'আমাদের পাড়া আমাদের সমাধান' প্রকল্পের দায় নতুন সরকার নেবে না, মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণায় মাথায় হাত ঠিকাদারদের
এই সময়: তৃণমূল জমানায় শুরু হওয়া ‘আমাদের পাড়া আমাদের সমাধান’ প্রকল্পের অন্তর্গত যে সমস্ত কাজ এখনও অসম্পূর্ণ হয়ে পড়ে রয়েছে, তার দায় নতুন সরকার আর নেবে না। মঙ্গলবার নবান্নে প্রশাসনিক রিভিউ মিটিংয়ে তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেই ঘোষণার পরেই মাথায় হাত পড়েছে ওই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকা ঠিকাদারদের। পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমানে সার্বিক ছবিটা এমনই। ঠিকাদাররা ঠিক করেছেন, তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন করবেন, যাতে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হয়। তাতেও কাজ না-হলে পথে নামা ছাড়া উপায় থাকবে না।
পশ্চিম বর্ধমান জেলায় ২৫০০ বুথের জন্য ২৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল। প্রকল্প ঘোষণার সময় পর্যন্ত ১২৬ কোটি টাকা পাঠানো হয়েছিল। আসানসোল পুরসভার ১০৬টি ওয়ার্ডে এই প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ হয়েছিল ৮৭ কোটি টাকা। পুরসভার ৪৫০ জন ঠিকাদার কাজ ভাগ করে নিয়েছিলেন। এঁদের অনেকে এখনও টাকা পাননি। এমনই এক ঠিকাদার সুদীপ মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘প্রায় ২০ লক্ষ টাকার রাস্তা বানিয়ে একটি টাকাও পাইনি। পাওনাদার রোজ তাগাদা দিচ্ছে।’
অন্য এক ঠিকাদার সতীর্থ সান্যাল বলছেন, ‘তিন লক্ষ টাকার কাজ করে টাকা পাইনি। সেই আশাও ছেড়েছি। জানি না, কী ভাবে এই ক্ষতি সামলাব।’
বিপাকে দুর্গাপুরের ঠিকাদাররাও। দুর্গাপুর পুরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে এই প্রকল্পে নিকাশি নালা, রাস্তা তৈরি হয়েছে। সূত্রের খবর ৫০ জন ঠিকাদার ৫১ কোটির টাকার কাজ করেছেন, কিছু কাজ এখনও বাকি আছে। অধিকাংশ ঠিকাদার টাকা পাননি। দুর্গাপুর পুর এলাকায় যে কাজ হয়েছে, তা পরীক্ষা করবেন পুরসভার ইঞ্জিনিয়াররা। তাঁদের রিপোর্টের ভিত্তিতেই ঠিক হবে, ঠিকাদাররা টাকা পাবেন কি না। দুর্গাপুর পুরসভার কমিশনার আবুল কালাম আজাদ ইসলাম বলেন, ‘এই প্রকল্পে আওতায় কাজ নিয়ে পর্যালোচনা করবেন স্থানীয় দুই বিধায়ক।’ দুর্গাপুর পূর্ব কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘যাঁরা কাজ করেছেন, টাকা পাবেন। যাঁরা করেননি, টাকা পাবেন না।’
পূর্ব বর্ধমানেও এক পরিস্থিতি। বর্ধমান পুরসভার চেয়ারম্যান পরেশচন্দ্র সরকার বলেন, ‘এই বিষয়ে মঙ্গলবার বিস্তারিত কথা হয়েছে। ওই প্রকল্পে যে সব কাজ শেষ হয়েছে, শুধুমাত্র সেই সমস্ত প্রকল্পের টেন্ডার, ওয়ার্ক অর্ডার সমেত যাবতীয় কাগজপত্র জেলাশাসকের কাছে জমা দিতে হবে। শুধুমাত্র শেষ হওয়া কাজের টাকাই দেওয়া হবে।’
মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পরে আসানসোলের ঠিকাদাররা একজোট হয়েছেন। তাঁদের পক্ষে তড়িৎ রায় বলেন, ‘পুর আধিকারিকরা দাবি করেছেন মুখ্যমন্ত্রী এমন কিছু নেতিবাচক ঘোষণা করেননি, যাতে মনে হতে পারে, আমরা টাকা পাব না। আরও কিছু দিন অপেক্ষা করব। তার পরে টাকা না-পেলে পথে নামতে হবে।’ পুরসভা সূত্রে খবর, বিগত সরকারের সময়ে এই প্রকল্পের জন্য প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল। নিয়ম মতো যে টাকা সরকার বরাদ্দ করবে, তার ৩০ শতাংশ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা করতে হয়। সেই হিসাবে ২৪০০ কোটি সরকারি কোষাগারে জমা করার কথা ছিল। কিন্তু জমা হয়েছিল মাত্র ১০০০ কোটি টাকা!
মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে বিজেপির পশ্চিম বর্ধমান জেলার সহ-সভাপতি তাপস রায় বলেন, ‘ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ওই প্রকল্পে কোনও কাজ হয়নি। তৃণমূলের নেতারা ঠিকাদারদের নামে ভুয়ো বিল বানিয়ে ক্যাডার পুষেছেন।’ তৃণমূলের রাজ্য সম্পাদক ভি শিবদাসনের বক্তব্য, ‘ঠিকাদাররা রাজ্য সরকারের প্রকল্পে কাজ করেছেন। তাঁরা কাজ করেছেন কি না, সরেজমিনে তদন্ত করে ঠিকাদারদের বকেয়া মেটানো উচিত।’
(তথ্য সহায়তা: সুশান্ত বণিক, সঞ্জয় দে, রূপক মজুমদার)