‘শতাব্দীর সেরা গোল’-এর চেয়েও কেন ‘হ্যান্ড অব গড’ ফুটবলপ্রেমীদের বেশি প্রিয়?
১৯৮৬ সালের ২২ জুন, মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামে চার মিনিটের ব্যবধানে বিশ্ব ফুটবল প্রত্যক্ষ করেছিল দুটি চিরস্মরণীয় মুহূর্ত। দুটি গোলেরই রূপকার ছিলেন ফুটবল ঈশ্বর দিয়েগো আরমান্দো মারাদোনা। একটি ছিল মাঝমাঠ থেকে ৬ জন ইংলিশ ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষককে কাটিয়ে করা গোল যা ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ (Goal of the Century) বলে পরিচিত। অন্যটি ছিল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত ও আলোচিত ‘হ্যান্ড অব গড’ (Hand of God)। কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের কাছে টেকনিক্যালি নিখুঁত শতাব্দীর সেরা গোলের চেয়েও মারাদোনার সেই ‘চুরি’ করে হাত দিয়ে করা গোলটি বেশি আবেগের। কেন?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে মাঠের বাইরের রাজনীতি, ইতিহাস এবং আর্জেন্তিনার মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের মধ্যে। ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে ইংল্যান্ড এবং আর্জেন্তিনার মধ্যে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছিল, যা ফকল্যান্ডের যুদ্ধ নামে পরিচিত। সেই যুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কাছে আর্জেন্তিনা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় এবং সাড়ে ৬০০-রও বেশি আর্জেন্তাইন তরুণ সেনা নিহত হন। এই পরাজয় আর্জেন্তিনার জাতীয়তাবাদ ও আত্মসম্মানে গভীর আঘাত হেনেছিল।
তার ঠিক চার বছর পর, বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে যখন এই দুই দেশ মুখোমুখি হলো, তখন তা আর স্রেফ একটা ফুটবল ম্যাচ ছিল না। আর্জেন্তিনার মানুষের কাছে তা ছিল যুদ্ধের মাঠে হারানো ভাই ও সন্তানদের জন্য প্রতিশোধ নেওয়ার মঞ্চ।
ম্যাচের ৫১তম মিনিটে মারাদোনা যখন ইংলিশ গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে ফাঁকি দিয়ে বাঁ হাতে ঘুঁষি দিয়ে বলটি জালে জড়ালেন এবং রেফারি সেটাকে গোল বলে ঘোষণা করলেন, তখন আর্জেন্তিনার মানুষের কাছে সেটি কেবল একটি গোল ছিল না; সেটি ছিল ব্রিটিশদের অহংকার গুঁড়িয়ে দেওয়ার এক পরম মুহূর্ত। মারাদোনা নিজেই পরবর্তীকালে তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, ‘ম্যাচের আগে আমরা বলেছিলাম ফুটবলের সঙ্গে রাজনীতির কোনও সম্পর্ক নেই। কিন্তু ওটা মিথ্যা ছিল। আমরা জানতাম যে আমরা আমাদের দেশের ছেলেদের জন্য লড়ছি। ওটা কোনও সাধারণ গোল ছিল না, ওটা ছিল একটা চুরি, ব্রিটিশদের পকেট থেকে টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার মতো আনন্দ।’
শতাব্দীর সেরা গোলটি মারাদোনার অতিমানবীয় ফুটবল দক্ষতার প্রমাণ ছিল, যেটি ফুটবল ইতিহাসে কতজন করতে পারবেন তা বড় প্রশ্ন। কিন্তু ‘হ্যান্ড অব গড’ ছিল চাতুর্য, জেদ এবং প্রতিশোধের এক অনবদ্য প্রতীক। ব্রিটিশদের তৈরি করা নিয়মকে তাদেরই বিরুদ্ধে ব্যবহার করে, রেফারিদের বোকা বানিয়ে ম্যাচ জিতে নেওয়াটা ছিল আর্জেন্তিনার মানুষের জন্য এক তৃপ্তির বিষয়। মারাদোনা সেই ম্যাচে কোনও নিয়ম মেনে চলা প্লেয়ার ছিলেন না, তিনি ছিলেন আর্জেন্তিনার এক ‘নায়ক’। আর এই রাজনৈতিক ও মানসিক সমীকরণের কারণেই ফুটবলপ্রেমীদের কাছে আজও ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলটি এত বেশি জনপ্রিয় ও ভালোবাসার।