৮ গোলের ফোয়ারা, বিষ্ণুর হ্যাটট্রিক, ডার্বির যন্ত্রণা ভুলে ডুরান্ডে গর্জে উঠল ইস্টবেঙ্গল
ডার্বির হতাশা, সমর্থকদের মনখারাপ আর নতুন কোচের প্রথম বড় ধাক্কা— সব কিছুর জবাব এক ম্যাচেই দিয়ে দিল ইস্টবেঙ্গল (East Bengal)। শুক্রবার রাতে কিশোর ভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ডুরান্ড কাপের দ্বিতীয় ম্যাচে সিআইএসএফ প্রোটেক্টর্সকে (CISF Protectors) ৮-০ গোলে বিধ্বস্ত করল লাল-হলুদ। পিভি বিষ্ণুর (PV Vishnu) হ্যাটট্রিক, জেসিন টিকের (Jesin TK) জোড়া গোল, জিকসন সিং (Jeakson Singh) ও বিপিন সিংয়ের (Bipin Singh) গোল— সব মিলিয়ে যেন গোলের উৎসবে মেতে উঠল ইস্টবেঙ্গল। তবে স্কোরলাইন ৮-০ হলেও, মাঠের ছবি বলছে ব্যবধান আরও অনেক বড় হতে পারত। একাধিক সুযোগ নষ্ট না হলে গোলসংখ্যা সহজেই ডজন ছুঁতে পারত।
এই প্রতিবেদন থেকে যা জানা যাবে
-
ডার্বির পর কী ভাবে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করল ইস্টবেঙ্গল?
-
কেন ৮-০ ব্যবধানও পুরো গল্পটা বলছে না?
-
পিভি বিষ্ণুর পারফরম্যান্স কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
-
ম্যাচে হাবাসের কোন সিদ্ধান্ত খেলার মোড় ঘুরিয়ে দেয়?
-
কিশোর ভারতীতে কী বিশেষ স্মৃতি ফিরিয়ে আনল এই জয়?
-
গ্রুপের লড়াইয়ে কতটা সুবিধাজনক জায়গায় পৌঁছল ইস্টবেঙ্গল?
প্রথম গোলের আগে শুধুই আক্রমণ
স্কোরবোর্ডে ৮ গোল উঠলেও ম্যাচের শুরুতে গোল পেতে কিছুটা অপেক্ষা করতে হয়েছে ইস্টবেঙ্গলকে। তবে সেই অপেক্ষার সময়টুকুতেও মাঠে ছিল একটাই দল। শুরু থেকেই সিআইএসএফকে নিজেদের অর্ধে আটকে রেখেছিল লাল-হলুদ।
চতুর্থ মিনিটেই গোলের সামনে পৌঁছে গিয়েছিলেন বিষ্ণু। এডমুন্ডের বাড়ানো বল থেকে তাঁর শট পোস্টে লাগে। কয়েক মিনিট পরে আবার সুযোগ আসে। কিন্তু সিআইএসএফ গোলরক্ষক রাজ মাহাতো দুর্দান্ত সেভ করেন। এরপরও একাধিক বার গোলের সামনে পৌঁছয় ইস্টবেঙ্গল। কখনও কিপার, কখনও ডিফেন্ডার, কখনও ভাগ্য— গোল আসতে দিচ্ছিল না।
প্রথম আধ ঘণ্টা কেটে যাওয়ার পরও গোল না হওয়ায় কিছুটা অস্থিরতা তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু ম্যাচের ৩৮ মিনিটে সেই অপেক্ষার অবসান। জেসিন টিকের পাস থেকে এডমুন্ডের ক্রস। আর সেই বলকে অসাধারণ ব্যাকহিলে জালে জড়িয়ে দেন বিষ্ণু। সেই গোলের পর যেন সব বাঁধ ভেঙে যায়।
মাত্র চার মিনিটের মধ্যে ব্যবধান ২-০। বিষ্ণুর ক্রস ক্লিয়ার করতে গিয়ে নিজেদের জালেই বল জড়িয়ে ফেলেন মহম্মদ খালিদ। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে রামিরেজের মাইনাস থেকে জোরালো শটে তৃতীয় গোল করেন জিকসন। বিরতিতে ৩-০ এগিয়ে যায় ইস্টবেঙ্গল।
হাবাসের ছোঁয়ায় আরও ধারালো আক্রমণ
ডার্বির দলের তুলনায় একাধিক পরিবর্তন করেছিলেন আন্তনিও লোপেজ হাবাস। প্রথম একাদশে সুযোগ পান বেশ কয়েক জন নতুন ফুটবলার। শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, দলকে আক্রমণাত্মক মানসিকতা নিয়েই নামিয়েছেন স্প্যানিশ কোচ।
ম্যাচের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আসে হাইড্রেশন ব্রেকের সময়। বিষ্ণুকে ডান প্রান্ত থেকে বাঁ দিকে সরিয়ে দেন হাবাস। সেই পরিবর্তনের পর থেকেই সিআইএসএফ রক্ষণ কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়ে।
বিষ্ণুর গতি, ড্রিবলিং এবং ফিনিশিং পুরো ম্যাচে আলাদা করে নজর কেড়েছে। যত সময় যাচ্ছে, ততই পরিণত ফুটবলার হিসেবে নিজেকে তুলে ধরছেন তিনি। শুধু গোল নয়, আক্রমণ গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন।
দ্বিতীয়ার্ধে গোলের বন্যা
প্রথমার্ধ শেষ হয়েছিল ৩-০ ব্যবধানে। কিন্তু বিরতির পর যেন আরও ক্ষুধার্ত হয়ে মাঠে নামে ইস্টবেঙ্গল।
দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হওয়ার এক মিনিটের মধ্যেই আসে ম্যাচের সেরা গোল। বাঁ দিক থেকে সন্দীপ মান্ডির ক্রস। আর সেই বলকে দুর্দান্ত বাইসাইকেল কিকে জালে জড়িয়ে দেন বিষ্ণু। গ্যালারিতে তখন উচ্ছ্বাসের ঢেউ।
এরপর একের পর এক গোল। ৬৪ মিনিটে পরিবর্ত হিসেবে নেমে গোল করেন বিপিন সিং। ৭০ মিনিটে স্কোরশিটে নাম লেখান জেসিন। মাত্র তিন মিনিট পরে নিজের দ্বিতীয় গোলও করে ফেলেন তিনি।
৭৬ মিনিটে আসে বিষ্ণুর হ্যাটট্রিক। বিপিনের ক্রস থেকে ডান পায়ের নিখুঁত শটে নিজের তৃতীয় গোল করেন তিনি। সেই সঙ্গে পূর্ণ হয় তাঁর স্মরণীয় রাত।
৮ গোলেও রয়ে গেল আক্ষেপ
ম্যাচ শেষ হওয়ার পর স্কোরবোর্ডে ৮-০ লেখা থাকলেও হাবাস হয়তো মনে মনে ভাববেন, সুযোগগুলো কাজে লাগানো গেলে ফল আরও বড় হতে পারত।
রাজ মাহাতো অন্তত চার-পাঁচটি নিশ্চিত গোল বাঁচিয়েছেন। কয়েকটি শট পোস্টে লেগেছে। আবার কয়েকটি সহজ সুযোগও নষ্ট করেছেন ইস্টবেঙ্গলের ফুটবলাররা। ফলে ব্যবধান ১২ বা তারও বেশি হতে পারত।
এই কারণেই ৮-০ জয় সত্ত্বেও ম্যাচ শেষে ইস্টবেঙ্গলের মধ্যে কিছুটা অপূর্ণতার অনুভূতি থাকতেই পারে।
কিশোর ভারতীতে ফের উৎসব
এই কিশোর ভারতী ক্রীড়াঙ্গন ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের কাছে বিশেষ স্মৃতির জায়গা। কয়েক মাস আগেই এই মাঠে আইএসএল জয়ের উল্লাসে মেতেছিল লাল-হলুদ শিবির।
শুক্রবার সেই একই মাঠে আবারও উৎসবের আবহ তৈরি হল। ডার্বির হতাশা ভুলে সমর্থকদের মুখে হাসি ফিরিয়ে দিল এই বড় জয়। শুধু তিন পয়েন্ট নয়, বিশাল গোল পার্থক্যও তুলে নিল ইস্টবেঙ্গল।
গ্রুপে মোহনবাগানের সমান পয়েন্ট থাকলেও গোল পার্থক্যে শীর্ষে উঠে এসেছে তারা। ফলে নকআউটের দৌড়ে এই জয় যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
FAQ
প্রশ্ন: ম্যাচের ফল কী ছিল?
উত্তর: ইস্টবেঙ্গল ৮-০ গোলে হারিয়েছে সিআইএসএফ প্রোটেক্টর্সকে।
প্রশ্ন: ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেছেন কে?
উত্তর: পিভি বিষ্ণু।
প্রশ্ন: জেসিন টিকে কত গোল করেছেন?
উত্তর: তিনি জোড়া গোল করেছেন।
প্রশ্ন: ইস্টবেঙ্গলের অন্য গোলদাতারা কারা?
উত্তর: জিকসন সিং ও বিপিন সিং একটি করে গোল করেছেন। একটি আত্মঘাতী গোলও হয়েছে।
প্রশ্ন: ম্যাচের সেরা গোল কোনটি ছিল?
উত্তর: বিষ্ণুর বাইসাইকেল কিকে করা দ্বিতীয় গোলটি।
প্রশ্ন: এই জয়ের পর গ্রুপে ইস্টবেঙ্গলের অবস্থান কী?
উত্তর: গোল পার্থক্যে গ্রুপের শীর্ষে উঠে এসেছে ইস্টবেঙ্গল।
ডার্বির হার নিয়ে আলোচনা ছিল, কিন্তু তার জবাব দিতে বেশি সময় নিল না ইস্টবেঙ্গল। কিশোর ভারতীতে গোলের বন্যা বইয়ে দিয়ে লাল-হলুদ বুঝিয়ে দিল, একটি খারাপ ফল তাদের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরাতে পারেনি। বিষ্ণুর হ্যাটট্রিক, আক্রমণাত্মক ফুটবল এবং ৮ গোলের জয় ডুরান্ড কাপে ইস্টবেঙ্গলের শক্তিরই প্রমাণ দিল।