দ্বারকার কৃষ্ণ থেকে পুরীর জগন্নাথ, দ্বাপর থেকে কলিযুগে কী ভাবে বদলে গেল ঈশ্বরের রূপ? - 24 Ghanta Bangla News
Home

দ্বারকার কৃষ্ণ থেকে পুরীর জগন্নাথ, দ্বাপর থেকে কলিযুগে কী ভাবে বদলে গেল ঈশ্বরের রূপ?

Spread the love

পুরাণ অনুসারে যুগে যুগে অধর্মের বিনাশ করে সত্য ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে নানা রূপে ধরাধামে আবির্ভূত হয়েছেন নারায়ণ। দ্বাপর যুগে কৃষ্ণ অবতার হিসেবে জন্ম নেন তিনি। দেহত্যাগ করার পর শ্রীকৃষ্ণই জগন্নাথরূপে আবির্ভূত হলেন পুরীতে। কী ভাবে দ্বারকার কৃষ্ণ থেকে পুরীর জগন্নাথ হয়ে উঠলেন তিনি, আজ রথযাত্রার পূণ্যলগ্নে সেই কাহিনি জেনে নিন।

শ্রীকৃষ্ণের প্রয়াণ

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের অনেক দিন পর একদিন শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকায় একটি গাছের নীচে বসে ছিলেন। সেই সময় তাঁর রাঙা চরণ দেখে পাখি ভেবে ভুল করে বাণ মারে জরা নামে এক শবর। শ্রীকৃষ্ণের মৃত্যুর খবর পেয়ে দ্বারকায় ছুটে আসেন পঞ্চপাণ্ডব। তাঁর মৃতদেহ সত্‍কারের পর অর্জুন দেখেন, গোটা দেহটা পুড়লেও নাভিদেশ পুড়ছে না। তখন দৈববাণী হয়, ‘ইনিই সেই পরমব্রহ্ম। এঁকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করো। সমুদ্রেই ওঁর অনন্তশয়ন।’ অর্জুন তাই করেন।

শবরদের নীলমাধব

ঢেউয়ের মাথায় ভাসতে ভাসতে এগিয়ে চলা ওই নাভি লক্ষ্য করে পাড় ধরে ছুটে চলেন ওই শবর। এই ভাবে দ্বারকা থেকে পুরী পর্যন্ত আসার পর সেখানে শ্রীকৃষ্ণকে স্বপ্নে দেখেন তিনি। তাঁকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে কৃষ্ণ বলেন, ‘কাল ভোরে আমাকে তুলে নে। এখন থেকে তোর বংশধর শবরদের হাতেই পুজো নেব আমি’। সেই থেকে নীলমাধব রূপে তিনি পূজিত হতে থাকলেন শবরদের কাছে।

নীলমাধবের খোঁজ

এই ভাবে বহুকাল কেটে যায়। কলিঙ্গের রাজা তখন মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্ন। বিষ্ণুর ভক্ত ইন্দ্রদ্যুম্ন শ্রীক্ষেত্রে একটি মন্দির গড়ে তুললেন। কিন্তু সেই মন্দিরে তখন বিগ্রহ নেই। একদিন তিনি জানতে পারেন বিষ্ণুরই এক রূপ নীলমাধবের কথা। অমনি চারদিকে লোক পাঠালেন রাজা। বাকিরা খালি হাতে ফিরে এলেও, ফিরলেন না বিদ্যাপতি। তিনি জঙ্গলের মধ্যে পথ হারালে তাঁকে উদ্ধার করে নিজের বাড়ি নিয়ে এলেন শবররাজ বিশ্ববসুর কন্যা ললিতা। তাঁরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর বিদ্যাপতি দেখেন রোজ সকালে শবররাজ কোথাও যান। স্ত্রীকে প্রশ্ন করে বিদ্যাপতি জানতে পারেন যে জঙ্গলের মধ্যে একটি গোপন জায়গায় নীলমাধবের পুজো করতে যান বিশ্ববসু।

দৈববাণী

নীলমাধবের সন্ধান পেয়ে তাঁকে দর্শন করার জন্য জেদ করেন বিদ্যাপতি। প্রথমে শবররাজ রাজি না হলেও পরে তিনি শর্ত দেন যে জঙ্গলের মধ্যে বিগ্রহ পর্যন্ত চোখ বেঁধে বিদ্যাপতিকে নিয়ে যাবেন। চোখ বাঁধা অবস্থায় যাওয়ার সময় গোটা পথে সর্ষের দানা ছড়াতে ছড়াতে গেলেন বিদ্যাপতি। যথাস্থানে পৌঁছে নীলমাধবের দর্শন পেয়ে তিনি বনের মধ্যে পুজোর ফুল কুড়িয়ে পুজোয় বসেন। তখনই দৈববাণী হয়, ‘এতদিন আমি দীন-দুঃখীর পুজো নিয়েছি, এবার আমি মহাউপাচারে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের পূজো নিতে চাই।’

ইন্দ্রদ্যুম্নের সঙ্গে নীলমাধবের সংঘাত

ইষ্টদেবতাকে হারাবার আশঙ্কায় ভীষণ রেগে গিয়ে বিদ্যাপতিকে বন্দি করলেন শবররাজ। কিন্তু কন্যা ললিতার কাকুতি মিনতিতে বাধ্য হলেন জামাতাকে মুক্ত করতে। বিদ্যাপতিও সঙ্গে সঙ্গে এই খবর পৌঁছে দিলেন রাজার কাছে। ইন্দ্রদ্যুম্ন তখনই জঙ্গলের মধ্যে সেই গুহায় পৌঁছে গেলেন নীলমাধবকে সাড়ম্বরে রাজপ্রাসাদে আনতে। কিন্তু নীলমাধব কোথায়? আটক হলেন শবররাজ। তখনই দৈববাণী হলো যে, সমুদ্রের জলে ভেসে আসবে কাঠ। সেই দিয়েই বানাতে হবে বিগ্রহ।

সমুদ্রে ভেসে এল কাঠ

সমুদ্রে কাঠ ভেসে এলেও হাজার হাজার হাতি, ঘোড়া, সেপাই, লোক-লস্কর দিয়েও সমুদ্র থেকে সেই কাঠ তোলা গেল না। শেষে কাঠের একদিক ধরলেন শবররাজ আর একদিক ব্রাহ্মণ পুত্র বিদ্যাপতি। তবে সেই কাঠ সমুদ্র থেকে তোলা গেল। মহারাজ তাঁর কারিগরদের লাগালেন মূর্তি গড়তে। কিন্তু সেই কাঠ এমনই পাথরের মত শক্ত যে ছেনি, হাতুড়ি সবই ভেঙে যায়। তা হলে উপায়? মূর্তি গড়বে কে? মহারাজের আকুলতা দেখে বৃদ্ধের বেশে হাজির হলেন স্বয়ং বিশ্বকর্মা, তিনিই গড়বেন মূর্তি। তবে শর্ত একটাই। ২১ দিন পর্যন্ত তিনি নিজে দরজা না খুললে কেউ যেন তাঁর ঘরে না আসে।

জগন্নাথের অসমাপ্ত মূর্তি

শুরু হলো কাজ। ইন্দ্রদ্যুম্নের রানি গুন্ডিচা রোজই রুদ্ধ দুয়ারে কান পেতে শোনেন কাঠ কাটার শব্দ। ১৪ দিন পর হঠাৎ রানি দেখেন রুদ্ধদ্বার কক্ষ নিস্তব্ধ। রানি মহারাজকে জানাতেই ইন্দ্রদ্যুম্ন খুলে ফেললেন কক্ষের দরজা। ভেতরে দেখেন বৃদ্ধ কারিগর উধাও, পড়ে আছে তিনটি অসমাপ্ত মূর্তি। তাঁদের হাত, পা কিছুই গড়া হয়নি। গর্হিত অপরাধ করে ফেলেছেন ভেবে দুঃখে ভেঙে পড়লেন রাজা। তখন তাঁকে স্বপ্ন দিয়ে জগন্নাথ বললেন যে এরকম আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। তিনি এই রূপেই পূজিত হতে চান। সেই থেকেই শ্রী জগন্নাথদেবের মূর্তি ওভাবেই পূজিত হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *