‘১০ বছর আগে-পরে এলে ক্লিক করতাম না’
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
উত্তমকুমারের ময়রা স্ট্রিটের বাড়ির লিভিং রুম। আমার দেখা সব থেকে প্রসারিত একটি ঘর। এবং চোখ বুজলে সবটা ছবির মত ভেসে ওঠে। ঘুরে ঘুরে আরোহী রাজকীয় সিঁড়ির দো তলায় পৌঁছলেই ( লিফ্ট ছিলনা ) সামনে পালিশ করা কাঠের দরজা। চিচিংফাঁক হবে কি হবে না, শেষপর্যন্ত অনিশ্চিত। প্রতিবার প্রবেশের পরে একই অবিস্মরণীয় অভিঘাত : ঘরের শেষ দেওয়াল থেকে উত্তমকুমার সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে হাসছেন। তারাপদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনন্য ক্যামেরায় শান্তায়িত অনিন্দ্য সুন্দর উত্তম কার্পেটের ওপর। পা ছড়িয়ে, তাকিয়া হেলান দিয়ে, বই হাতে। পরনে গিলে করা, বুকের বোতাম খোলা, অলস আভিজাত্যের আদ্দির পাঞ্জাবি। সঙ্গে চুনট করা বিশেষ বুননের সুজাত, মহার্ঘ ধুতি। সামনে চায়ের কাপ। ওই হাসি , ওই চাউনি, ওই গ্ল্যামার, যতদূর পিছন ফিরে তাকাই, কখনও আর কোনও পুরুষের টানে আমি পাইনি। এবং বাকি জীবনে এমন অবিস্মরণীয় মোহময়তা ও ম্যাগনেট আর কোনো পুরুষের মাধুর্যে ও ব্যক্তিত্বে পাবনা, আমি নিশ্চিত। বাঙালি এখন তার তলানিতে। নস্টালজিয়ায় ফিরে তাকালে মনে হয়, উত্তম আলোকবর্ষ দূরের অন্য কোনও গ্রহের।
সত্যিই উত্তমের রূপ স্টারডাস্ট, তারার গুঁড়ো দিয়ে বানানো।
লম্বা লিভিং কাম ডাইনিং রুমের বাঁ ধারে তিনটে পাশাপাশি অন্তত ৮ ফিট উঁচু মুকুরমসৃন দুধসাদা দরজা। কোনটা খুলে যে কখন তাঁর আবির্ভাব হবে, প্রতিবারের এই ঝলমলে অপেক্ষা আজও আমার মনকেমনে লেগে আছে। ঘরের ডান ধারের অনেকটা জুড়ে সোফাসেটের আরাম। সোফাসেট আর আট চেয়ারের ডাইনিং টেবিলের মাঝখানে বিশাল এক গনেশ মূর্তি। গণেশের পিছনে দেওয়ালের গায়ে সিলিং থেকে মেঝে পর্যন্ত দেখার মতো বাটিকের কালী। ডাইনিং টেবিলের পিছনের দেওয়াল জুড়ে তাকিয়া হেলান দিয়ে ধুতি পাঞ্জাবিতে বাঙালি ম্যাটিনি আইডল। ওই দেওয়ালের পিছনে সুপ্রিয়া দেবীর লীলাক্ষেত্র, রান্নাঘর। তার সামনে ছোট্ট একটা ঘর, উত্তম যেটাকে বলেন তাঁর অ্যান্টিচেম্বার, স্ক্রিপ্ট শোনার মগ্ন মন্দির। উত্তমের সঙ্গে আমার কিছু নিবিড় কথার সাক্ষী ওই হাড়কাঁপানো শীতের খুদে ঘর, যে ঘরে ঢুকে আমার প্রতিবার মনে এসেছে ভার্জিনিয়া উলফ – এর আ রুম অফ ওয়ান্স ওন। সারা কলকাতা জুড়ে ভাড়া বাড়িতে থাকলাম এতকাল। এক জায়গায় মন টেকেনা। ভাড়া বাড়ির ফ্লেক্সিবিলিটি তাই জীবন জুড়ে। কিন্তু উত্তমের মত অমন একটি অ্যান্টিরুম আমার স্বপ্নেই থেকে গেল। এবং না পাওয়ার মধুর মেদূরতায়। কিছু কিছু না – পাওয়া পাওয়ার চেয়ে ভালো।
আমাদের যৌবনে, হয়তো উত্তমের জন্যই, তখনও হেমন্ত আসতো কলকাতায়। মুখোপাধ্যায় নয়।হেমন্তলক্ষ্মী। যার ‘ হিমের ঘন ঘোমটাখানি ধুমল রঙে আঁকা ‘। বেশ মনে আছে, উত্তমকুমারের সঙ্গে আমার এই দেখাটি ১৯৭৫ সালে পুজোর পরেই, শরৎ বিদায় নিল, এল এক চিলতে স্বপ্ন – সময় উপহার নিয়ে, হেমন্ত। আর অনিশ্চিত অপেক্ষার পর পাওয়া গেল উত্তমের কিছু সময় এক্সক্লুসিভ আমার জন্য ! কেমন সেই হেমন্তের সকালবেলা ? যত হেমন্তের কবিতা পড়েছি, বেস্ট রবীন্দ্রনাথ : আজি এল হেমন্তের দিন/ কুহেলীবিহীন,
ভূষণবিহীন।
হেমন্ত দিনের মতোই কুহেলীবিহীন, ভূষণবিহীন উত্তমকুমার আমার সামনে দাঁড়িয়ে।, ছ’ ফিট তো বটেই, কিঞ্চিৎ বেশিও হতে পারেন। পায়ে কোলাপুরী। তাতে সামান্য হাইট তো বাড়বেই। চুল আঁচড়াননি। সযত্ন অযত্নের চুল পাঁচ – ছটা অস্টলার ফ্যানের দুরন্ত বাতাসে উড়ছে। গত রজনীর প্রলেপ এখনো মুখে ছড়িয়ে আছে ডুবসূর্যের উত্তররশ্মির
মতন। আমি প্রতি বারের মতো একই রকম মুগ্ধ স্ট্যাচু।
উত্তমের হাতে ডানহিল সিগারেটের প্যাকেট। সিগারেট বের করে ঠোঁটে জুড়লেন, নির্ভুল রোম্যান্টিক কৌনিকতায়। এরপর পাঞ্জাবির পকেট থেকে ডান হাতের আঙুলের ডগায় তুলে আনলেন সোনালি ( না কি সোনার ! ) ছিপছিপে লাইটার। উত্তমের মাথার ওপর ঝড় তুলেছে সিলিং ফ্যান। তাঁর বোতাম খোলা পাঞ্জাবি আর ঢোলা পাজামা ছটফট করছে হওয়ায়। দুহাত দিয়ে নিটোল কাপের আড়াল তৈরি করলেন উত্তম। তারপর অনামিকায় হিরের ঝলক তুলে একটি ক্লিক। লাফিয়ে উঠলো বনহিশিখা। টান দিলেন উত্তম। কিছুক্ষণ বুকের মধ্যে ধরে রাখলেন ধোঁয়া। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে সেই মৃদু হাসি, যে হাসি অর্জন করতে পারে সব অপরাধের মুগ্ধ মার্জনা। বললেন বোসো। আমি অপেক্ষা করলাম উত্তমের আসন গ্রহণ পর্যন্ত। সত্যি কেউ নেই ঘরে। এক্সক্লুসিভ!
এক্সক্লুসিভ ? না কি, সেক্সক্লুসিভ ? আমি ‘ গে ‘ নই? সমকামে আমার অক্লান্ত অরুচি। তবে সমকামীদের প্রতি আমার বিন্দুমাত্র বিরূপতা নেই। বরং বলব
‘ গে ‘ এবং ‘ লেসবিয়ান ‘ বন্ধু – বন্ধুনিদের কাছে পেয়েছি অনেক বেশি ভালোবাসা, তিতিক্ষা, নম্রতা, ব্যবহারিক মাধুর্য, এমনকী দয়া ও ক্ষমা। যে ‘ আসল ‘ কথাটা বলতে গিয়ে এই পার্শ্ব উক্তি তা হল, উত্তমের বুকখোলা পাঞ্জাবির এলিয়ে পড়া হীরকবিন্দুর ঝলসানি, তাঁর অনামিকায় আরও এক হীরের কুহক ( অত বড় হীরে কোহিনুর বাদ দিলে দেখিনি ), তাঁর সুঠাম মধুভাষী মণিবন্ধে সোনার মঞ্জুষায় ঢেকে রাখা নবরত্ন , তাঁর অবয়বে সূর্যাস্তের। সংরাগ, যা বলিউডের সানসেট বুলেভার্ডে পাইনি, আর তাঁর সেই কিলার স্মাইল, সব মিলিয়ে আমাকে বারবার এতটাই টেনেছে,কী টালিগঞ্জের স্টুডিওতে, কী ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে, যে তাঁকে আলগা আদর করতে, আলতো চুমু খেতে ইচ্ছে হয়েছে আমার। কখনও কোনো পুরুষের প্রতি এই সাড়া আমার মধ্যে জাগেনি।
সত্যজিৎ রায়কে দিনের পর দিন তাঁর বাড়িতে দেখেছি। রবীন্দ্রনাথকে দেখিনি। বাঙালির নব জাগরণের শেষ প্রতিভূ ও প্রকাশ সত্যজিৎকে
দেখেছি শুনেছি লিখতে, ছবি আঁকতে, তৈরি করতে চিত্রনাট্য, আড্ডা দিতে, চুপ করে চশমার ডাটি চিবোতে চিবোতে নিজের মধ্যে উজ্জ্বল মগ্নতায়, কিম্বা তিনি পিয়ানোতে তৈরি করছেন ছবির আবহসংগীত কিম্বা তিনি একা দাবা খেলছেন। আমার সমস্ত মুগ্ধতা হয়ে উঠেছে প্রণাম। কখনও হয়ে ওঠেনি আলিঙ্গন, আশ্লেষ। সেই সময়ের এক তরুণীর মুখে শুনেছিলাম উত্তমের সেক্স অ্যাপিলের সারাৎসার : তিনি একই সঙ্গে নির্ভরযোগ্য ও বিপজ্জনক। মেয়েরা এই পুরুষের প্রেমে না পড়ে থাকতে পারে না।
এই প্রসঙ্গে উত্তমের আবেদনের কথা কিঞ্চিৎ বলি। সেই সময়ে এমন ঘটনা অকল্পনীয়। সবে স্টার থিয়েটারে উত্তম সাবিত্রীর শ্যামলী নাটকের অবিশ্বাস্য পর্ব শেষ হয়েছে। উত্তমের জন্যই চালানো গেল না। উত্তমকে দেখার জন্যে এমন ভিড় হয় হাতিবাগানের ট্রাম লাইনের ওপর, পুলিশ হিমসিম খায় সামলাতে। এছাড়া উত্তম আমাকে অনেক পরে যে কথা বলে ছিলেন, ‘ আমি বাংলা সিনেমার ম্যাটিনি আইডল। আমার পক্ষে রক্ত মাংসের বাস্তব হয়ে মঞ্চে অভিনয় করা
ঠিক হচ্ছেনা। দর্শকের চোখের সামনে থেকে আমাকে সরে থাকতে হবেই। তবে তো দর্শক আমাকে টিকিট কেটে দেখতে আসবে।’
এবার যে অবিশ্বাস্য ঘটনার কথা বলতে যাচ্ছিলাম সেটা বলি। তখন আমার বয়স ১৬ – ১৭ । বাংলায় বিশাল বন্যা হলো। এবং উত্তমকুমার বেরলেন বন্যা ত্রানে। হেঁটে চলেছেন উত্তম। পরনে সাদা প্যান্ট শার্ট । সাদা জুতো। হাতি বাগানের মোড় । কী ভিড় কী ভিড়! বারান্দা, ছাদ, রাস্তা , উপচে পড়ছে জনারণ্যে।খুদেরা কোলে, কাঁধে। আমার দৃষ্টি রাস্তা থেকে সামনের বারান্দায়। দূর থেকে চোখে পড়ল তরুণীর হাতে শাঁখা । মনে জাগলো এই প্রশ্ন, তরুণীর চারপাশে যারা, তারা শ্বশুর বাড়ির না বাপের বাড়ির ? উত্তম যত এগিয়ে আসছেন, ততই উত্তেজিত তরুণী। তরুণীর ছিপছিপেমি দেখার মতো। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘ যেখানে যা উঁচুনিচু প্রকৃতির বিধানে ‘ সে সব নিখুঁত। তরুণীর গায়ে একটি রাঙা স্লিভলেস ব্লাউজ। সেই সময়ের প্রেক্ষিতে একটু বেশি ‘ লেস ‘! ব্লাউসের ওপর উদাস আঁচলের সাদা লাল পাড় শাড়ি। চোখের সামনে দেখলাম , উত্তম কাছে এসে রাস্তা থেকে ওপর পানে চেয়ে হাসতেই তরুণী তার ইউক্লিডিয়ান অঙ্গ থেকে ব্লাউস উপড়ে বাতাসে দিল উড়িয়ে। উত্তম, একমাত্র উত্তমই ঘটাতে পেরেছিলেন এমন ডেসপারেট ঘটনা বাঙালির গেরস্ত বারান্দায়।এবার ফিরে যাই চলুন উত্তমের ময়রা স্ট্রিটের ঠিকানায়। এই রকম ছটফটে লেখা লিখতে বেশ লাগে। লিনিয়ার নয় মোটে। ক্ষণে ক্ষণে লাইন ভাঙে এমন লেখা।
আমার দিকে তাকিয়ে উত্তম একটু হাসলেন । এই হাসির মানে, কী জানতে চাও, বলো। আমার প্রশ্ন, গত বিশ পঁচিশ বছর ধরে আপনি কেন আপনি ? প্রশ করেই বুঝলাম, এই ভাষায় এই প্রশ্ন কেউ এতদিন উত্তমকে করেনি! আমার চোখে চোখ রেখে উত্তমের চোখা জবাব : আমি এত বছর ধরে আমি একটাই কারণে, আমি একটানা বাঙালিকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছি যে মরীচিকাই আসলে মরুদ্যান! বলে সে কী হাসি। তারপর ডানহিলে বুক ভরে টান। তারপর বললেন, সময়টা আমার সঙ্গে ছিল, বুঝলে। আমি যদি ১০ বছর আগে আসতাম কিম্বা ১০ বছর পরে, এই ভাবে ক্লিক করতাম না। প্রথমে কিন্তু আমি পরপর ফ্লপ। তারপর বুঝতে পারলাম, আমার ফ্লপ হওয়ার কারণ কী! এবং ধীরে ধীরে নিজেকে শুধরে নিলাম। অগ্নিপরীক্ষা রিলিজ করে ১৯৫৪ – র সেপ্টেম্বরে। তারপর থেকে আমাকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। আমি জানতে চাই, উত্তমের সাফল্যের সবটুকু কি তাঁর প্রতিভার জন্য? এই হলো উত্তমকুমারের অন্তর থেকে উঠে আসা সহজ সত্য : একেবারেই নয়। আমার প্রতিভা? না না। আমার পরিশ্রম বলতে পারো। আর আমার লাক। কী সৌভাগ্য আমার, আমার কণ্ঠের সঙ্গে মিলে গেল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠ। একের পর এক হিট গান উনি আমার প্লেব্যাকে গেয়েছেন। আর মনে হচ্ছে যেন আমি গাইছি। তারপর সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান রমার গলায় ( সুচিত্রা সেনকে কখনও সুচিত্রা বলেননি উত্তম। সব সময়ে রমা)। গানে মোর ইন্দ্রধনুর মত গান। সব কটা গান হিট। সেই ছবি তো হিট করবেই। তবে রমার মত সুন্দরী নায়িকা পাওয়াটাও ভাগ্যের ব্যাপার। আমার ভাগ্য, রমার সঙ্গে আমাকে বাঙালির, সাধারণ বাঙালির মনে ধরল। যাকে বলে রাজজোটক মিল। সমস্ত বাঙালি পুরুষ সুচিত্রা সেনের প্রেমে পড়ল। আর আপনি তার প্রেমে পড়েন নি, এই কথা বিশ্বাস করতে হবে? টুক করে প্রশ্নটা গলিয়ে দিই।আর উত্তম ক্যাচ ফেলেন না : প্রেমে তো আমি পড়েছি। রমার সঙ্গে থাকতেও চেয়েছি। রমার উত্তরটা ছিল সাংঘাতিক। ও বলল, আমার সঙ্গে থাকলে আমাদের পর্দার রোমান্স মরে যাবে। তাছাড়া, আমি জীবনসঙ্গিনী বা পার্টনার হিসেবে খুব একটা ভালো হয়তো হবনা। উত্তম সুচিত্রার বিয়ে হতে পারে না। ওরা তো রোম্যান্টিক নায়ক নায়িকা।
আপনি সুচিত্রা সেনকে বললেন অসাধারণ সুন্দরী নায়িকা। আপনিও তো কম সুন্দর নন। আপনার জন্যে তো বাঙালি মেয়ে পাগল। উত্তম এক আশ্চর্য সৎ উত্তর দিয়ে আমাকে হতবাক করলেন: না না, আমি আটপৌরে সুন্দর হয়তো। বলতে পারো, আমার মধ্যে একটা বাঙালি লাবণ্য আছে। আমার নাক, ঠোঁট, চোখ, এই সব আলাদা আলাদা করে দেখলে, সৌমিত্র, বসন্ত চৌধুরী, এরা বেশি নম্বর পাবে। কিন্তু আমার সৌভাগ্য, ঘরে ঘরে বাঙালি মেয়েরা আমাকে একটু বেশি আদরের মনে করল। বাঙালি মা মনে করল, উত্তমের মত ছেলে পেতাম যদি! বাঙালি গৃহবধূ আমার মত স্বামী চাইল হয়তো। অন্তত পর্দার আমির মতো। আর কিছু তরুণী হয়তো মনে মনে আমাকে প্রেমিকও ভাবলো। কিন্তু সবটাই আমার সৌভাগ্য যে আমি সুপারস্টার হয়ে গেলাম।
দেখুন, স্বয়ং সত্যজিৎ রায় কিন্তু আপনাকেই সুপার স্টার ভাবলেন এবং আপনাকে ভেবেই নায়ক ছবিটা করেছেন। আমার এই কথায় অনেক্ষন চুপ উত্তম। তারপর বললেন, আর একদিন তোমাকে খুব তাড়াতাড়ি ডাকবো। কথা আছে।
ডেকে ছিলেন, খুব তাড়াতাড়ি নয়, পরের বর্ষায়। এবং বাড়িতে কেউ ছিল না। সেদিন বসে ছিলাম উত্তমকুমারের অ্যান্টিরুমে। হিমশীতল সাউন্ডপ্রুফ কেমন যেন বিষাদময় মেঘলা একরত্তি নিলয়! এবং সেদিন এক অন্য উত্তমকুমার। তাঁর ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা ক্রাই অফ দি হার্ট ! উত্তমকুমার সেদিন বেশিরভাগ কথা বলে ছিলেন। আমি প্রশ্ন করে বাধা দিই নি। শোনা যাক উত্তমের সেই স্বগতোক্তি : তোমার নিশ্চয় মনে আছে রঞ্জন একটা ছবির শুটিং চলছে তখন। অপর্ণা নায়িকা। ছবির সেটে একটা বিশাল মাকড়শার জল। তার সামনে একটা মদের বোতল। আমাকে মাকড়সার জালের সামনে দাড়াতে বললে। তারপর ছবি তুললে তুমি। আজ তোমাকে বলছি, আমি নিজেই একটা মাকড়সার জালের মধ্যে আটকে গেছি। বেরোবার পথ নেই । আর কিচ্ছু বললেন না।চুপ। সেই চুপ কথা আমাকে জানিয়ে গেল, উত্তমের ব্যক্তিগত জীবনের যন্ত্রনা, বিষাদবোধ, বিপন্নতা। বুঝলাম মানুষটা বহন করে চলেছেন কী অসহনীয় যন্ত্রনা। এবং সবটুকু চেপে রাখছেন তিনি তাঁর ভাবমূর্তি অক্ষুন্ন রাখতে। আরো একটা গভীর কথা বুঝতে পারলাম সেদিন : উত্তমের এই চাপা স্বভাবই তৈরি করেছে তাঁর পারসোনার রূপ ও সংরাগ।
উত্তম আরো এক গভীর হতাশার কথা জানালেন আমাকে : টালিগঞ্জে আমরা যাঁদের ডিরেক্টর বলি তাঁদের মধ্যে একজনও নেই যিনি আমাকে দিয়ে সত্যিকার ভালো কান করিয়ে নিতে পারেন! আমিই আমার ডিরেক্টর।
সেই সময় উত্তম নায়ক হয়ে ছিলেন একটা ছবির। নাম সূর্যতোরণ। হঠাৎ প্রশ্ন করলাম, যে ইংরেজি উপন্যাস থেকে এই সিনেমার গল্পটা কাঁচা হাতে তুলে আনা হয়েছে, সেটা পড়েছেন? উত্তম বললেন, ইংরেজি গল্প, কার লেখা ? আমি বললাম, আয়ান র্যান্ডের ক্লাসিক উপন্যাস দি ফাউন্টেন হেড। এবং আপনি যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন, মূল উপন্যাসে তার নাম হাওয়ার্ড রোয়ার্ক। উত্তম অনেক্ষন চুপ।তাঁর চোখ ক্রমশ লাল এবং ছলছলে। আমি বুঝতে পারি সুপারস্টার কতদূর বিপন্ন। আশ্রয়হীন। তাহলে তিনি কি তাঁর অতীতেই আশ্রিত হবেন শেষ পর্যন্ত। প্রশ্ন করি, অতীতের কথা ভাবেন, তখন নিশ্চয় খুব নস্টালজিক লাগে। উত্তম কিছুক্ষণ ভাবেন। হয়তো নস্টালজিক শব্দটার মায়ায় পড়েন। মৃদু কন্ঠে বলেন , খুব নস্টালজিক লাগে। কিন্তু অতীত বিশেষ মনে পড়ে না।