‘গড হ্যাজ় অ্যারাইভ্‌ড... ৫:১৫-র ট্রেনে দেখা হলো!’ - 24 Ghanta Bangla News
Home

‘গড হ্যাজ় অ্যারাইভ্‌ড… ৫:১৫-র ট্রেনে দেখা হলো!’

Spread the love

হরি রায়

বর্ষাটা ঠিকমতো কবে নামবে বলুন তো? একদিনে নাকি ৪০টা বাজ পড়ল! কিছু মানুষ বজ্রাঘাতে মারা গেল। কিন্তু যাকে বলে আঁধার করে আসা বৃষ্টি, কলকাতায় সেই বৃষ্টি এল কই, এখনও? বৃষ্টিতে অবিশ্যি আমার পুরোনো বাড়ির একলা ঘর আরও স্যাঁতসেতে হয়। আমার ঘরে তো কোনও দিনই সূর্যালোক ঢোকে না। দিনের বেলায় দু’-তিনটে টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে রাখি। ঘরের উত্তর দিকে যে বইয়ের পাহাড়, সারা দিন বৃষ্টি চললে, সেই দিকের বইগুলো ভেজা ভেজা হয়ে যায়। আমার মন খারাপ হয়ে যায়। তবে কেন জানি না, সেই বেদনা বেশ লাগে আমার। মন বলে, ভিজুক ওরা। কিছু কঠিন বিষয় নরম হোক। কত বই সারা জীবন মেঘলা থেকে গেল! এদের কথা মনে হলে মনে হয়, এসেছিলে তবু আসো নাই, জানায়ে গেলে। কতবার ফিরে ফিরে গেছি ওদের কাছে। তবু কাটেনি ওদের মেঘলামি। তখন মনে হয়েছে, এ-ই ভালো, এ-ই তো বেশ, যে আঁধার আলোর অধিক!

যত প্রান্তিক হচ্ছে জীবন, ততই আমাকে আচ্ছন্ন করছে একটি বইয়ের আঁধার, যা হয়তো সত্যিই আলোর অধিক। এই বইয়ের প্রায় সবটাই থাকবে আমার নাগালের বাইরে, আমার বুদ্ধিমত্তার অতীত। আমি সেটাই চাই। কেননা, এই বই বুঝতে না পারার আলো, তা-ও তো কম নয়। স্বয়ং ঈশ্বর লিখেছেন এই বই। গণিত-দর্শনের ঈশ্বর। এত কথা লিখলাম, আজ তাঁর কথা লিখতে। তবে কথা নয়। রূপকথা। কিন্তু রূপকথা হলে কী হবে, সবটা সত্যি! এই পৃথিবীতে একদিন ঘটেছিল। সে এক বিপুল বেদনার, উন্মাদ সন্ধানের, অবিকল্প নিঃসঙ্গতার অবিশ্বাস্য গল্প!

এই গল্পের শুরুতে দু’টি তারিখ মনে রাখা খুব জরুরি। প্রথম তারিখটা হলো, ১৯২৯-এর ১৮ জানুয়ারি। আর দ্বিতীয় তারিখটা, ১৯২৯-এর ১৮ জুন। দুটো তারিখই ১৮। আর বছরটা একই। গাণিতিক বিচারে কিছুটা ইন্টারেস্টিং তো বটেই!

‘ওয়েল, গড হ্যাজ় অ্যারাইভড। আই মেট হিম অন দ্য ফাইভ-ফিফটিন ট্রেন।’ কথাটা হেঁজিপেঁজি মানুষের মুখের কথা নয়। কথাটা চিঠি লিখে জানালেন সেই সময়ে সম্ভবত পৃথিবীর সব থেকে খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেন্‌স। এই ভগবানটি কে? যাঁর সঙ্গে কেন্‌সের আকস্মিক দেখা ট্রেনে? তিনি লুডভিগ ভিটগেনস্টাইন, তিনি এগারো বছর কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের দর্শন নিয়ে বার্ট্রান্ড রাসেলের ছাত্র। তাঁর আর এক গুরু প্রফেসর জি ই মুর। এই ছাত্রটি সম্বন্ধে এই দুই মহাপণ্ডিত দুর্নিবার দোলাচলে। কখনও ভাবেন, ভিটগেনস্টাইন উন্মাদ। পর ক্ষণেই ভাবেন, তাঁদের এই ছাত্রটি বিশুদ্ধ প্রতিভা, যাকে তাঁরাও বুঝতে পারেন না। এগারো বছর পরে, ৪০ বছর বয়সে সেই ছাত্র কেমব্রিজে ফিরেছে, এত বছর সে কী করছিল? সে প্রশ্নে পরে আসছি।

ছাত্রটির ফিরে আসার কারণ, বার্ট্রান্ড রাসেল এবং জি ই মুর, দু’জনেই চান, গণিত দর্শনের এই ব্যাখ্যার-অতীত, আশ্চর্য ভগবান অধ্যাপক হয়ে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। উন্মাদ? তা হোক। তবু তো নিখাদ জিনিয়াস। এই রত্নকে কেমব্রিজ হারাতে চায় না। কিন্তু একটা থিসিস লিখে তো অন্তত একটা ‘ডক্টরেট’ ডিগ্রির প্রয়োজন। তা তো নেই ভিটগেনস্টাইনের।

ইতিমধ্যে অবিশ্যি ভিটগেনস্টাইন লিখে ফেলেছেন একটা মাস্টারপিস ‘ট্র্যাক্টাটাস-লজিকো-ফিলজ়ফিকাস’, যা নাকি দর্শনের সমস্ত সমস্যার উত্তর দিয়েছে। কিন্তু রাসেল এবং মুর যদিও এই অসামান্য গ্রন্থে দেখেছেন অবিশ্বাস্য বোধ ও উপলব্ধির ঝলক, কিন্তু তবু এই বইয়ের অনেকটাই তাঁদের কাছে মেঘলা। অস্পষ্ট। এবং সংশয়ের বিষয়।

এবার আসছি এই রূপকথার দ্বিতীয় তারিখটায়: ১৮ জুন, ১৯২৯। ইতিমধ্যে ছ’মাস কেটে গেছে কেমব্রিজে ভগবানের প্রত্যাবর্তনের পর। তাঁকে নিয়ে ছাত্র এবং কিছু শিক্ষকের উল্লাসের ঘনঘটা। ভগবান কিন্তু সর্ব ক্ষণ নির্লিপ্ত ও এক মগ্ন মানুষ। নিজের মধ্যে ডুব দিয়ে থাকেন। এবং কখনও কখনও মেজাজ হারিয়ে রুক্ষ। ১৯২৯-এর ১৮ জুন তিনি ঠিক সময়ে হাজির হলেন রাসেল আর মুরের সামনে। আজ তাঁর মৌখিক পরীক্ষা। পরীক্ষা নেবেন রাসেল আর মুর। এই পরীক্ষার উপর নির্ভর করছে, ভিটগেনস্টাইন কেমব্রিজের অধ্যাপক হতে পারবেন কি না। তিনি বর্তমানে বাচ্চাদের স্কুলে পড়িয়ে নিজের লেখাপড়ার খরচ চালান!

প্রথম কথা বললেন রাসেল, ‘ভিটগেনস্টাইন, আমি মানছি তোমার বইটার মধ্যে মৌলিক ভাবনার অভাব নেই, কিন্তু অনেক জায়গা আছে, আমি এখনও বুঝতে পারছি না। আমার কাছে অস্পষ্ট। সুতরাং কিছু আলোচনার প্রয়োজন আছে।’

রাসেলকে মুহূর্তে উত্তর দিলেন ভিটগেনস্টাইন: ‘ডোন্ট ওয়ারি, আই নো ইউ উইল নেভার আন্ডারস্ট্যান্ড। আমি তোমাকে সব দিতে পারি। কিন্তু আমার মস্তিষ্ক, আমার ইন্টেলেক্ট কী করে দেব?’

ঘরে পিন পড়লেও শোনা যাবে, এমন নৈঃশব্দ্য। যা হওয়ার তা-ই হলো। হওয়ারই তো কথা! শিক্ষক এবং পৃথিবীবিখ্যাত দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের মাস্টারপিস ‘প্রিন্সিপিয়া ম্যাথেমেটিকা’ সম্বন্ধে ভিটগেনস্টাইন লিখে জানিয়েছেন, ‘The book shows how far a man can go who has absolutely no intelligence whatsoever!’ এ তো গোদের ওপর বিষফোড়া। এখানেই শেষ নয়, ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে ভিটগেনস্টাইন দুই শিক্ষকের পিঠে মারলেন বিদ্রুপের থাপ্পড়!

‘দাঁড়াও!’ বললেন জি ই মুর। তার পর অফিশিয়াল লেটার হেডে ভিটগেনস্টাইনের প্রকাশিত গবেষণাপত্রটির বিষয়ে লিখলেন: ‘In my opinion this is a work of genius, it is in any case up to the requirements of a degree from Cambridge.’ তলায় স্বাক্ষর দিলেন, জি ই মুর। ক’দিনের মধ্যে রিসার্চ গ্রান্ট পেলেন ভিটগেনস্টাইন। দর্শনের ছাত্ররা ব্ল্যাকবোর্ডে লিখল, ‘গড হ্যাভ অ্যারাইভড ব্যাক ইন ফিলোজ়ফি’!

এবার যাওয়া যাক ভিটগেনস্টাইন-রূপকথার শুরুর পর্বে। তা না হলে রূপকথার সমাপ্তি আমরা বুঝতে পারব না। এবং আমার এই একলা স্যাঁতসেতে ঘরে ভিটগেনস্টাইনের ভাবনাও অসমাপ্ত থেকে যাবে। লুডভিগ জোসেফ ডোহান ভিটগেনস্টাইনের জন্ম অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায়, ১৮৮৯-এর ২৬ এপ্রিল। মৃত্যু ১৯৫১-র ২৯ এপ্রিল, ইংল্যান্ডের কেমব্রিজে। বিরাট ধনী পরিবারে জন্ম ভিটগেনস্টাইনের। গান-বাজনায় মুখর থাকত তাঁদের বাড়ি। অভিজাত, শৌখিন এবং সঙ্গীত-প্রবণ, এমন এক পরিবারে জন্ম ভিটগেনস্টাইনের। কিন্তু সেই আনন্দের মধ্যেও ভিটগেনস্টাইনের তিন ভাই আত্মহত্যা করলেন। এবং ভিটগেনস্টাইনের মধ্যেও দেখা দিলো আত্মহত্যার ইচ্ছা এবং গভীর বিষণ্ণতা। তাঁর ক্রমেই মনে হতে লাগল, বেঁচে থাকার কোনও মানে হয় না। জীবন অর্থহীন। তিনি কিছুটা উৎসাহ পেলেন অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। এয়ারক্রাফ্ট তৈরির গণিত ও বিজ্ঞানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন ভিটগেনস্টাইন। এবং তাঁর মন এক আশ্চর্য এবং আকস্মিক বাঁক নিল এখান থেকে। তিনি অনুভব করলেন আকাশের ডাক। বিশেষ করে রাতের আকাশ। রাতের আকাশ যেন টাইম মেশিন— তাঁকে নিয়ে যায় কোটি কোটি বছরের পুরোনো অতীতে। আলোকবর্ষ দূরের তারাদের দিকে তাকিয়ে তিনি মুহূর্তে চলে যান কত লক্ষ বছরের ফেলে আসা অতীতে। হয়তো অনেক তারাই মরে গেছে কবে। তবু থেকে গেছে তাদের অস্তিত্ব। বহু আলোকবর্ষের দূরত্ব পেরিয়ে মৃত তারাদের আলো আজও এসে পৌঁছচ্ছে এই পৃথিবীতে।

এখান থেকে ভিটগেনস্টাইনের ভাবনা নতুন মোড় নিল। তিনি ঠিক করলেন, তিনি কেমব্রিজে পড়বেন গণিতের দর্শন। এবং গণিতের দর্শনে নিয়ে আসবেন এক আকাশ নতুন ভাবনা, এমন এক দৃষ্টিকোণ যা আগে কেউ ভাবতে পারেনি। কিন্তু তার আগে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হতে হবে।

(চলবে)

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *