নদীতে গাড়ি, মোটরবাইক! বিপদের নাম 'অফ রাইডিং' - 24 Ghanta Bangla News
Home

নদীতে গাড়ি, মোটরবাইক! বিপদের নাম 'অফ রাইডিং'

Spread the love

এই সময়, শিলিগুড়ি: গত সোমবার সন্ধ্যা নামার পরেও শিলিগুড়ির কাছে জনপ্রিয় ট্যুরিস্ট স্পট দুহিয়ায় একটি দামি গাড়ি নিয়ে মাঝনদীতে নেমে আড্ডা দিচ্ছিলেন দুই যুবক এবং দুই তরুণী। তাঁরা খেয়ালই করেননি, কখন বালাসন নদীর জলস্তর বেড়ে গিয়েছে। এর ফলে মাঝনদীতেই গাড়ি সমেত অটিকে পড়েন ওই চার । এরপরে নিকষ কালো অন্ধকারের মধ্যেই তাঁরা মাঝনদীতে দাঁড়িয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেন। কিছুক্ষণ পরে স্থানীয় বাসিন্দারা ছুটে এসে গাড়ি সমেত তাঁদের উদ্ধার করে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যান। এমন ঘটনা দুধিয়ায় নতুন নয়। ইদানীং পাহাড়ি নদী এবং ঝরনাকে কেন্দ্র করে বাড়ছে ‘অফ রাইডিং’-এর প্রবণতা। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। আর এই প্রবণতাই কোনও কোনও ক্ষেত্রে বিপদ ডেকে আনছে- মানুষের এবং পরিবেশ, উভয়ের ক্ষেত্রেই।

কী এই ‘অফ রাইডিং’?

চার চাকা বা দু’চাকা নিয়ে পাহাড়-সমুদ্র কিংবা জঙ্গলের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন বহু মানুষ। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বা একলা। এঁরা প্রত্যেকেই রাস্তায় গাড়ি কিংবা মোটরবাইক রেখে ট্যুরিস্ট স্পটে হেঁটে পৌঁছন। ‘অফ রাইভার’-রা মূলত বালি, পাথর, কাদা, বরফ-সহ যানবাহন চলাচলের অযোগ্য, এমন রাস্তায় গাড়ি কিংবা মোটরবাইক ছোটান। রোমাঞ্চের জন্য ‘অফ রাইডার’রা এমন কাণ্ড ঘটান। এর জন্য নির্দিষ্ট গাড়ি বা মোটরবাইক রয়েছে। অভিযোগ, ইদানীং অভিজ্ঞ ‘অফ রাইডার’-দের পাশাপাশি এমন যুবকদেরও ভিড় বাড়ছে দুধিয়া, রোহিণী, কালীঝোরা, টিপুযেখালা, শিবখোলা, লালপুল-সহ দার্জিলিং এবং কালিম্পং জেলার বিভিন্ন ট্যুরিস্ট স্পটে, যাঁরা নিজেদের ‘অফ রাইডার’ বলে দাবি করছেন। তাঁরা যে কোনও গাড়ি বা মোটরবাইক নিয়েই চলে যাচ্ছেন নদীতে বলে অভিযোগ।

তরুণ-তরুণীদের পাশাপাশি মাঝবয়সিদেরও ‘অফ রাইডিং’-এর দৃশ্য ধরা পড়ছে তিস্তা, মহানন্দা, বালাসন, পঞ্চনই নদীতে। তাঁরা বোল্ডার কিংবা বালির মধ্যে দিয়েই পাহাড়ি নদীর মাঝে গাড়ি কিংবা মোটরবাইক নিয়ে পৌঁছে যাচ্ছেন। এরপরে দীর্ঘক্ষণ আড্ডা, ছবি তোলা, রিল বানানো, হইচই, গান-বাজনা করছেন। কেউ কেউ মদ্যপান, গঞ্জিকা সেবনও করছেন বলে অভিযোগ। এমনিতে বিষয়টি রোমাঞ্চকর মনে হলেও, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এতে জীবনের ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে। মানুষের প্রাণহানি তো বটেই, এমনকী নদীর পরিবেশ এবং জীববৈচিত্রও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

'অফ রাইডিং' কী এবং এর সমস্যা নিয়ে ইনফোগ্রাফিক। দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ের পাহাড়ি নদীতে যেকোনো যানে অফ রাইডিংয়ের ফলে জীবন ও পরিবেশের ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে।

পরিবেশবিদদের মতে, নদীর বুকে গাড়ি চলাচলের ফলে স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়। বোল্ডারের ফাঁকে থাকা মাছ এবং অন্য জলজ প্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হয়। গাড়ির চাকা নদীর তলদেশের গঠন বদলে দেয়। এমনকী, তেল বা জ্বালানি লিক হলে জল দূষণের আশঙ্কাও তৈরি হয়। এ ছাড়া শব্দদূষণ এবং আবর্জনার কারণে বন্যপ্রাণী ও পাখিদের স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্রের উপরেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিষয়টিতে বিরক্তি প্রকাশ করে পরিবেশবিদ অনিমেষ বসু বলেন, ‘শুধুমাত্র প্রশাসনিক পদক্ষেপ করে এ ধরনের প্রবণতা বন্ধ করা যাবে না।’ তাঁর মতে, ‘স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং বাসিন্দাদের এ নিয়ে জনমত গড়ে তোলা প্রয়োজন। এক সপ্তাহের মধ্যেই তরাই, ডুয়ার্স এবং দার্জিলিং পাহাড় মিলিয়ে এই ধরনের সাত-আটটি ছোট ছোট ঘটনা ঘটেছে। মানুষ এরপরেও সচেতন না হলে যে কোনও সময়ে বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।’

সূত্রের খবর, গত এক মাসে উত্তরবঙ্গে একাধিক নদীতে হড়পা বানে বেশ কয়েকটি মোটরবাইক এবং চারচাকা ভেসে গিয়েছে। আর এসবের কারণেই পর্যটন এলাকাগুলিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা, নদীর বুকে গাড়ি নামানোর উপরে কড়া নিষেধাজ্ঞা, নিয়মিত নজরদারি এবং আইন ভাঙলে মোটা টাকা জরিমানার দাবি তুলেছেন বাসিন্দাদের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, পর্যটন অবশ্যই প্রয়োজন, তবে প্রকৃতি এবং মানুষের নিরাপত্তায় আপস করে নয়। দার্জিলিং জেলা পুলিশের এক আধিকারিক বলেন, ‘নিয়মিত মানুষকে সচেতন করতে পুলিশ পদক্ষেপ করছে। দিনের বেলায় পর্যাপ্ত নজরদারি রয়েছে। কিন্তু রাতের অন্ধকারে জঙ্গল কিংবা নদীর মাঝে নেমে কে কী করছেন, তা সব সময়ে জানা মুশকিল।’ তাঁর আশ্বাস, ‘এই ধরনের ঘটনা জানতে পারলে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *