‘মোদীর জন্য সতর্কবার্তা’! বাঁকিপুরে জিতেই বিজেপিকে ‘জেন-জি’ খোঁচা PK-র
পাটনা: বিহারের রাজনীতিতে বড়সড় চমক! সোমবার বাঁকিপুর বিধানসভা উপনির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) তিন দশকের দুর্গে ধস নামিয়ে ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে নিলেন ‘জন সুরাজ পার্টি’র…
পাটনা: বিহারের রাজনীতিতে বড়সড় চমক! সোমবার বাঁকিপুর বিধানসভা উপনির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) তিন দশকের দুর্গে ধস নামিয়ে ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে নিলেন ‘জন সুরাজ পার্টি’র প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত কিশোর। বিজেপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে গেরুয়া শিবিরের প্রার্থী নীরজ কুমারকে ১৯ হাজারেরও বেশি ভোটে পরাজিত করেছেন তিনি। এই অভাবনীয় জয়ের পরই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে কড়া বার্তা দিয়ে পিকে জানালেন, এই ফলাফল বিজেপির জন্য একটি “সতর্কবার্তা” বা ওয়েক-আপ কল (Wake-up call)। একইসঙ্গে জানিয়ে দিলেন, বিহারে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও পরিযায়ী সমস্যা রোধের দিকেই তাঁর নজর থাকবে।
জন সুরাজ পার্টির প্রথম বিধায়ক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর প্রশান্ত কিশোর বলেন, “এটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জন্য একটি সতর্কবার্তা। বিহারের এমন একজন মুখ্যমন্ত্রী প্রয়োজন, যিনি শিক্ষার উন্নতি করতে পারবেন, কর্মসংস্থান তৈরি করবেন এবং পরিযায়ী শ্রমিকদের ভিনরাজ্যে যাওয়া বন্ধ করবেন। আমাদের লক্ষ্য শুধুমাত্র চুক্তির জোরে বিধায়ক হওয়া নয়, বরং বিহারের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা।”
জোট-জল্পনা পুরোপুরি খারিজ
ভবিষ্যতে অন্য কোনও প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট বাঁধার সমস্ত জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে প্রশান্ত কিশোর স্পষ্ট জানিয়েছেন, বিহারের রাজনীতিতে জন সুরাজ স্বাধীনভাবেই নিজেদের পথ চলবে। তাঁর কথায়, “আমরা কারও সঙ্গে জোট করব না। আমাদের জোট হবে কেবল বিহারের সাধারণ মানুষের সঙ্গে। আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন, বাঁকিপুরের মানুষ প্রতিষ্ঠিত দলগুলি থেকে মুখ ফিরিয়ে আমাদের ভোট দিয়েছেন।”
তিনি নিজের দলের কর্মীদের পাশাপাশি বিজেপি, কংগ্রেস এবং আরজেডি (RJD)-র বিক্ষুব্ধ সমর্থকদেরও এই জয়ের জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ওই দলগুলির যে সমস্ত সমর্থক নিজেদের দলের অবস্থা নিয়ে অখুশি ছিলেন, তাঁরাও এই নির্বাচনে জন সুরাজকে সমর্থন করেছেন।
তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের প্রসঙ্গে তিনি জানান, ‘জেন জ়ি’ (Gen Z) বিক্ষোভের পরিবেশ হয়তো ফলাফলে কিছুটা প্রভাব ফেলেছে, তবে তরুণরা যে বিপুল সংখ্যায় ভোট দিয়েছেন এমন কোনও প্রমাণ নেই। উল্লেখ্য, ভোটের দিন এই কেন্দ্রে ৩৫ শতাংশেরও কম ভোট পড়েছিল।
মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীর বিরুদ্ধে জনাদেশ
২০২১ সালে রাজনৈতিক পরামর্শদাতার কাজ ছেড়ে জন সুরাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পিকে। তাঁর মতে, বাঁকিপুরের এই রায় আসলে বিহারের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীর বিরুদ্ধে মানুষের জনাদেশ।
“এই জনাদেশ মূলত মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীর বিরুদ্ধে। তাঁর বিরুদ্ধে আমার ব্যক্তিগত কোনও ক্ষোভ নেই, কিন্তু অপরাধমূলক অতীত এবং যোগ্যতার অভাবের কারণে বিহারের শিক্ষিত সমাজ তাঁকে চূড়ান্ত অপছন্দ করে,” তোপ দাগেন কিশোর।
তিনি আরও যুক্তি দেন যে, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কুশওয়াহা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হওয়ার কারণেই যদি চৌধুরীকে রাজ্যের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য বেছে নেওয়া হয়ে থাকে, তবে বিজেপির উচিত ওই একই সম্প্রদায়ের অপেক্ষাকৃত ‘স্বচ্ছ ভাবমূর্তির’ অন্য কোনও নেতাকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করা।
বাঁকিপুর উপনির্বাচন: একটি রাজনৈতিক পালাবদল
১৯৯৫ সাল থেকে বাঁকিপুর আসনটি বিজেপির দখলে ছিল। এই কেন্দ্রের পাঁচ বারের বিধায়ক নীতিন নবীন সম্প্রতি বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি পদে নিযুক্ত হওয়ার পর রাজ্যসভায় নির্বাচিত হন। ফলে আসনটি শূন্য হয়ে যায়। প্রশান্ত কিশোর এই উপনির্বাচনকে বিহারের বিজেপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের উপর একটি “গণভোট” হিসেবেই বর্ণনা করেছিলেন।
বিরোধীদের কটাক্ষ ছিল, জন সুরাজ আসলে বিজেপির ‘বি-টিম’। কিন্তু এই জয়ের ফলে সেই অভিযোগ ভুল প্রমাণিত করে বিহার বিধানসভায় প্রথমবার খাতা খুলল প্রশান্ত কিশোরের দল।
এই ফলাফল তরুণ প্রজন্মের কাছে একটি বড় বার্তা বলে মনে করছেন পিকে। তিনি বলেন, “যে সমস্ত তরুণ রাজনীতিতে আসতে চান, কিন্তু ভাবেন যে বিহারে জাতপাতের শৃঙ্খল ভাঙা সম্ভব নয় বা এখানকার রাজনীতি দুটি প্রধান স্রোতের বাইরে যেতে পারে না, বাঁকিপুরের ফলাফল তাঁদের চোখ খুলে দেবে।”
অন্যদিকে, এই অপ্রত্যাশিত ফলাফলের পর মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী সমাজমাধ্যম এক্স (X)-এ একটি পোস্টে উপনির্বাচনকে “গণতন্ত্রের মহাপর্ব” হিসেবে বর্ণনা করে প্রশান্ত কিশোরকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।