শিল্পীদের সঙ্গে দেখা করানোর টোপ কলকাতার 'দাদা-দিদি'র, 'ড্রিমার্স' হতে গিয়েই পাচারচক্রের ফাঁদে ২ ছাত্রী?
কৌশিক দে, মালদা
ঠিক চার বছর আগে কাতারে আয়োজিত ফুটবল বিশ্বকাপের আসর মাতিয়েছিল ‘ড্রিমার্স’ নামে একটি গান। এই গানের স্রষ্টা বহুল জনপ্রিয় দক্ষিণ কোরিয়ান পপ ব্যান্ড ‘বিটিএস’। তরুণ এবং কিশোরদের মধ্যে এই ব্যান্ডের জনপ্রিয়তা কতটা, তা সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ ফেরালেই আন্দাজ করা যায়। ভারতের নানা প্রান্তে ‘বিটিএস’ ভক্তের ছড়াছড়ি। তেমনই দুই ‘জাবরা ফ্যান’ মালদার একটি সরকারি স্কুলের ১২ বছরের দুই ছাত্রী। যারা ‘বিটিএস’–এর গানের প্রেমে পড়ে ‘ড্রিমার্স’ (স্বপ্নসন্ধানী) হতে চেয়ে একটি বারের জন্য প্রিয় তারকা জাং কুক, জিমিন, সুগা কিংবা আরএম–দের সঙ্গে দেখা করতে চায়। তার জন্য বাড়িতে না–জানিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় যেতে মালদা থেকে বাস ধরে সোজা শিলিগুড়িতে পৌঁছে যায়। কিন্তু ক্লাস সিক্সের ওই দুই ছাত্রী বুঝতেও পারেনি, তাদের ‘ড্রিমার্স’ হয়ে ওঠার বদলে ফাঁদে ফেলে ভিন দেশে পাচার করে দেওয়া হচ্ছে!
মঙ্গলবার রাতে মালদা জেলা পুলিশের কাছ থেকে খবর পেয়ে নিউ জলপাইগুড়ি থানার পুলিশ ওই দুই কিশোরীকে শিলিগুড়ির নৌকাঘাট মোড় থেকে উদ্ধার করে। তাদের সঙ্গে কথা বলে পুলিশ জানতে পারে, কলকাতার এক দাদা ও দিদি সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের বলেছিল, ‘বিটিএস’–এর শিল্পীদের সঙ্গে দেখা করানোর ব্যবস্থা করে দেবে। এমনকী, প্রয়োজনে ওই ব্যান্ডে কাজ করার সুযোগও করে দেওয়া হবে। এরপরে তাদের কোনওমতে শিলিগুড়িতে পৌঁছনোর কথাও বলেছিল ওই দাদা–দিদি। সেখান থেকে ভুটান হয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় নিয়ে যাবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন তাঁরা। এমনকী, ওই দাদা–দিদি নাকি তাদের পাসপোর্ট–ভিসাও করিয়ে দেওয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। পুলিশ জানিয়েছে, ওই ছাত্রীদের নিজস্ব মোবাইল ফোন না–থাকলেও বাবা–মায়ের ফোনেই একটি অ্যাপে এই সমস্ত কথোপকথন চলত।
প্রিয় শিল্পীদের একবার দেখার জন্য গত সাত মাস ধরে ওই ছাত্রীরা ভাঁড়ে টাকা জমানো শুরু করে। এরপরে মঙ্গলবার স্কুলে যাওয়ার নাম করে বাড়ি থেকে বের হয়। তারা স্কুলের সামনেও পৌঁছয়। কিন্তু স্কুলে না–ঢুকে টোটোয় চেপে রথবাড়িতে চলে যায়। সেখান থেকে শিলিগুড়ির বাসে চাপে। এ দিকে, স্কুলে না–ঢুকে টোটোয় অন্যত্র চলে যাওয়ার বিষয়টি নজরে আসে অন্য অভিভাকদের। তাঁদের মধ্যেই কেউ ওই দুই ছাত্রীর বাবা–মাকে ফোন করে বিষয়টি জানান। এরপরেই তাঁরা থানায় খবর দেন। পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে তদন্তে নামে। স্কুল–সহ বিভিন্ন এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখে খবর দেওয়া হয় এনজেপি থানায়। বাবা–মাও শিলিগুড়ির উদ্দেশে রওনা হন।
এরপরে বাসটি রাতে শিলিগুড়িতে পৌঁছতেই ওই দুই কিশোরীকে উদ্ধার করে পুলিশ। সেই সময়ে তারা স্কুল ইউনিফর্মেই ছিল। তার পরে তাদের মালদায় ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, দুই ছাত্রী ‘বিটিএস’–এর চরম ভক্ত। এই বিষয়টাই পাচারের টোপ হিসেবে কাজে লাগায় দুষ্কৃতীরা। দুই ছাত্রীর মধ্যে এক জনের বাড়ি ইংরেজবাজার এবং অন্য জনের পুরাতন মালদা থানা এলাকায়। দু’জনেরই বাবা সরকারি স্কুলের শিক্ষক। পুলিশ জানিয়েছে, দুই ছাত্রীকে বুধবার আদালতের মাধ্যমে কাউন্সেলিংয়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ দিকে মেয়েরা ফিরে আসায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন বাবা–মায়েরা। তাঁরা বলেছেন, ‘মেয়েরা ভুল করেছে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের মেয়েদের ছবি আপলোড করে যে যার মতো পোস্ট করছেন। এটা কাম্য নয়।’
ইংরেজবাজারের প্রাক্তন বিজেপি বিধায়ক শ্রীরূপা মিত্র চৌধুরী মঙ্গলবার রাতেই এনজেপি থানায় পৌঁছন। এরপরে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে শিশু–কিশোরদের মোবাইলে আসক্তি নিয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকার বার্তা দেন। পাশাপাশি এই ঘটনায় একটি মানব পাচার চক্র যে সক্রিয়, সেই বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য এ দিন কলকাতা থেকে জ়িরো এফআইআর দায়ের করেছেন তিনি। মালদার পুলিশ সুপার অনুপম সিং জানান, কাউন্সেলিং শেষে দুই ছাত্রীকে অভিভাবকদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, এই ঘটনার পিছনে আন্তর্জাতিক একটি চক্র কাজ করছে। দুই ছাত্রী সোশ্যাল মিডিয়ায় যাদের সঙ্গে মেসেজে কথা বলেছে, তাদের এক জনের আইডি বাংলাদেশের। অন্য জনের কলকাতার।