের কাছে। আগামীকাল আবার একই পথ ধরে ফিরে যাব কলকাতার ব্যস্ত শহুরে জীবনে।
কী ভাবে যাবেন এবং কোথায় থাকবেন?
কলকাতা থেকে বালাসোরে পৌঁছানোর জন্য অসংখ্য ট্রেন রয়েছে। সময় লাগে প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা। এছাড়া রাতের বাসেও ৫ থেকে ৬ ঘণ্টায় পৌঁছে যাওয়া যায়।
চাঁদিপুরে ১,৫০০ টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাজেটের প্রচুর হোটেল রয়েছে। পঞ্চলিঙ্গেশ্বরেও এখন অনেক বেসরকারি হোটেল হয়েছে। তবে পান্থনিবাসের ভাড়া তুলনামূলক কিছুটা বেশি হলেও অবস্থান এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য তা যথেষ্ট আকর্ষণীয়।
FAQ
১. পঞ্চলিঙ্গেশ্বর কোথায় অবস্থিত?
ওড়িশার বালাসোর জেলার নীলগিরি পাহাড়ের পাদদেশে পঞ্চলিঙ্গেশ্বর অবস্থিত।
২. কুলদিহা অভয়ারণ্যে কী কী দেখা যায়?
এখানে জঙ্গল সাফারি, হরিণ, ময়ূর, নানা পাখি এবং ভাগ্য ভালো হলে হাতিরও দেখা মিলতে পারে।
৩. চাঁদিপুর কেন এত জনপ্রিয়?
জোয়ার-ভাটার সময় সমুদ্রের জল অনেক দূরে সরে যায় এবং আবার ধীরে ধীরে ফিরে আসে—এই বিরল প্রাকৃতিক দৃশ্যই চাঁদিপুরের প্রধান আকর্ষণ।
৪. কলকাতা থেকে বালাসোর কীভাবে যাবেন?
ট্রেনে প্রায় ৩–৪ ঘণ্টা এবং বাসে প্রায় ৫–৬ ঘণ্টায় বালাসোর পৌঁছানো যায়। সড়কপথেও যাওয়া যায়।
৫. এই সফরের জন্য কতদিন সময় রাখা উচিত?
পঞ্চলিঙ্গেশ্বর, কুলদিহা এবং চাঁদিপুর ঘুরতে অন্তত ৩ দিন সময় রাখলে আরাম করে ভ্রমণ করা যায়।