প্রিয়জনকে হারানোর কান্না চা-বাগানে, অধীর প্রতীক্ষা - 24 Ghanta Bangla News
Home

প্রিয়জনকে হারানোর কান্না চা-বাগানে, অধীর প্রতীক্ষা

Spread the love

সব্যসাচী ঘোষ, মালবাজার

কয়েক দিন টানা বৃষ্টির পরে মঙ্গলবার আকাশ পরিষ্কার হওয়ায় খুশি মনে বাগানে গিয়েছিলেন মেটেলির দেবীকা ওরাওঁ। সকাল সাড়ে ন’টা নাগাদ তাঁর মোবাইলে ফোন আসে। দেবীকা তখন পিলকোট চা বাগানে পাতা তুলছিলেন। স্বামী বিকেসোর ওরাওঁ (৩৫)-এর মৃত্যুর খবর শুনে মাথা ঘুরে পড়ে যান তিনি। সঙ্গীরা তাঁকে টেনে এনে চা গাছের ধারে শক্ত জমিতে বসিয়ে দেন। চোখেমুখে জল দিয়ে একটু ধাতস্থ হয়ে দেবীকা রওনা দেন বাড়ির দিকে। ততক্ষণে তাঁর বাড়ির সামনে পড়শিদের ভিড়। বিডিও সাহেবও চলে এসেছেন। সিকিমে টানেলে কাজ করার সময়ে তাঁর স্বামীর মৃত্যুর খবর তিনি কনফার্ম করেন। তিন সন্তানকে নিয়ে কী করবেন? কোথায় যাবেন? দেবীকার কথায়, ‘সিকিমে গিয়েছিল বাড়তি কিছু টাকা রোজগারের জন্য। অগস্টের মাঝামাঝি বাড়ি ফিরে মালবাজারে ভালো দোকান থেকে ছেলেদের জন্য নতুন জামা কিনে দেবে বলেছিল। এখন কী করব বুঝতে পারছি না।’

জলপাইগুড়ির মেটেলি ব্লকের কিলকোট চা বাগানের ১১ নম্বর লাইনের বাসিন্দা বছর ২৬-এর যুবক গ্যাব্রিয়েল টিয়া (২৬) চার দিন আগে সিকিম গিয়েছিলেন। মঙ্গলবার সকাল দশটা নাগাদ তাঁর দাদা পাস্কেল চালসা বাজারে যাওয়ার জন্য কিলকোট চা বাগানের মোড়ে দাঁড়িয়েছিলে গাড়ির জন্য। অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসে তাঁর কাছে। ছুটতে ছুটতে হাজির হন বাড়িতে। খবর পেয়ে প্রতিবেশীদের জটলা দেখে বোঝেন, খবরটা সত্যি। পাস্কেল বলেন, ‘শুক্রবার মালবাজারে রথের মেলা ঘুরে তার পরে ভাই সিকিম গেল। ফোনে কথা হয়েছে দু’দিন আগে। কাজ চলছে বলে জানিয়েছিল। আজ কে যেন ফোন করে মৃত্যুর খবর দিল। কী ভাবে মাকে বলব, বুঝতে পারছি না।’ এ দিন দুপুরে স্থানীয় প্রশাসনের তরফে ফোন করে দেহ নিয়ে আনার জন্য হাতের কাছে আধার কার্ড রাখতে বলা হয় তাঁকে।

সিকিমের কাছেই জলপাইগুড়ির বিস্তীর্ণ চা বাগিচা। যাঁদের বাগানে স্থায়ী কাজ নেই তাঁরা নানা কাজে চলে যান সিকিমে। কেউ দু’সপ্তাহ, কেউ বা চার দিন আগে গিয়েছিলেন সিকিমের পাকিয়াংয়ের সামারদুঙ এলাকায় ঝোলুঙ্গ গ্রামে টানেলের কাজে। সোমবার টানেল বিপর্যয়ে যাঁরা মারা গিয়েছেন তাঁদের মধ্যে ৯ জনের বাড়ি জলপাইগুড়ি। এমনটাই জানিয়েছেন জেলার পুলিশ সুপার সুজাতা কুমারী বীণাপানি। তিনি বলেন, ‘উদ্ধার কাজে তদারকিতে ডিএসপি পদমর্যাদার আধিকারিককে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে।’

কিলকোট চা বাগানের মতোই মেটেলি ব্লকের আরও দুই চা বাগান নাগেশ্বরী এবং ইনডং চা বাগান থেকেও শ্রমিকরা সিকিমে গিয়েছিলেন। একাধিক জনের মৃত্যু বা আহত হওয়ার খবর এসেছে সেই সব বাগানে। মৃত শ্রমিক অমিতলাল গোরের (৩২) বাড়ি নাগেশ্বরীতে। ইনডংয়ে বাড়ি শ্যাম ওরাওঁ (২৮)-এর। গ্রাসমোর চা বাগানের ঘাসমারি এলাকার বাসিন্দা অর্জুন সাঁওতাল (৩০), সুখানি গ্রামের আনন্দ টোপ্পো (২৮) এবং শুল্কাপাড়া গ্রামের বলো ওরাওঁ (৩৪)-এর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। বানারহাট বিন্নাগুড়ি এলাকার আদেশ ওঁরাও (২৬) নামে আরও এক জনের মৃত্যুর খবর এসেছে। রাকেশ মাঝি, নিশান ওরাওঁ নামে মেটেলির আরও দুই শ্রমিক ঘটনায় আহত হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। তাঁরা নামচি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

খবর মেটেলি ব্লক সূত্রের কিলকোট, ইনডং, নাগেশ্বরী সহ স্থানীয় চা বাগানগুলি থেকে মোট ১৭ জন এই প্রকল্পে কাজ করতে গিয়েছিলেন। জলপাইগুড়ি জেলার নিরিখে এই সংখ্যা শতাধিক হতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। এ দিন দুপুরে মৃতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে আসেন মেটেলির বিডিও সুমন্ত ভৌমিক এবং আইসি মিংমা লেপচা। বিজেপির নাগরাকাটা বিধানসভার আহ্বায়ক দীপঙ্কর ধর এবং জলপাইগুড়ি জেলা বিজেপির সাধারণ সম্পাদক মজনুল হক। বিজেপির রাজ্য সাধারণ সম্পাদক বাপি গোস্বামী বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী নিজে পরিস্থিতির খোঁজ নিচ্ছেন। মন্ত্রী বিশাল লামা, নাগরাকাটার বিধায়ক পুনা ভেংরাদের একটি দল হেলিকপ্টারে সিকিমে গিয়েছেন।’

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *