রাতে উধাও ঘুম! বছরে ৮০ ঘণ্টা ঘুম হারাচ্ছে কলকাতা, বলছে সমীক্ষা
কলকাতা: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু তাপমাত্রা বা বৃষ্টিপাতেই সীমাবদ্ধ নয়, এবার তার প্রভাব পড়ছে মানুষের শান্তির ঘুমের উপরও। নতুন এক আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, রাতের…
কলকাতা: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু তাপমাত্রা বা বৃষ্টিপাতেই সীমাবদ্ধ নয়, এবার তার প্রভাব পড়ছে মানুষের শান্তির ঘুমের উপরও। নতুন এক আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, রাতের তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বছরে গড়ে ৮০ ঘণ্টা ঘুম হারাচ্ছেন কলকাতার (Kolkata) বাসিন্দারা। দেশের বড় শহরগুলির মধ্যে এই নিরিখে তৃতীয় স্থানে রয়েছে কলকাতা।
ক্লাইমেট সেন্ট্রাল (Climate Central) নামে একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘুম হারাচ্ছেন চেন্নাইয়ের বাসিন্দারা (৯৩ ঘণ্টা)। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মুম্বই (৮৪ ঘণ্টা) এবং তারপরেই কলকাতা (৮০ ঘণ্টা)।
জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব
গবেষণায় বলা হয়েছে, কলকাতার বছরে হারানো ৮০ ঘণ্টা ঘুমের মধ্যে প্রায় ৫ ঘণ্টা সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে। অর্থাৎ ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তাপমাত্রা-জনিত ঘুমের সমস্যার প্রায় ৭ শতাংশের জন্য দায়ী জলবায়ু পরিবর্তন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, রাতে তাপমাত্রা কম না হওয়া এবং অতিরিক্ত আর্দ্রতার প্রবণতা বেড়েছে। তারই প্রভাব পড়ছে মানুষের ঘুমের উপর।
শুধু কলকাতা নয়, বাংলার অন্যান্য শহরেও একই ছবি
সমীক্ষায় পশ্চিমবঙ্গের আরও পাঁচটি শহরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেগুলি হল হাওড়া, শিলিগুড়ি, ব্যারাকপুর, আসানসোল-দুর্গাপুর এবং হলদিয়া।
এই শহরগুলির বাসিন্দারাও বছরে গড়ে ৭৫ ঘণ্টা ঘুম হারাচ্ছেন। এর মধ্যে ৫.৬ ঘণ্টা ঘুমের ক্ষতির জন্য সরাসরি দায়ী জলবায়ু পরিবর্তন।

কেন বাড়ছে এই সমস্যা?
গবেষকদের মতে, কলকাতার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ (Urban Heat Island) প্রভাব বড় কারণ। কংক্রিটের বহুতল, পিচের রাস্তা এবং সবুজের অভাবে দিনের তাপ রাতে সহজে বেরোতে পারে না। ফলে সূর্য ডুবে যাওয়ার পরও শহরের তাপমাত্রা অনেকক্ষণ বেশি থাকে। এর সঙ্গে আর্দ্রতা যুক্ত হয়ে রাতে আরামদায়ক ঘুমে বাধা সৃষ্টি করে।
কী বলছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা?
সমীক্ষায় সতর্ক করা হয়েছে, পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শুধু ক্লান্তিই নয়, একাধিক শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে:
• স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ কমে যাওয়া
• উদ্বেগ ও অবসাদের ঝুঁকি বৃদ্ধি
• উচ্চ রক্তচাপ
• ডায়াবেটিস
• হৃদ্রোগের আশঙ্কা
গ্লোবাল ক্লাইমেট অ্যান্ড হেলথ অ্যালায়েন্সের চেয়ার এবং চিকিৎসক কোর্টনি হাওয়ার্ড বলেছেন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গরম রাতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় ঘুমের সমস্যা এখন জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠছে।
বিশ্বজুড়েও একই প্রবণতা
গবেষণায় বিশ্বের ১,৩৩৮টি শহর বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দেখা গিয়েছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বের মানুষ গড়ে বছরে প্রায় ৫৬ ঘণ্টা ঘুম হারিয়েছেন রাতের অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে। এর মধ্যে ১০ শতাংশেরও বেশি ঘুমের ক্ষতির জন্য সরাসরি দায়ী জলবায়ু পরিবর্তন।
গবেষকদের মতে, এতদিন জলবায়ু পরিবর্তনের আলোচনা মূলত বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বা তাপপ্রবাহকে কেন্দ্র করে হয়েছে। কিন্তু মানুষের স্বাস্থ্যকর ঘুম হারিয়ে যাওয়াও এখন উষ্ণায়নের অন্যতম বড় ও নীরব প্রভাব, যা ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।