FIFA World Cup 2026: ছিয়াশির স্মৃতি, ফকল্যান্ড যুদ্ধের উত্তাপ ফিরছে মেসি-হ্যারি কেনদের লড়াইয়ে! | Argentina vs England Semifinal is like another Falkland war
– সোমনাথ দাস
কলকাতা: ১৯৮৬-র ফিফা বিশ্বকাপে মেক্সিকোর অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডের কোয়ার্টার ফাইনাল। ঈশ্বরের বাঁ পা ততদিনে দুনিয়ার দেখা হয়ে গেছে। এ ম্যাচে দুনিয়া দেখল ঈশ্বরের বাঁ হাত। না, মানে দেখা ঠিক যায়নি। রেফারি, লাইন্সম্যানেরা বুঝতেই পারেননি। ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার স্টিভ হজ বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে ভুলবশত নিজেদের পেনাল্টি বক্সের দিকে বলটি বাতাসে ভাসিয়ে দেন। বল লুফে নেওয়ার জন্য লাফিয়ে ওঠেন ব্রিটিশ গোলকিপার পিটার শিলটন। তিনি মারাদোনার চেয়ে প্রায় ৮ ইঞ্চি বেশি লম্বা। মারাদোনা জানতেন তিনি মাথায় বল পাবেন না। তাই, তিনি অত্যন্ত চতুরতার সাথে বাঁ হাতের আলতো টোকায় শিলটনের মাথার ওপর দিয়ে বল জালে পাঠিয়ে দেন। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর গোল নিয়ে প্রশ্ন করা হলে দিয়েগো সাংবাদিকদের বলেছিলেন, গোলটা হয়েছে কিছুটা মারাদোনার মাথা দিয়ে আর কিছুটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে।
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে এই ম্যাচ ছিল আর্জেন্টিনার কাছে ফকল্যান্ড যুদ্ধে হারের প্রতিশোধ নেওয়ার পালা। ১৮৩৩ সাল থেকে আর্জেন্টিনার উপকূলের কাছে দক্ষিণ আটলান্টিকের ফকল্যান্ড আইল্যান্ড ছিল ব্রিটিশদের দখলে। আর্জেন্টিনা দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছিল যে এই দ্বীপগুলো ঐতিহাসিকভাবে তাদের এবং ব্রিটিশরা তা অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে। সালটা ছিল ১৯৮২। আর্জেন্টিনায় তখন চলছে জেনারেল লিওপোল্ডো গালটিয়েরির অধীনে এক স্বৈরাচারী সামরিক সরকার। দেশজুড়ে তীব্র মুদ্রাস্ফীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থেকে মানুষের মন সরাতে তিনি জাতীয়তাবাদ উস্কে দেওয়ার চেষ্টা করেন। ফকল্যান্ডে সেনা পাঠিয়ে দেন। দ্বীপপুঞ্জে থাকা হাতে গোনা কিছু ব্রিটিশ সেনা আর্জেন্টিনার বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী তখন মার্গারেট থ্যাচার। তিনি পাল্টা ব্রিটিশ সেনার একটা বিশাল বাহিনীকে ফকল্যান্ডে পাঠান। শুরু হয়ে যায় পুরোদস্তুর যুদ্ধ। জল, স্থল ও আকাশ – তিন ফ্রন্টেই লড়াই হয়। ব্রিটিশরা আর্জেন্তিনার যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেয়। আর্জেন্টিনার বিমানবাহিনীও ব্রিটিশ নৌবহরের ব্যাপক ক্ষতি করে। শেষমেষ স্থলযুদ্ধ শুরু হলে ব্রিটিশ সেনার উন্নত সামরিক সরঞ্জামের সামনে পিছু হঠতে বাধ্য হয় আর্জেন্তিনার সেনা। যুদ্ধের ৭৪ দিনের মাথায় তারা আত্মসমর্পণ করে। জেনারেল লিওপোল্ডো ইস্তফা দেন। আর্জেন্টিনায় গণতন্ত্র ফেরে। আর লৌহমানবী আখ্যা পেয়ে মার্গারেট থ্যাচার পরের ভোটে জয়ী হয়ে আবার ব্রিটেনে ক্ষমতায় ফেরেন।
মারাদোনা তাঁর আত্মজীবনী আই অ্যাম দ্য দিয়েগো-য় লিখেছেন,
”প্রথম গোল হওয়ার পর আমার মনে হয়েছিল যে আমি যেন ইংরেজদের পকেট কেটেছি। আমরা যুদ্ধের সাথে ফুটবলকে মেলাতে চাইনি। কিন্তু, আমরা ফকল্যান্ডসের জন্য খেলেছিলাম। আমরা এমন একটা দেশকে হারিয়েছিলাম যারা আমাদের দেশের এত বড় ক্ষতি করেছে।”
সেদিনের হ্যান্ড অফ গডে ঈশ্বরের মহিমা একটুও টাল খায়নি। বিতর্কিত গোলের ঠিক ৪ মিনিট পরই ফের ঝলসে ওঠে ঈশ্বরের বাঁ পা। নিজেদের রক্ষণ থেকে বল নিয়ে একে একে ইংল্যান্ডের পাঁচজন খেলোয়াড় ও শেষে গোলরক্ষক পিটার শিল্টনকে কাটিয়ে মারাদোনা এক অবিশ্বাস্য গোল করেন। ফিফা একে শতাব্দীর সেরা গোলের স্বীকৃতি দেয়। আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে জয়লাভ করে। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে ছিয়াশির বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয় মারাদোনার আর্জেন্টিনা।