বটতলার ছোট্ট ঢিবিটায় উঠে দাঁড়ানোর মুহূর্তটা ছিল গর্বের
সঞ্জীব সামন্ত, হিউস্টন
বছরটা ২০০০। মেদিনীপুরের সাধারণ মধ্যবিত্ত এক পরিবারের ছেলের জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হলো। যে সদ্য স্কুলের গণ্ডী পেরিয়েছে তার প্রিয় মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুল (বালক) থেকে। যেখানে ঘরের বাইরে প্রথম বন্ধু পেয়েছিল সে। আর পেয়েছিল বিশাল এক বটগাছ। যার তলায় দাঁড়িয়ে শুরু হয়েছিল তার স্বপ্ন দেখা, স্বপ্ন বোনা। সেদিনের সেই ছেলেটাই আজকের আমি।
বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোনোর দিন প্রধান শিক্ষক যখন নাম ঘোষণা করতেন, তখন সেই বটতলার ছোট্ট উঁচু ঢিবিটায় উঠে দাঁড়ানোর মুহূর্তটা আমার কাছে ছিল বিশাল গর্বের। ছোট্ট সেই আমির কাছে সেটাই ছিল সাফল্যের প্রথম স্বাদ। তার পরে বুকভরা আশা আর চোখে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে প্রথম বাড়ির বাইরে পা রাখা। গন্তব্য বাঁকুড়া উন্নয়নী ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং। আমার ছোটবেলার নানা খুনসুটির শহরটা সেদিন চুপচাপ তাকিয়ে দেখেছিল আমার চলে যাওয়া। তার সেই চোখ যেন জানতে চেয়েছিল, ‘আমাদের ফেলে কোথায় যাচ্ছো? আমরা কি তোমার কেউ নই’!
ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শেষ করে আবার ঠাঁইনাড়া হলাম। এ বার হায়দরাবাদে। সফটঅয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সত্যম কম্পিউটার সার্ভিসে যোগ দিলাম। জীবনের প্রথম চাকরি, নতুন শহর, নতুন কাজ, নতুন স্বপ্ন। ধীরে ধীরে সেটাই হয়ে উঠল আমার জগৎ।
বাইরে থেকে আপাত ভাবে সব স্থির, সব প্রতিষ্ঠিত, ঠিকঠাক। তবু মনটা পড়ে থাকত মেদিনীপুরেই। বছর ঘুরে শরৎ এলেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠত এক অদ্ভুত টানে। পুজো আসছে। আগেভাগেই ছুটির আবেদন, টিকিট কাটা, আর দিন গোনা- কবে বাড়ি ফিরব! পুজো তো শুধু উৎসব নয়, পুজো মানেই বাড়ি, শিউলি ফুল কুড়োনো, ঢাকের আওয়াজ, ঝলমলে প্যান্ডেলে পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা। যেখানে আড্ডা, অভিমান সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত চায়ের ভাঁড়ে। সেই দিনগুলো এখনও আমার কাছে সোনার ফ্রেমে বাঁধানো মধুর স্মৃতি।
২০১১য় এক অফিসিয়াল অ্যাসাইনমেন্টে এলো আমেরিকায় যাওয়ার সুযোগ। তখনও ভেবেছিলাম কয়েক বছর পরে ফিরে আসব নিজের শহরে, আপনজনদের কাছে। বিধাতা অলক্ষ্যে হেসেছিলেন। সময় আর আমার ইচ্ছামতো চলেনি। একের পর এক প্রজেক্ট। দায়িত্ব বাড়ল। সময় গড়াল। নিজের অজান্তেই কখন জানি না আটকে গেলাম প্রবাসী জীবনে। বর্তমানে আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। বড় বাড়ি, বিশাল ব্যাকইয়ার্ড, একাধিক গাড়ি। স্ত্রী, রাজকন্যার মতো ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে আমার স্বচ্ছল জীবন। সবই আছে।
কিন্তু সত্যিই কি সব আছে! হাজার হাজার মাইল দূরে বসে যখন দেখি স্কুলের বন্ধুরা রিইউনিয়নে মিলিত হচ্ছে, পিকনিকে যাচ্ছে, খুনসুটিতে মাতছে বুকের ভিতরটা হু হু করে ওঠে। মনে পড়ে যায় দিঘার সৈকতে বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো দিনগুলো। চোখের কোণটা ভিজে যায়। বাবার কথা মনে পড়ে। বাবা এখন দিদির কাছে মেদিনীপুরেই থাকেন। অন্য দুই দিদি কলকাতায়। আমার অনুপস্থিতি বাবাকে এক মুহূর্তের জন্যও একাকী করতে পারে না দিদিদের জন্য। শুধু দায়িত্ব নেয়নি, ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখেছে যত্নে। এই কৃতজ্ঞতা অবর্ণনীয়। যত দিন যাচ্ছে, সন্তানের ভবিষ্যৎ, পেশাগত দায়িত্ব- সব মিলিয়ে ফেরার পথটা যেন আরও কঠিন হচ্ছে।
তবুও মনে জেগে থাকে মেদিনীপুর। মন পড়ে থাকে সেখানকার অলিগলিতে। যখনই মেদিনীপুরে ফেরার সুযোগ ঘটে, নিজের স্কুল আর সেই বটগাছটার তলায় একবার দাঁড়াই। এখানেই তো শুরু হয়েছিল আমার স্বপ্ন দেখা। বিশাল বটগাছটার গায়ে মুখ লাগিয়ে বলি, ‘শুনছো, আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে’। হাওয়ায় দুলতে থাকা ডালপালাগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হয়, আমার কথা শুনেছে। বলছে, ‘সঞ্জীব, তুমি কি সত্যিই সুখী?’ যন্ত্রণায় বুজে আসে গলা। আমি উত্তর দিতে পারি না। জলে চোখ ভিজে যায়। এ আমার অনুতাপের গল্প নয়। এ আমরা জীবনবোধ। জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্যও কখনও কখনও ছোট হয়ে যায়। যখন হৃদয়টা পড়ে থাকে মেদিনীপুরের এক বটতলার ছায়ায়।
অনুলিখন: সুমন ঘোষ