স্বর্গীয় বড়দিনের গাছ
এর পর আর একটা রাস্তা— ওহ, কী চওড়া রাস্তা! এখানে তো সে নিশ্চিত চাপা পড়ে যাবে। সবাই কী ভীষণ চিৎকার করছে, ছুটছে, গাড়ি চালিয়ে চলে যাচ্ছে! আর আলো, আলো! আর ওটা কী? একটা বিশাল কাচের জানালা। আর সেই জানালার ও-পারে ছাদ পর্যন্ত উঠে গেছে একটা গাছ— একটা ফার গাছ। গাছটাতে অসংখ্য আলো জ্বলছে। সোনালি কাগজ, আপেল, ছোট ছোট পুতুল আর ঘোড়া দিয়ে সাজানো হয়েছে গাছটাকে। আর ঘরের মধ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, দারুণ সুন্দর পোশাক পরে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ছুটোছুটি করছে, হাসছে, খেলছে, কিছু খাচ্ছে আর পান করছে কোনও পানীয়। তার পর একটি ছোট্ট মেয়ে ছেলেদের একজনের সঙ্গে নাচতে শুরু করল। আহা, কী সুন্দর সেই ছোট্ট মেয়েটি! জানালার ও-পার থেকে সে সঙ্গীতের শব্দও শুনতে পেল। ছেলেটি জানালাটার দিকে তাকিয়ে রইল, বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেল, আর হাসল। যদিও ঠান্ডায় তার পায়ের আঙুলগুলো ব্যথা করছিল আর তার হাতের আঙুলগুলো লাল হয়ে শক্ত হয়ে গিয়েছিল, এমনই শক্ত যে, সেগুলো নাড়াতে গেলেই ব্যথা লাগছিল। হঠাৎ তার মনে পড়ল যে, তার পায়ের আঙুল আর হাতের আঙুলে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। সে কেঁদে ফেলল, আর আবার ছুটতে শুরু করল।
আবার আর একটি জানালার কাচের ও-পারে সে আর একটি বড়দিনের গাছ দেখতে পেল। আরও দেখল যে, একটা টেবিলের ওপর রয়েছে নানা রকমের কেক— বাদামের কেক, লাল কেক, হলুদ কেক। টেবিলটা ঘিরে তিনজন সুন্দরী তরুণী বসে। যারাই তাদের কাছে যাচ্ছে, তাদের সবাইকে ওরা কেক দিচ্ছে। ঘরের দরজাটা বারবার খুলছে— রাস্তা থেকে কত ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা ভেতরে ঢুকছেন। ছেলেটি চুপিসাড়ে এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ দরজাটি খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল। ওহ, তখন সবাই কী চিৎকারই না করল! কী ভাবে সবাই মিলে হাত নেড়ে নেড়ে তাকে তাড়িয়ে দিতে লাগল! একজন ভদ্রমহিলা তাড়াতাড়ি তার কাছে এসে তার হাতে একটা এক টাকার কয়েন গুঁজে দিলেন, তার পর নিজের হাতে দরজাটা খুলে তাকে আবার রাস্তায় বার করে দিলেন। সে কী ভীষণ ভয় পেয়ে গেল! কয়েনটা গড়িয়ে সিঁড়িতে ঠং করে পড়ল। তার লাল হয়ে যাওয়া শক্ত আঙুলগুলো দিয়ে সে কয়েনটাকে শক্ত করে ধরে রাখতে পারল না। ছেলেটি আবার দৌড়ে পালাতে থাকল। কিন্তু কোথায় যাচ্ছে সে জানে না। তার আবার কাঁদতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু সে ভয় পাচ্ছিল। সে তাই দৌড়তেই থাকল, আর নিজের আঙুলগুলোর ওপর ফুঁ দিতে লাগল। সে খুব মনমরা হয়ে পড়ল, কারণ হঠাৎ তার নিজেকে ভীষণ একা মনে হলো, মনে হলো সে খুবই ভয় পাচ্ছে।
আর তার পর— হে ভগবান! এ আবার কী? অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে কিছু একটা দেখছে। একটা কাচের জানালার ওপারে রয়েছে তিনটে ছোট্ট পুতুল। লাল আর সবুজ পোশাক পরা। একেবারে… একেবারে যেন জীবন্ত! এদের মধ্যে একজন ছোটখাটো বৃদ্ধ মানুষ বসে বসে একটি বড় বেহালা বাজাচ্ছে। আর বাকি দু’জন তার পাশে দাঁড়িয়ে ছোট ছোট বেহালা বাজাচ্ছে, তালের সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ছে, একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছে। তাদের ঠোঁটও নড়ছে— মনে হচ্ছে তারা যেন সত্যিই কথা বলছে, যদিও কাচটা থাকায় কিছুই শোনা যাচ্ছে না। প্রথমে ছেলেটা ভাবল, লোকগুলো সত্যিই জীবিত। তার পর যখন বুঝতে পারল ওরা পুতুল, তখন সে হেসে ফেলল। এ রকম পুতুল সে জীবনে কখনও দেখেনি। এমন পুতুল যে হতে পারে, সে কল্পনাও করেনি! তার কাঁদতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু পুতুলগুলো তাকে আনন্দও দিচ্ছে। ওদের দেখে তার ভালো লাগছে। হঠাৎ তার মনে হলো, কেউ যেন পেছন থেকে তার জামা ধরে টানল। একটি দুষ্টু বড়সড় ছেলে তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সেই ছেলেটা আচমকা ছোট ছেলেটির মাথায় আঘাত করল, তার টুপিটা ছিনিয়ে নিল, আর তার পায়ে পা লাগিয়ে তাকে ফেলে দিলো। ছেলেটি মাটিতে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে সবাই হইহই করে উঠল। সে আতঙ্কে একেবারে অবশ হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে সে দৌড়ে পালাল।