পুখুরিয়ার শব্দতরঙ্গ ঢেউ তোলে ডনের দেশেও
দুর্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, বাঁকুড়া
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে প্রাচীন শিল্প ঐতিহ্যের বড় ভাণ্ডার লালমাটির জেলা বাঁকুড়া। এখানকার বিভিন্ন কুটির শিল্প ও হস্তশিল্প পেয়েছে জিআই (জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন) স্বীকৃতি। সম্প্রতি সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে ‘বেঙ্গল সিঙ্গিং বোল’।
এ হলো কাঁসার তৈরি এক অভিনব ‘পেটাই ধ্বনিপাত্র’, যা দেশে ও বিশ্বের নানা প্রান্তে ব্যবহৃত হয় সাউন্ড থেরাপি ও মেডিটেশনে। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পরে জেলার শতাব্দী প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প জিআই স্বীকৃতি পাওয়ায় খুশির হাওয়া শিল্পী মহলে।
বাঁকুড়া জেলার একাধিক গ্রামে তৈরি হয় এই সিঙ্গিং বোল বা পেটাই ধ্বনিপাত্র। এর আদি ও অন্যতম উৎপাদন কেন্দ্র হলো জেলার সিমলাপাল ব্লকের বিক্রমপুর অঞ্চলের পুখুরিয়া। এখানে এই শিল্পের ইতিহাস অন্তত দেড়শো বছরের। বংশ পরম্পরায় তা তৈরি করছেন শিল্পীরা। বর্তমানে পুখুরিয়া গ্রামে রয়েছে ১০০টি ইউনিট, এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত পাঁচশোরও বেশি পরিবার।
কী ভাবে তৈরি হয় এই ধ্বনিপাত্র? শিল্পীরা জানাচ্ছেন, তামা ও টিনের সংমিশ্রণে তৈরি বেল মেটালকে (কাঁসা) বার বার উত্তপ্ত করার পরে হাতুড়ি দিয়ে পেটাই করে তৈরি হয় বিশেষ ধরনের কাঁসার বাটি। যা সাধারণ কাঁসার বাটির থেকে আলাদা। সম্পূর্ণ হাতে তৈরি সেই বাটি সিঙ্গিং বোল নামে পরিচিত। কাঠের দণ্ড দিয়ে এই বাটির বাইরে ঘোরালে শব্দের সুন্দর অনুরণন তৈরি হয়। শান্ত, গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সুর মনকে একাগ্র করতে সহায়তা করে এবং মানসিক চাপ কমায়।
৫০০ গ্রাম থেকে ৪০ কেজি পর্যন্ত ওজনের অভিনব বাটিও তৈরি করেন শিল্পীরা। শিল্পীরা জানাচ্ছেন, তাঁদের তৈরি ধ্বনিপাত্র যায় দিল্লি, নেপাল, আমেরিকা, ফ্রান্স, স্যর ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যানের দেশ অস্ট্রেলিয়া–সহ বিশ্বের নানা প্রান্তে। পুখুরিয়া থেকে পণ্য নিয়ে যান মহাজনরা। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের জিআই ট্যাগের জন্য ২০২২–এ আবেদন করে পুখুরিয়া কো-অপারেটিভ ইন্ডাস্ট্রিয়াল সোসাইটি লিমিটেড। শিল্পী তথা সোসাইটির সভাপতি বনমালী কর্মকার, সম্পাদক হারাধন কর্মকার বলছিলেন, ‘আমাদের এই শিল্প বাপ-ঠাকুরদার আমল থেকে হয়ে আসছে। জিআই স্বীকৃতিতে একটা ব্র্যান্ড তৈরি হলো। আশা করি, আন্তর্জাতিক বাজারে এই শিল্পের কদর ও চাহিদা আরও বাড়বে।’
বাঁকুড়ার বাসিন্দা ও গবেষক অধ্যাপক সৌমেন রক্ষিতের কথায়, ‘জিআই স্বীকৃতি পুখুরিয়ার ধ্বনিপাত্রকে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বতন্ত্র পরিচিতি দেবে। বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে বিশ্ববাজারে প্রতিষ্ঠিত করার এক বিরল সুযোগ এসেছে।’ বর্তমানে বাজারে যন্ত্রে তৈরি সিঙ্গিং বোল মিললেও পুখুরিয়ার শিল্পীরা এখনও একটানা হাতুড়ির আঘাতে নিজের হাতে গড়েন তা। বাংলার গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের সম্পদ হয়ে উঠেছে পুখুরিয়ার এই অনন্য সাউন্ড থেরাপি।