অক্সিজেন পেল বাংলা ভাষা, সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে কী বলছেন ‘চন্দ্রবিন্দু’র অনিন্দ্য থেকে চিকিৎসক কুণাল সরকার? | Bengali Language can use as west bengal government offices suvendu adhikari announcement
ভাষা শুধু মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়, একটি জাতির আত্মপরিচয় ও অধিকারের ভিত্তি। বহু বছর ধরে বাঙালির আক্ষেপ ছিল, বাংলা কেবল সাহিত্য, গান, আবেগ ও উদযাপনের ভেতরেই বন্দি—প্রশাসনের রুক্ষ দরবারে তার প্রবেশাধিকার সীমিত। সম্প্রতি কলকাতার বুকে দেশের প্রথম শব্দ জাদুঘর ‘মিউজিয়াম অফ ওয়ার্ড’ (Museum of Word)-এর উদ্বোধনী মঞ্চে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন চর্চার জন্ম দেন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে লেখা এক বিশেষ চিঠিতে তিনি পরামর্শ দেন, জনজীবন ও প্রশাসনিক স্তরে মাতৃভাষার প্রয়োগ বহু গুণে বাড়াতে হবে। সেই বার্তার পরই বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত— ১ সেপ্টেম্বর থেকে রাজ্যের সমস্ত প্রশাসনিক কাজ, কেন্দ্র-রাজ্যের পারস্পরিক চিঠিপত্র এমনকী, পুলিশের কাছে এফআইআর (FIR)-ও করা যাবে বাংলা ভাষায়।
প্রশাসনিক ক্ষেত্রে মাতৃভাষাকে এই প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার পদক্ষেপকে একবাক্যে স্বাগত জানিয়েছেন বাংলার বিশিষ্টজনরা। Tv9Bangla-কে তাঁরা নিজেদের প্রতিক্রিয়াও জানিয়েছেন। তবে পাশাপাশি উঠেছে এর বাস্তব রূপায়ণ সংক্রান্ত নানা প্রশ্ন ও গঠনমূলক আলোচনা। সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এই সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে বলেন, “এটি দারুণ সিদ্ধান্ত। বাংলা ভাষাকে একটি বিশেষ মর্যাদার আসনে বসানো হল। বাঙালি হিসেবে আমি খুবই সন্তুষ্ট ও গর্বিত। বাঙালির জন্য এটি অত্যন্ত আনন্দের খবর।”
ভাষার অস্তিত্ব যে দৈনন্দিন ব্যবহারের ওপরই নির্ভর করে, তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক, সঙ্গীতশিল্পী ও পরিচালক অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়। সরকারের নির্দেশকে সাধুবাদ জানিয়ে তাঁর বক্তব্য, “বাংলা ভাষা এতদিন মূলত আবেগ, সাহিত্য ও সঙ্গীতের ভাষাতেই সীমিত ছিল। কিন্তু কাজের জায়গায় যদি একে নিত্যসঙ্গী না করি, তবে এই ভাষা সেভাবে বেঁচে থাকবে না। কাজের মধ্য দিয়েই ভাষা বাঁচে। আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ও বলেছিলেন যে, শুধু কাজ চালানোর মতো ইংরেজি জেনে আমরা যদি মাতৃভাষাকে অবহেলা করি, তবে তা অচিরেই মরে যাবে। আজ যেভাবে কাজ চালানোর জন্য ভাষাকে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে, তা নিয়মিত পালন করা গেলে বাংলা আবার মাথা তুলে দাঁড়াবে।”
তবে আবেগের জোয়ারে ভেসে না গিয়ে এই নতুন নিয়ম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন শিক্ষাবিদরা। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানালেও কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁর মতে, “সিদ্ধান্তটি প্রশংসাযোগ্য হলেও সবাই এতে কতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন, তা ভাবার বিষয়। আমলাদের কঠিন বাংলা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবেন কি না, কিংবা সঠিক বানানের চর্চা সবার আছে কি না—সে বিষয়ে ভাবা দরকার। তাই নিয়মটি কার্যকর করার আগে সরকারের উচিত কর্মীদের জন্য বিশেষ ওয়ার্কশপ বা প্রশিক্ষণ শিবিরের আয়োজন করা, যাতে ব্যবহারযোগ্য ভাষার রূপটি স্পষ্ট হয়।”
একই সুর শোনা গিয়েছে, প্রখ্যাত চিকিৎসক ও সমাজবীদ কুণাল সরকারের গলায়। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ও জটিল কাগজপত্রের প্রয়োগের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বিষয়টির বাস্তব রূপায়ণের দিকে জোর দিয়েছেন। ড. কুণাল সরকার বলেন, “ইচ্ছা বা আবেগ খুব ভালো হলেও বর্তমানে বেশিরভাগ কাজই স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার ও কম্পিউটারের মাধ্যমে হয়। আগামী এক বা দুই বছরের মধ্যে টেন্ডার, বিল সাবমিশন, দরখাস্ত বা আইনি বিষয়গুলো কীভাবে বাংলায় রূপান্তর করা হবে, তার জন্য একটি স্পষ্ট এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা লাগবে। বিগত বছরগুলোতেও আমরা অনেক প্রতিশ্রুতি দেখেছি, কিন্তু পরিকল্পনার অভাবে তা কথার মধ্যেই থেকে গিয়েছে। তাই এই সদইচ্ছা বাস্তবে রূপ দিতে চিন্তাভাবনা করে এগোতে হবে।” অন্যদিকে সাহিত্যিক তিলোত্তমা মজুমদার জানান, ”এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাচ্ছি। ভাষাকে সচল রাখতে গেলে, তাকে নানা কাজের মধ্যে দিয়ে প্রসারিত করতে হবে। বাংলা ভাষায় জ্ঞান অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন কাজের এই ভাষার ব্যবহার হলে, তা বাংলা ভাষার মুখই আরও উজ্জ্বল হবে।”
জনগণের ভাষায় যদি সরকারের কাজকর্ম পরিচালিত হয়, তবে প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্ব অনেকটাই ঘুচে যায়। ১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হতে চলা এই সিদ্ধান্তের সফলতা নির্ভর করবে সঠিক পরিকাঠামো গঠন, আমলাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সমন্বয়ের ওপর। তবে সব জটিলতা পেরিয়ে এটি যে বাংলা ভাষার ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।