অঙ্কের ভেলায় ভেসে আমেরিকার ফিলাডেলফিয়ায় পুরুলিয়ার গোরাচাঁদ
প্রশান্ত পাল, পুরুলিয়া
শৈশব আর কৈশোর কেটেছিল মামাবাড়িতে। গ্রামে হাইস্কুল ছিল না বলেই ছেলেটির ঠিকানা হয়েছিল মামাবাড়ি। হাইস্কুলের গণিতের শিক্ষক ছিলেন মামা। প্রতি রাতে ছেলেটি মামার কাছে বসে গণিতের নানা ধাঁধা নিয়ে ভাবত। তা করতে করতেই কিশোরমন বাঁধা পড়েছিল গণিতের প্রেমে। কিন্তু তখনও কি ছেলেটির সুদূরতম কল্পনাতেও ছিল যে, একদিন গণিতবিদদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ডাক আসবে তাঁর!
তিনি পুরুলিয়া সিধো কানহো বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক গোরাচাঁদ চক্রবর্তী। এই মুহূর্তে আমেরিকার ফিলাডেলফিয়ায় তিনি। সেখানে গণিতবিদদের আন্তর্জাতিক সম্মেলন ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অফ দি ইন্টারন্যাশনাল ম্যাথেমেটিক্যাল ইউনিয়ন-এ ভারতের প্রতিনিধিত্ব করছেন তিনি। ২২ জুলাই শুরু হয়েছে এই সম্মেলন। চলবে ৩০ জুলাই পর্যন্ত। পশ্চিমবঙ্গ থেকে তিনি ছাড়াও যাদবপুর, আইআইটি খড়াপুর ও রায়গঞ্জের আরও তিন গণিতবিদ এই সম্মেলনে উপস্থিত রয়েছেন।
উল্লেখ্য, ১৯৩৬ থেকে চার বছর অন্তর বিভিন্ন দেশে এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গণিতবিদরা তাঁদের গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন এই সম্মেলনে। তাঁদের মধ্যে দুই থেকে চার জন সেরা উপস্থাপককে ফিল্ডস মেডেল দিয়ে সম্মান জানায় ইন্টারন্যাশনাল ম্যাথেমেটিক্যাল ইউনিয়ন, যা গণিতবিদদের কাছে নোবেল পুরস্কারের সমতুল। ক্যানাডার বিখ্যাত গণিতজ্ঞ জন চার্লস ফিল্ডসের (১৮৬৩-১৯৩২) নামে এই মেডেল দেওয়া হয়।
ফিলাডেলফিয়ায় ফোনে ধরা গেল গোরাচাঁদকে। তিনি জানালেন, গণিতের একটি শাখা কমপ্লেক্স ডায়নামিক্স নিয়ে গবেষণাকে এই সম্মেলনে তুলে ধরবেন তিনি। বললেন, ‘পোলিশ বংশদ্ভূত ফরাসি-আমেরিকান গণিতবিদ বেনেট ম্যান্ডেলব্রট এই কমপ্লেক্স ডায়নামিক্স ব্যবহার করে ফ্যাক্টাল জ্যামিতির সূচনা করেছিলেন, যার সাহায্যে মেঘ, নদী, পর্বতমালার মতো জটিল প্রাকৃতিক আকৃতিকে গাণিতিক ভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়েছে।’
গোরাচাঁদের জন্ম পুরুলিয়ার রঘুনাথপুর-২ ব্লকের লালপুর গ্রামে। গ্রামে হাইস্কুল ছিল না বলে মাধ্যমিকের পাঠ মামাবাড়ির এলাকার উদয়পুর হাইস্কুলে। উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হন মামা কৃষ্ণচন্দ্র হাজরা যে স্কুলে পড়াতেন, সেই সাঁওতালডিহি থার্মাল প্ল্যান্ট হাইস্কুলে। মামা ছিলেন ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে পুরুলিয়া জগন্নাথ কিশোর কলেজ থেকে ২০১০-এ বিজ্ঞানে স্নাতক হন তিনি। ২০১২-তে আইআইটি গুয়াহাটি থেকে মাস্টার্স সম্পূর্ণ করেন, ২০২১-এ কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি।
কর্মজীবন শুরু ঝাড়গ্রাম রাজ কলেজে, ২০১৫-তে। সেখান থেকে বদলি হয়ে পুরুলিয়ার চুনারাম-গোবিন্দ কলেজ হয়ে ২০১৯ থেকে সিধো কানহো বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের অধ্যাপক। গোরাচাঁদের কথায়, ‘পড়াশোনায় এগিয়ে যেতে হলে চাই বিষয়ের প্রতি একাগ্রতা ও ভালোবাসা। স্কুল-কলেজে আমিও কি ভেবেছিলাম, একদিন বিশ্বের গণিত বিশেষজ্ঞদের সামনে আমার গবেষণা উপস্থাপন করব!’