বেড়াতে গিয়ে খুলে বসলেন রেস্তোরাঁ, ইডলি-দোসায় কাশ্মীরিদের মন জিতে নিলেন তরুণী
সোলো ট্রিপে বেরিয়েছিলেন। তামিলনাড়ু থেকে সোজা কাশ্মীর। কিন্তু বেড়াতে গিয়ে যে কেউ ব্যবসা ফেঁদে বসতে পারে, সেটা বছর সাতাশের সিন্ধুকে না দেখলে বোঝার উপায় নেই। ২০২২-এ সাধারণ পর্যটক হিসেবে কাশ্মীরে গিয়েছিলেন তিনি। এখন শ্রীনগরে দুটি রেস্তোরাঁর মালিক। খাঁটি দক্ষিণ ভারতীয় খাবার, ইডলি-দোসা বিক্রি করেন। তাঁর রান্না চেটেপুটে খাচ্ছেন কাশ্মীরিরা। সঙ্গে ট্রাভেলের ব্যবসাও সামলাচ্ছেন।
২০১৮ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় লরি চালক বাবার। সিন্ধুর কাঁধে এসে পড়ে পুরো পরিবারের দায়িত্ব। একা হাতেই সব সামলাতেন তিনি। কিন্তু ঘোরার নেশা ছাড়তে পারেননি। কোভিড বিধিনিষেধ শিথিল হতেই ২০২১-এর ফেব্রুয়ারিতে পৌঁছে যান জম্মু-কাশ্মীরে। তখনই দেখেন, অনেক তামিল পরিবারই উপত্যকায় বেড়াতে এসে মনের আনন্দে ঘুরছেন ঠিকই, কিন্তু খাবারদাবারের সঙ্গে যেন ঠিক মানিয়ে নিতে পারছেন না। তখনই আইডিয়াটা মাথায় আসে।
প্রথমে অবশ্য ট্রাভেল ব্লগ বানাতেন সিন্ধু। নতুন জায়গা, নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতেন। তাঁর নিজের রাজ্য অর্থাৎ তামিলনাড়ুর লোকজন দু’হাত তুলে সমর্থন করেছেন তাঁকে। সিন্ধুর কথায়, ‘অনেকের মুখে শুনেছি, তাঁরা আমার ভিডিয়ো দেখার পরে কাশ্মীরে বেড়াতে এসেছেন।’ এটাকে বড় করে ভাবতে গিয়ে টুর অ্যান্ড ট্রাভেলের ব্যবসা খুলে ফেলেন তিনি।
বর্তমানে তাঁর ট্রাভেল কোম্পানিতে প্রায় ২৪ জন কর্মী কাজ করছেন। তামিলনাড়ুর ১,০০০-এরও বেশি পরিবার তাঁর কোম্পানির সঙ্গে কাশ্মীর এসেছে। সিন্ধু খুশি, ‘তাঁরা যখন দেখেন, একজন তামিল মেয়ে ইতিমধ্যে এখানে ব্যবসা করছে, তাঁরা নিরাপদ বোধ করেন।’ গাইড হয়ে ঘুরতেন তামিল পরিবারগুলির সঙ্গে। তখনই একটা আজব সমস্যা লক্ষ্য করেন সিন্ধু, ‘এখানকার খাবার সম্পূর্ণ আলাদা। অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়তেন। কেউ কেউ আবার কাশ্মীরে এসে ইডলি দোসা খুঁজতেন।’
বাঙালি যেমন যেখানেই যাক না কেন, হোটেলে ঢুকে আগে দেখবে মাছ-ভাত আছে কি না, এও তাই। সিন্ধুর কথায়, ‘ভাবলাম ছোট করেই একটা শুরু করি। পর্যটকরা সেখানে ইডলি খাবেন।’ সেই শুরু। আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। বরং যা ঘটল, তাতে অবাক হয়ে গিয়েছিলে সিন্ধু নিজেই। হাসতে হাসতে বললেন, ‘দু’-তিন মাসের মধযে দেখলাম আমার ৯০ শতাংশ গ্রাহকই স্থানীয় কাশ্মীরি।’
সিন্ধুর দোসার জনপ্রিয়তা এখন আর রেস্তোরাঁর চার দেওয়ালে সীমাবদ্ধ নেই। সম্প্রতি একটি কাশ্মীরি বিয়েতেও ডাক পেয়েছিলেন তিনি। ঐতিহ্যবাহী ‘ওয়াজওয়ান’-এর পাশে ছিল তাঁর দোসার কাউন্টার। সে কি হুড়োহুড়ি। নিমেষের মধ্যে ১,০০০-এর বেশি দোসা নিঃশেষ। এমনকী মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ এবং ফারুক আবদুল্লাহও তাঁর রেস্তোরাঁয় এসেছেন। সিন্ধুর প্রশংসায় পঞ্চমুখ তাঁরাও।
বর্তমানে প্রায় ডজনখানেক স্থানীয় কর্মীকে দক্ষিণ ভারতীয় রন্ধনশিল্পের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন তামিল কন্যা সিন্ধু। তাঁর দোসা এখন আর নিছক খাবার নয়। বরং তামিলনাড়ু আর কাশ্মীরের মধ্যে এক টুকরো সাংস্কৃতিক সেতু।