দু’দশকে ১ ডিগ্রি বাড়ল কাশ্মীরের গড় তাপমাত্রা, উদ্বেগ আইআইটির গবেষণায়
কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়
ভরা ডিসেম্বরেও দেখা মেলেনি টুকরো বরফের। সোনমার্গ, গুলমার্গ, পহেলগাম — সর্বত্র একই অবস্থা। কয়েক বছর আগে শীতে কাশ্মীরের এমন অবস্থা চমকে দিয়েছিল সবাইকে। তীব্রতম শীতের ৪০ দিন অর্থাৎ ‘চিল্লা–ই–কালান’–এও কতটা ঠান্ডা হবে উপত্যকা, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছিল সে বার।
উত্তর ভারতের হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। আইআইটি খড়্গপুরের গবেষকদের নতুন এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, গত দু’দশকে জম্মু ও কাশ্মীরের একাধিক উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের গড় তাপমাত্রা এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গিয়েছে। গবেষকরা দেখেছেন, বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকায় উষ্ণতা বৃদ্ধির হার সমতল বা নিম্নভূমির তুলনায় ঢের বেশিই। এর ফলে উপত্যকার বিরাট এলাকা জুড়ে হিমবাহ, তুষারনির্ভর নদী, জলনিরাপত্তা নিয়ে এবং উত্তর ভারতের পরিবেশগত ভারসাম্য সম্পর্কে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আইআইটির গবেষকদের প্রতিবেদনটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানপত্রিকা ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’–এ। ‘ওয়ার্মিং অফ দ্য হাই মাউন্টেনস ক্লাইমেট সেনসিটিভ জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর ডিউরিং দ্য পিরিয়ড ১৯৮০–২০২৪’ শীর্ষক গবেষণাপত্রটির লেখক আইআইটি খড়্গপুরের ‘সেন্টার ফর ওশান, রিভার, অ্যাটমসফিয়ার অ্যান্ড ল্যান্ড সায়েন্সেস’ (কোরাল)-এর অধ্যাপক জিএস গোপীকৃষ্ণন, জয়নারায়ণন কুট্টিপুরথ এবং ভিএম প্রণব চন্দ্রন। ১৯৮০ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত স্থলভিত্তিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ এবং বায়ুমণ্ডলের তথ্যের পুনর্বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা যে ফল পেয়েছেন, সেটাই এই গবেষণাপত্রের ভিত্তি।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ভাদেরওয়া, পহেলগাম এবং গুলমার্গের মতো উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি। অন্য দিকে, জম্মুর মতো তুলনামূলক নিচু এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়নের হার তুলনামূলক ভাবে কম। গবেষকদের মতে, এটি উচ্চতা-নির্ভর উষ্ণায়নের স্পষ্ট প্রমাণ। তিন গবেষকের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, বর্ষার আগের সময়টায় দিনের তাপমাত্রার তুলনায় রাতের তাপমাত্রার দ্রুত বৃদ্ধি। সমীক্ষা অনুযায়ী, কয়েকটি মাঝারি উচ্চতার অঞ্চলে বার্ষিক গড় তাপমাত্রা প্রতি দশকে ০.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়েছে। একই সময়ে প্রাক্-বর্ষা মরশুমে রাতের তাপমাত্রা প্রতি দশকে ০.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
গবেষকদের বিশ্লেষণে জানা গিয়েছে, উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে শীতকালে তুষারের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং ভূমির প্রতিফলন ক্ষমতা (অ্যালবেডো)–র পরিবর্তন উষ্ণায়নের অন্যতম কারণ। পাশাপাশি, বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং লং–ওয়েভ রেডিয়েশনের প্রভাব ওই অঞ্চলের রাতের তাপমাত্রাও দ্রুত বাড়িয়ে তুলছে। এই প্রসঙ্গে অধ্যাপক কুট্টিপুরথ বলেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু-সংবেদনশীল অঞ্চলগুলির অন্যতম হিমালয়। তবে এই উষ্ণায়ন সর্বত্র সমান নয়। উচ্চতার সঙ্গে তার প্রকৃতি বদলাচ্ছে। পাহাড়ি এলাকায় দ্রুত উষ্ণতা বৃদ্ধি হিমবাহ, মৌসুমি তুষারস্তর, মিঠে জলের ভাণ্ডার এবং পাহাড়ি বাস্তুতন্ত্রের স্থিতিশীলতার উপরে গুরুতর প্রভাব ফেলছে। এই প্রভাব হিমালয়ের বাইরেও বিস্তৃত হবে।’ গবেষণার প্রধান লেখক জিএস গোপীকৃষ্ণনের মতে, ‘রাতের তাপমাত্রার দ্রুত বৃদ্ধি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। উষ্ণ রাতের ফলে শীতল হওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, তুষার ও বরফ দ্রুত গলে যায় এবং পাহাড়ি নদীর জলপ্রবাহের ধরন বদলে যেতে পারে।’
গবেষকদের সতর্কবার্তা, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে হিমবাহ দ্রুত সঙ্কুচিত হবে। তুষার সঞ্চয় কমবে, নদীর প্রবাহে পরিবর্তন আসবে এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়বে। পাশাপাশি, হিমালয়নির্ভর জলসম্পদের উপরে নির্ভরশীল মানুষের জীবিকা ও জলনিরাপত্তাও চাপে পড়বে।