FIFA World Cup 2026, Argentina vs Cabo Verde Highlights: কেপ ভার্দের হারে ম্লান আর্জেন্টিনার জয়, বিশ্বকাপে রূপকথা লিখে গেলেন ভোজিনহারা! | Argentina beats Cabo Verde in the round of 32 match of FIFA World Cup but Vozinha steals the spotlight
আর্জেন্টিনা – ৩ (মেসি, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, দিনেই আত্মঘাতী) : কেপ ভার্দে – ২ (দেরয়, সিডনি)
মায়ামি: স্কোরবোর্ড বলছে আর্জেন্টিনা – ৩, কেপ ভার্দে – ২ (Argentina vs Cabo Verde) । কিন্তু শনিবার ভোররাতে উঠে যাঁরা এই ম্যাচ দেখেছেন, তাঁরা জানেন, স্কোরটা হওয়া উচিত আর্জেন্টিনা – ৩, কেপ ভার্দে – ১০০। না, কোনও গোলসংখ্যার বিচারে এই কথা বলা হচ্ছে না। বলা হচ্ছে কেপ ভার্দের সাহসের প্রশংসা করে। একটু হলেই আজ, শনিবার মায়ামির (Miami) মাঠে অঘটন ঘটিয়ে দিচ্ছিল কেপ ভার্দে। একটা ৫ লক্ষ জনসংখ্যার দেশ, যারা ফিফা স্ট্যাটাস পেয়েছে ১৯৮৬ সালে। সেই বছরেই আবার মারাদোনার (Maradona) ঐশ্বরিক ক্ষমতাবলে বিশ্বকাপ জয় করেছিল আর্জেন্টিনা। কী আশ্চর্য সমাপতন! অথচ, আজ এই দলই প্রায় হারিয়ে দিচ্ছিল আর্জেন্টিনাকে। বিদায় ঘটিয়ে দিচ্ছিল লিওনেল মেসির। এতক্ষন ধরে বলা সবকিছুই হতে পারত। হল না, স্রেফ আর্জেন্টিনার ভাগ্যের বলে।
মায়ামির স্টেডিয়ামে প্রায় জন্ম নিয়েই নিচ্ছিল এক রূপকথা, কিন্তু ঠিক তখনই স্বপ্নভঙ্গ। স্রেফ সংযম, অভিজ্ঞতার বলে ম্যাচ পকেটে পুরল আর্জেন্টিনা। ঘানার তান্ত্রিকের মুখে ছাই দিয়ে শেষ ১৬তে লিওনেল স্কালোনির দল। যে তান্ত্রিক বাজি ধরেছিলেন, এই ম্যাচে জিততে চলেছে কেপ ভার্দে। কিন্তু হেরে গেলেন ভোজিনহারা। অবশ্য, বলিউডের বাদশা শাহরুখ খান তো কবেই বলে গিয়েছেন,“হারকর জিতনে ওয়ালোকো বাজিগর কেহতে হ্যায়।” তাই আজ ম্যাচ হেরেও মন জিতলেন ভোজিনহারা। চোখের জলে বিশ্বকাপকে বিদায় জানালেও বিজয়ীর সম্মান পেয়ে মাঠ ছাড়লেন তাঁরা।
অনেক বড় বড় আর্জেন্টিনা সমর্থক সোশ্যাল মিডিয়ায় বলছেন, আজ আর্জেন্টিনা নয়, জয়ের যোগ্য দাবিদার ছিল কেপ ভার্দে। যেভাবে তারা খেলছিল, যেভাবে বারবার পিছিয়ে পড়েও ম্যাচে ফিরে আসছিল, তাতে আজ টাইব্রেকারে ম্যাচ গেলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকত না। ম্যাচের শুরু থেকেই প্রবল পরাক্রমী আর্জেন্টিনাকে আটকে রেখেছিল এই ৫ লক্ষ জনসংখ্যার দেশটি। তবে প্রথম জলপানের বিরতির পর অবশেষে গোলের দেখা পায় আর্জেন্টিনা। গোল করলেন সেই মেসি। এই বিশ্বকাপে মেসি বারবার মনে করাচ্ছেন ২০১১-১২র সেই বার্সেলোনার ঘাতক মেসিকে, যে একাই বিপক্ষের বক্সে ঢুকলে বিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ‘শ্যাম রাখি না কূল রাখি’ অবস্থা হত। ২৯ মিনিটের মাথায় লিসান্দ্রো মার্টিনেজের লম্বা পাস এক পায়ে নিয়ন্ত্রণ করে টপ বক্সে মেরে পরাস্ত করেন ভোজিনহাকে। এই গোলের ফলে কেরিয়ারে বিশ্বকাপে ২০ গোল হয়ে গেল তাঁর। চলতি বিশ্বকাপে সপ্তম।
দ্বিতীয়ার্ধে দুরন্তভাবে ম্যাচে ফেরে কেপ ভার্দে। ৫৯ মিনিটে দেরয় দুয়ার্তে দুরন্ত গোল করে সমতা ফেরান। এরপরেই সম্পূর্ণ ডিফেন্সে নেমে যায় কেপ ভার্দে। একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ করতে শুরু করেন ভোজিনহা। মেসির বাঁকানো ফ্রি-কিক ঝাঁপিয়ে বাঁচান তিনি। একবার তাঁকে বক্সে একা পেয়েও গোল করতে ব্যর্থ হন মেসি। ৯০ মিনিট অবধি স্কোর সমান থাকায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানে আবার গোল। ৯২ মিনিটে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের গোলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু, ২ গোল খেয়েও পিছিয়ে পড়েনি কেপ ভার্দে। উল্টে, হার না মানা এক লড়াই শুরু করে তারা। ১০৩ মিনিটের মাথায় সিডনি লোপেজ কাবরাল বক্সের বাইরে থেকে এক দুর্দান্ত কার্লার শটে বল জালে জড়িয়ে দেন। খুব সম্ভবত, এই বিশ্বকাপের সেরা গোল করে ফেললেন তিনি। ১১১ মিনিটের মাথায় মেসির কর্নার থেকে ভেসে আসা বল মাথায় ছুইঁয়ে গোল করে যান আর্জেন্টিনার ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো। দিনেই বোর্জেসের গায়ে লেগে বল ঢোকে গোলে। সেটিকে আত্মঘাতী গোল দেন রেফারি। এখানেই ৩-২ পিছিয়ে যায় কেপ ভার্দে। এরপর বেশ কিছু চেষ্টা করলেও তাদের পক্ষে আর ম্যাচে ফেরা সম্ভব হয়নি।
ম্যাচ শেষ হতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন কেপ ভার্দের খেলোয়াড়রা। কিন্তু আজকের ম্যাচে বারবার আর্জেন্টিনার ডিফেন্সের ভুলগুলো চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে গেল কেপ ভার্দে। বুঝিয়ে গেল, আর্জেন্টিনার এখনও ‘অতিরিক্ত মেসি নির্ভরতা’ কাটেনি। দেখাল, আর্জেন্টিনার ডিফেন্সে অনেক ফাঁক। শেষ ১৬তে মেসিদের মুখোমুখি সালাহদের মিশর। কিন্তু ম্যাচের পর থেকে চর্চায় একজনই। ভোজিনহা। দিন কয়েক আগেই তিনি বেলছিলেন,“অনেকেই চায়না যে আমরা জিতি। কিন্তু আমরা সব পরিসংখ্যান বদলে দেব।” আজ সেটাই করলেন তাঁরা। তাই মেসির গোল, তান্ত্রিকের ভবিষ্যদ্বাণী টপকেও আলোচনা হচ্ছে কেপ ভার্দেকে নিয়েই। কিভাবে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে আসা একটা দলের বিরুদ্ধে কেঁদে-কঁকিয়ে-গড়াগড়ি খেয়ে ম্যাচ জেতে আর্জেন্টিনা, সেই নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন আর্জেন্টিনা সমর্থকরা।
আজ কেপ ভার্দে হেরেছে। কিন্তু অসম লড়াই করেছে। ডেভিড বনাম গোলিয়াথ এর লড়াইটা জানেন তো? যেখানে ডেভিড জিতবে, কিন্তু গোলিয়াথ বারবার তাদের রক্তাক্ত করবে। বারবার কড়া প্রশ্ন ছুঁড়ে দেবে। বারবার চোখের জলে, নাকের জলে করে ছাড়বে শ্রেষ্ঠদের। ম্যাচের ফল কী হত, সে যতই সবাই আগে থেকে জানুক না কেন, কেপ ভার্দে যে ছেড়ে কথা বলবে না, ১২০ মিনিট অবধি আটকে রেখে দেবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের, তা জানা ছিল না। স্বাভাবিক, আজ লড়াই করেছে কেপ ভার্দে। তাই হেরে গিয়েও জিতে যান ভোজিনহারা। ফুটবল সমর্থকরা তাঁদের হার দেখে চোখের জল ফেলেন। তাদের বিদায়ে মন ভেঙে যায় রাত জেগে ম্যাচ দেখা জনৈক ফুটবল সমর্থকের। আর্জেন্টিনা সমর্থক হয়েও তাঁদের প্রশংসায় ভরিয়ে দেন তাঁরা। ম্যাচ শেষের পর গোটা স্টেডিয়াম মাঠে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধায়, সম্মানে হাততালি দেয়। খেলায় হার-জিৎ থাকেই, কিন্তু কেপ ভার্দে প্রমাণ করল, শেষ বাঁশি বাজার আগে লড়াই থামাতে নেই। সেই কী মাঠে হোক, কী জীবনে।