কোথায় রাখি, কোথায় বসি, কোথায় গিয়ে কাঁদি?
গৌতম দত্ত
অফিসে মন দিয়ে কাজ করছি। ফোন বেজে উঠল। ভেসে এল এক সুপরিচিত কণ্ঠ— ‘অ্যাই গৌতম…’। তসলিমা নাসরিন।
তসলিমার সঙ্গে প্রথম পরিচয় ২০০৫ সালে, নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত বঙ্গ সম্মেলনে। সেই সময়ে তিনি নিউ ইয়র্কে এসেছিলেন। দুই বাংলাতেই তাঁর উপন্যাস ‘দ্বিখণ্ডিত’ নিষিদ্ধ। হঠাৎ আমার মাথায় একটি ভাবনা এল— ‘দ্বিখণ্ডিত’ বইটির প্রকাশ যদি বঙ্গসম্মেলনেই করা যায়! সেটাই হলো। সেই থেকে শুরু আমাদের বন্ধুত্ব, বিশ্বাস আর ভালোবাসার পথচলা।
কথায় কথায় তসলিমা জানালেন, কলকাতায় ফিরছেন। ১৮ বছর ৮ মাস ১০দিন পর— ১ অগস্ট। একটি ছোট সংগঠন, সেকুলার মিশন-এর আমন্ত্রণে। আয়োজক ওসমান গনি মল্লিক। ফোনের ওপার থেকে তসলিমার কণ্ঠে আনন্দের চেয়ে বেশি ধরা পড়ছিল জমে থাকা অভিমান। বাংলাদেশ তাঁকে দেশছাড়া করেছিল ১৯৯৪ সালের ৮ অগস্ট। আর পশ্চিমবঙ্গ? ২০০৭ সালের ২১ নভেম্বর চলে যেতে বাধ্য করেছিল।
তসলিমা বললেন, ‘বুদ্ধবাবুর সঙ্গে আমার তো খুবই ভালো সম্পর্ক ছিল। অথচ ২০০৩ সালে ‘দ্বিখণ্ডিত’ নিষিদ্ধ করে দিলেন। কারণ জানতে চাইলে বললেন, পশ্চিমবঙ্গের পঁচিশজন বুদ্ধিজীবী তাঁকে চিঠি লিখে বইটি নিষিদ্ধ করার অনুরোধ করেছেন।’ জানতে চাইলাম, ‘জানেন, কারা ছিলেন সেই পঁচিশ জন?’ তসলিমা শান্ত গলায় বললেন, ‘সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ— আরও অনেকে।’ কিছুক্ষণ নীরব থেকে তসলিমা বললেন, ‘তার পর আমাকে দাঙ্গার ভয় দেখিয়ে কার্যত গৃহবন্দি করে রাখা হলো। শেষে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য করা হলো। দিল্লিতে প্রণব মুখোপাধ্যায় এবং কলকাতায় বুদ্ধবাবু— দু’পক্ষই চাইছিলেন আমি ভারত ছেড়ে চলে যাই।’ আমি প্রশ্ন করলাম, ‘প্রণববাবুর সঙ্গে আপনার কী কথা হয়েছিল?’ তিনি বললেন, ‘প্রণববাবু বললেন, আমি যদি ভারত ছেড়ে অন্য যে কোনও দেশে চলে যাই, তা হলে থাকার বাড়ি, গাড়ি, মাসে হাজার হাজার ডলার, সব ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। তার পর ২০০৮ সালের ১৯ মার্চ আমাকে ভারত ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয়।’
এর পরও তিনি হাল ছাড়েননি। প্রতি বছর ভারতীয় ভিসা রিনিউ করতেন। দিল্লিতে এসে মাত্র দু’দিন থাকার অনুমতি মিলত। তবু ফিরে আসতেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘২০১১ সালের পর তো দিল্লিতে স্থায়ী ভাবে থাকার অনুমতি পেলেন?’ তিনি হেসে বললেন, ‘হয়তো তখন ওরা আশা ছেড়ে দিয়েছিল। তাই আর বাধা দেয়নি।’ আবার প্রশ্ন করলাম, ‘তার পর পশ্চিমবঙ্গে সরকার বদলাল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হলেন। তখনও কি ফেরার সুযোগ তৈরি হয়নি?’ তসলিমার উত্তর ছিল সংক্ষিপ্ত, ‘না। বলা হলো, আমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়।’ তার পর যেন বহুদিনের জমে থাকা আর একটি স্মৃতি ফিরে এল— ‘শুধু তা-ই নয়। একটি টেলিভিশন চ্যানেল আমার লেখা মেগা-ধারাবাহিকের প্রায় একশোটি পর্ব রেকর্ড করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ধারাবাহিকটিও বন্ধ করে দিল। যাঁরা আমাকে পুরস্কার দিয়েছিলেন, তাঁরাই প্রায় বিশ বছর আমার সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখেননি। অথচ এখন আবার তাঁরাই ফোন করে লেখা চাইছেন।’
আমি প্রশ্ন করলাম, ‘কলকাতাকে আপনি এত ভালোবাসেন কেন?’ প্রশ্নটি শুনে তাঁর গলায় যেন অন্য এক সুর নেমে এল। তসলিমা লিখেছেন— ‘পশ্চিমবঙ্গকে কখনও আমার আলাদা কোনও দেশ বলে মনে হয় না। একই ভাষা, একই সংস্কৃতি, একই জল-হাওয়ার মানুষ আমরা। একই নদীর পাড়ে আমাদের ঘরবাড়ি। কলকাতায় এলেই আমার বুকের মধ্যে দেশভাগের এক তীব্র যন্ত্রণা জেগে ওঠে। আমার হৃদয়ে কোনও কাঁটাতার নেই।’ এই কয়েকটি বাক্যের মধ্যেই যেন ধরা আছে তাঁর সমগ্র নির্বাসনের ইতিহাস। তাঁর কবিতাতেও সেই একই আর্তি ফিরে ফিরে আসে— ‘সাত সকালে খড় কুড়োতে গিয়ে/ আমার ঝুড়ি উপচে গেছে ফুলে।/ এত আমার কাম্য ছিল না তো!/ এখন আমি কোথায় রাখি,/ কোথায় বসি,/ কোথায় গিয়ে কাঁদি?’
আমি প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বললাম, ‘যিনি আপনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, সেই ওসমান গনি মল্লিক বলেছেন— বিবেকানন্দের রচনা এবং রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য পড়েই তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন। আপনি বিবেকানন্দ সম্পর্কে কী ভাবেন?’ তসলিমা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘এই বিষয় নিয়ে আমি বিশেষ মন্তব্য করতে চাই না। শুধু এটুকু বলব, বিবেকানন্দের সময় থেকে পৃথিবী অনেক বদলে গেছে। যিশু, মুহম্মদ, বিবেকানন্দ— সবাই তাঁদের নিজ নিজ সময়ের মানুষ।’ আমি আর একটি প্রশ্ন করলাম,
‘রবীন্দ্রনাথ কেন বিবেকানন্দকে নিয়ে কিছু লেখেননি?’ তসলিমা মৃদু হেসে বললেন, ‘সেটা তো রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। তিনি কাকে নিয়ে লিখবেন, কাকে নিয়ে লিখবেন না— সেটা তাঁর সিদ্ধান্ত। তিনি তো বেগম রোকেয়াকে নিয়েও কিছু লেখেননি।’ এর পর তিনি নিজেই প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বললেন, ‘তবে একটি বিষয়ে আমি ওসমান গনির সঙ্গে একমত। ভারত ও বাংলাদেশ, দুই দেশেই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু হওয়া উচিত। ধর্মভেদে আলাদা পারিবারিক আইন কেন থাকবে?’ তিনি নিজের আপত্তির বিষয়গুলো তুলে ধরলেন, ‘ভারতে এখনও মুসলমান নারীরা উত্তরাধিকার আইনে বৈষম্যের শিকার। বাংলাদেশে অবস্থাটা আরও জটিল। ১৯৫৭ সালের হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে হিন্দু নারীদের সম্পত্তির অধিকার অত্যন্ত সীমিত। দু’দেশেই ধর্মীয় রক্ষণশীলতার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় নারীদের।’
কথোপকথনের শেষ দিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তা হলে এ বার কি কলকাতায় স্থায়ী ভাবে থাকার কথা ভাবছেন?’ তসলিমা হেসে উঠলেন। ‘সে কথা এখনই বলার সময় আসেনি। আগে যাই, দেখি। আমি কোনও রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে থাকতে চাই না। দিল্লিতে ভালোই আছি।’ আমি বললাম, ‘কবি জয় গোস্বামী আপনার কলকাতায় ফেরাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে তো আপনার খুব সুসম্পর্ক ছিল।’ উত্তর দিলেন, ‘শুনেছি। শুনেছি নিজে পনেরো বছর প্রতিবাদ করতে পারেননি বলে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। ব্রাত্যর সঙ্গেও তো আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। সে তো কিছুই বলেনি।’ বিদায়ের আগে তিনি বললেন, ‘কল করবেন কিন্তু… দিল্লিতে।’
ফোন কেটে গেল। নীরব হয়ে বসে থাকলাম। বাবার বাড়ি ‘অবকাশ’ থেকে ঢাকা। ঢাকা থেকে কলকাতা। কলকাতা থেকে দিল্লি। তার পর আবার কলকাতায় ফেরার আকাঙ্ক্ষা। একজন লেখকের জীবনের এই দীর্ঘ পথচলা আসলে শুধু ভৌগোলিক যাত্রা নয়, এটি ভাষার কাছে ফিরে আসার, শিকড়ের কাছে ফিরে আসার, নিজের মানুষের কাছে ফিরে আসার এক অন্তহীন চেষ্টা। নির্বাসন মানুষকে দেশছাড়া করতে পারে, কিন্তু ভাষাছাড়া করতে পারে না। তসলিমার জীবন সেই সত্যেরই এক দীর্ঘ, বেদনাময় দলিল।
লেখক কবি ও প্রাবন্ধিক