রাজমহল পাহাড়ের কোলে এক অন্যরকম ভ্রমণের গল্প। Ei Samay
কবিতার লাইনগুলো যেন বাস্তব হয়ে আমার চারপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সত্যিই, এখানে এসে পথ হারাতে ইচ্ছে করে। সময়কে থামিয়ে দিতে ইচ্ছে করে।
এরপর শুরু হলো তিনপাহাড়কে হেঁটে হেঁটে আবিষ্কার করার পালা। পাহাড়, টিলা, বন, পাথর, ছোট ছোট ঝরনা আর আদিবাসী গ্রামের সরল জীবন— সব মিলিয়ে এক অনাবিল সৌন্দর্যের জগৎ। এখানে প্রকৃতি কোনও আড়ম্বর করে না; নিঃশব্দে নিজের রূপ মেলে ধরে।
সেদিন মনে হয়েছিল, প্রকৃতিকে কখনও ব্যাগে ভরে বাড়ি নিয়ে যাওয়া যায় না। ব্যাগ একদিন খালি হয়ে যায়, কিন্তু প্রকৃতির স্পর্শে ভরে ওঠা মন কোনও দিন শূন্য হয় না।
তিনপাহাড় থেকে মাত্র দশ কিলোমিটার দূরে রাজমহল। ইতিহাসের পাতা উল্টোলেই যার নাম উঠে আসে। একসময় সুবা বাংলার রাজধানী ছিল এই জনপদ। মান সিংহ, শাহজাহানের পুত্র শাহ সুজা, মীরকাশিম— কত রাজনীতি, কত যুদ্ধ, কত ইতিহাসের সাক্ষী এই শহর।
ইতিহাসের চেয়েও আমাকে বেশি টেনেছে গঙ্গার ধারের সেই অপরূপ নীরবতা। মান সিংহ নির্মিত সিংহী দালান আজও গঙ্গার তীরে সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নদীর ভাঙনে তার অনেকটাই হারিয়ে গেলেও ইতিহাসের গাম্ভীর্য হারায়নি। ওপারে পশ্চিমবঙ্গের মানিকচক। ভোরবেলায় অসংখ্য মানুষ গঙ্গাস্নান করে সূর্য মন্দিরে প্রণাম জানাতে আসেন।
সেই দৃশ্য দেখে মনে পড়ে যায় কাজী নজরুল ইসলামের অমর বাণী—
‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম—হিন্দু মুসলমান,
মুসলিম তার নয়নমণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।’
রাজমহলে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা মন্দির ও মসজিদ যেন আজও সেই সম্প্রীতির কথাই বলে।
পরদিন রওনা দিলাম মোতি ঝরনার উদ্দেশে। উঁচু পাহাড়ের বুক চিরে তিনটি ধারায় দুধসাদা জল নীচে নেমে আসছে। নীচে প্রাচীন শিবমন্দির। টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে ঝরনার সৌন্দর্য যেন আরও উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। জলকণার ছিটে মুখে এসে পড়তেই মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন নিজের হাতে আশীর্বাদ করে দিচ্ছে।
তারপর ঘুরে এলাম বারহাড়োয়ার বিন্দুবাসিনী মন্দির, পাহাড়চূড়ার বিশাল বজরংবলীর মূর্তি আর শিবগাদি।
শিবগাদিতে পৌঁছতে প্রায় দু’শো সিঁড়ি ভাঙতে হয়। কিন্তু উপরে উঠে যে দৃশ্য চোখে পড়ে, তার জন্য সেই পরিশ্রম কিছুই নয়। পাহাড়ের বুক চিরে অজানা উৎস থেকে অনবরত জলধারা নেমে আসছে। আজও কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না, সেই জলের উৎস কোথায়।
পথে দেখা মিলল উধরা পাখিরালয়ের। জলাশয়ের ধারে শত শত পরিযায়ী পাখির কলরব যেন প্রকৃতির এক অনবদ্য সিম্ফনি। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে শুধু সেই সুর শুনলাম।