‘মার না খেলে পেটের ভাত হজম হতো না’, মা তনুজার পেরেন্টিং সম্পর্কে কী জানালেন কাজল?
‘জেন্টল পেরেন্টিং’, শিশুদের মানসিক স্বাধীনতা কিংবা স্পেস দেওয়া— বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে এই শব্দগুলো যতটা পরিচিত, ন’য়ের দশকের প্রেক্ষাপটে তা ছিল ঠিক ততটাই দূরের। কোনও কিছুই সহজলভ্য ছিল না। কিছু পেতে গেলে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হতো। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের ছোটবেলার এমনই এক কঠোর এবং কড়া শৃঙ্খলার স্মৃতি হাতড়ালেন বলিউড অভিনেত্রী কাজল। অভিনেত্রী জানান, তাঁর মা, কিংবদন্তি অভিনেত্রী তনুজা অত্যন্ত কড়া শাসনে রাখতেন।
কাজলের কথায়, ‘আমার মা ভীষণ কড়া ছিলেন। ছোটবেলায় আমায় প্রচুর মেরেছেন। মায়ের ধারণা ছিল, দিনে দু-একবার মার না খেলে আমার নাকি পেটের ভাত হজম হতো না। মা হাতের কাছে যা পেতেন, তা দিয়েই মারতেন। এমনকী আমার দিদাও আমাকে বই ছুড়ে মেরেছেন। তবে এই মারধরকে একেবারেই নেতিবাচক ভাবে দেখছেন না কাজল। তিনি যোগ করেন, ‘আমার বড় হয়ে ওঠাটা দারুণ ছিল। মা আমাকে জীবনের কঠিন বাস্তবের সঙ্গে লড়াই করার জন্য একেবারে তৈরি করে দিয়েছিলেন।’
কড়া শাসন নাকি অত্যাচার?
কাজলের এই মন্তব্য নিয়ে ইতিমধ্যেই চর্চা শুরু হয়েছে সব মহলে। একদল অভিভাবক মনে করেন, সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করতে মারধরের গুরুত্ব অপরিসীম। অন্যদলের বক্তব্য, এতে আখেরে লাভ কিছুই হয় না। উল্টে বাচ্চারা আরও জেদি, একগুঁয়ে হয়ে ওঠে। এখনকার মনোবিদরা কিন্তু এই ‘মারধর’ বা অতিরিক্ত কঠোর শাসনকে একেবারেই সমর্থন করছেন না। তাঁদের মতে, শাসনের নামে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ বা শারীরিক নির্যাতন শিশুর মনে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষত তৈরি করে।
এর ক্ষতিকর দিকগুলো কী কী?
-
মানসিক নিরাপত্তাহীনতা: কড়া শাসনের মধ্যে বড় হওয়া শিশুরা নিজের বাড়িতেই সুরক্ষিত বোধ করে না। এর ফলে বড় হয়ে তারা কাউকে সহজে বিশ্বাস করতে পারে না।
-
আবেগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা: শৈশবের ট্রমা বা ক্রনিক স্ট্রেস বড় বয়সে অতিরিক্ত রাগ, হতাশা বা আবেগ নিয়ন্ত্রণে অক্ষমতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
-
হীনম্মন্যতা ও ভয়: সারাক্ষণ ভুলের শাস্তির ভয়ে থাকলে শিশুর আত্মবিশ্বাস (Self-esteem) নষ্ট হয়। তারা নতুন কোনও সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পায় এবং নিজেদের মূল্যহীন মনে করতে শুরু করে।
শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য নিয়ম বা বাউন্ডারি তৈরি করা জরুরি। কিন্তু সমস্যা তখন হয় যখন বাবা-মা সন্তানের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, মেলামেশা বা কাজকে ‘মাইক্রোম্যানেজ’ বা অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ করতে যান। অবাস্তব প্রত্যাশা এবং সবসময় ‘পারফেক্ট’ হওয়ার চাপ দিলে শিশুরা মানসিক ভাবে হাঁপিয়ে ওঠে। এর ফলে শিশুরা হয় পুরোপুরি বিদ্রোহী হয়ে ওঠে, না হয় বাবা-মায়ের থেকে নিজেদের আবেগগত ভাবে গুটিয়ে নেয়।
পেরেন্টিংয়ে ভারসাম্য আনবেন কী ভাবে?
১. স্পষ্ট ও যৌক্তিক নিয়ম: সন্তানের বয়স অনুযায়ী নিয়ম তৈরি করুন এবং সেই নিয়ম ভাঙলে কী পরিণতি হতে পারে, তা বুঝিয়ে বলুন।
২. খোলামেলা আলোচনা: বাড়িতে এমন পরিবেশ তৈরি করুন যাতে সন্তান ভয় না পেয়ে নিজের মনের সব কথা আপনার সঙ্গে শেয়ার করতে পারে।
৩. স্বাধীনতা: নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে থেকে সন্তানকে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে দিন। বয়স অনুযায়ী তাদের ছোটখাট ঝুঁকি নিতে শেখান।
৪. ফলাফল নয়, চেষ্টাকে বাহবা দিন: সন্তান সবসময় ফার্স্ট হবে, এমন অবাস্তব জেদ না ধরে, তার পরিশ্রম ও প্রচেষ্টাকে প্রশংসা করুন। এতে তাদের মানসিক বিকাশ ঘটবে।
৫. সহযোগী হোন, নিয়ন্ত্রক নয়: সন্তানকে মানসিকভাবে সাপোর্ট করুন, কিন্তু তার জীবনের চালক হতে যাবেন না।