E20 Myth: গাড়ি-বাইকে E20 ঢাললেই কি মাইলেজ কমে যাচ্ছে? জং ধরছে ইঞ্জিনে? সব প্রশ্নের জবাব মিলল এবার… | E20 ethanol blending facts vs misinformation govt clears all questions about milage drop corrosion claim
ই২০ ব্যবহারে কি সত্যি ইঞ্জিনে ক্ষতি হয়?Image Credit: PTI
নয়া দিল্লি: নিঃশব্দে ঘাতক হয়ে উঠেছে দূষণ। বর্তমানে বায়ুদূষণ বিভিন্ন জটিল রোগ ও অসুস্থতার অন্যতম কারণ। পেট্রোল-ডিজেল থেকে দূষণ হয় ব্যাপক মাত্রায়। এর বিকল্প হিসাবেই, ক্লিন এনার্জি হিসাবে ই২০ (E20) আনা হয়েছে। তবে সম্প্রতিই ২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা দাবি করা হচ্ছে। কেউ বলছেন, ই২০ (E20) ব্যবহারের পরই মাইলেজে হঠাৎ করে পতন হচ্ছে। কোথাও আবার ভাইরাল ভিডিয়োয় দাবি করা হয়েছে যে ইঞ্জিনে মৌমাছি বসছে ই২০ ব্যবহারের পর। একাধিক এই বিভ্রান্তিকর দাবি এবার সরাসরি খারিজ করল কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক। সরকারের দাবি, গাড়ির ইঞ্জিন নষ্ট হওয়া, মাইলেজে বড় পতন, বিমা বা ওয়ারেন্টি বাতিল হয়ে যাওয়া কিংবা পেট্রোলে জল ঢুকে পড়ার মতো অভিযোগের কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে এডিট করা ভিডিয়ো, বিভ্রান্তিকর পোস্ট ও চটকদার শিরোনামের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে অযথা আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। তাই নাগরিকদের সরকারি বিজ্ঞপ্তি, তেল বিপণন সংস্থা (OMC), গাড়ি নির্মাতা সংস্থা এবং স্বীকৃত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্যের ওপরই ভরসা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কী বলছে সরকার?
১ লিটার ইথানল তৈরিতে সত্যিই কি ১০,০০০ লিটার জল লাগে?
সরকারের বক্তব্য, এই দাবি সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। কৃষকরা ইথানলের জন্য নয়, বরং ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (MSP) এবং খাদ্য কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়ার (FCI) নিশ্চিত ক্রয়ের কারণে ধান ও গম চাষ করেন। দেশের খাদ্য নিরাপত্তার চাহিদা পূরণের পর যে উদ্বৃত্ত চাল থাকে, তারই একটি অংশ ইথানল তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।
এছাড়া একটি আধুনিক ইথানল কারখানায় ১ লিটার ইথানল উৎপাদনে মাত্র ৩ থেকে ৫ লিটার প্রক্রিয়াজাত জল লাগে। অধিকাংশ কারখানাতেই জিরো লিকুইড ডিসচার্জ (ZLD) প্রযুক্তি ব্যবহার করে জল পুনর্ব্যবহার করা হয়। সরকার আরও জানিয়েছে, বর্তমানে ইথানল উৎপাদনের ৪০ শতাংশের বেশি আসে ভুট্টা থেকে, যা ধানের তুলনায় অনেক কম জল ব্যবহার করে।
E20 কি কোনও ‘পরীক্ষা’?
অনেকেরই দাবি, E20 জ্বালানি এখনও পরীক্ষামূলক স্তরে রয়েছে। দেশবাসীর ওপর এটি প্রয়োগ করা হচ্ছে। সরকারের বক্তব্য, এই দাবিও ভুল। ইথানল নতুন কোনও জ্বালানি নয়। ১৯০৮ সালে তৈরি ফোর্ডের মডেল টি (Model T) গাড়িও ইথানলে চলতে পারত।
বর্তমানে আমেরিকায় E10 জ্বালানি, E15-এর ব্যবহারও দ্রুত বাড়ছে। ব্রাজিলে ইতিমধ্যেই E27 বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং সেটিকে প্রায় ৩৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও কানাডা, জাপান, থাইল্যান্ড এবং ইউরোপের একাধিক দেশেও ইথানল মিশ্রিত জ্বালানির ব্যবহার চলছে। ফলে ভারতের E20 কর্মসূচি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
E20 ব্যবহারে কি মাইলেজ অনেক কমে যায়?
বিভিন্ন গাড়ি ও বাইকচালক দাবি করছেন, E20 ব্যবহারের পরই গাড়ির মাইলেজে বড় ধরনের পতন হচ্ছে। সরকারের বক্তব্য, এই দাবি সম্পূর্ণ ভুয়ো। ARAI, IOCL, IIP-দেহরাদুন এবং SIAM-এর যৌথ গবেষণায় ৪০ হাজার কিলোমিটার গাড়ি এবং ২০ হাজার কিলোমিটার দু’চাকার যান পরীক্ষা করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখযোগ্য কোনও নেতিবাচক বা নেগেটিভ প্রভাব দেখা যায়নি।
সরকারের মতে, গাড়ির মাইলেজ শুধু জ্বালানির ওপর নির্ভর করে না। চালানোর ধরন, ইঞ্জিনের রক্ষণাবেক্ষণ, টায়ারের চাপ, হুইল অ্যালাইনমেন্ট এবং এসি ব্যবহারের মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। বরং ইথানলের উচ্চ অকটেন মানের কারণে E20-উপযোগী গাড়িতে ভালো অ্যাক্সিলারেশন এবং উন্নত ড্রাইভিং অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়।
E20 কি ইঞ্জিনের ক্ষতি করে?
বহু ভিডিয়ো ও পোস্টে দাবি করা হচ্ছে যে E20 ব্যবহারের কারণে গাড়ির ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশে ক্ষয় হয়। সরকার এই বিষয়ে জানিয়েছে, ২০১৪ সালে সরকার ARAI-কে এই বিষয়ে বিশেষ গবেষণার দায়িত্ব দেয়। গবেষণায় দেখা যায়, E20 ব্যবহারে ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা, স্টার্টিং, ধাতব বা প্লাস্টিকের যন্ত্রাংশে কোনও উল্লেখযোগ্য সমস্যা দেখা যায়নি।
শুধুমাত্র কিছু পুরনো গাড়িতে রাবারের কিছু অংশ বা গ্যাসকেট তুলনামূলক আগে বদলাতে হতে পারে। এছাড়া E20 ব্যবহারে কার্বন মনোক্সাইড এবং হাইড্রোকার্বন নির্গমনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। সরকার জানিয়েছে, ভবিষ্যতে E20-এর চেয়ে বেশি ইথানল মিশ্রণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে, তা বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরেই হবে।
E20 ব্যবহার করলে কি বিমা বা ওয়ারেন্টি বাতিল হবে?
অনেকের দাবি, E20 ব্যবহারে গাড়ির বিমা ও ওয়ারেন্টি আর কার্যকর থাকবে না। সরকারের বক্তব্য, এই দাবিরও কোনও ভিত্তি নেই। বিমা সংস্থা এবং গাড়ি নির্মাতা সংস্থাগুলি স্পষ্ট জানিয়েছে, E20 ব্যবহারের ফলে বিমা বা ওয়ারেন্টির বৈধতায় কোনও প্রভাব পড়বে না।
গাড়ি নির্মাতাদের সংগঠন SIAM-ও জানিয়েছে, নির্ধারিত মানের E20 জ্বালানি ব্যবহার করলে প্রস্তুতকারকের ওয়ারেন্টি বহাল থাকবে।
E20 পেট্রোলে কি পিঁপড়ে বা মৌমাছি আসে?
সোশ্য়াল মিডিয়ায় ভাইরাল অনেক ভিডিয়োয় দাবি করা হয়েছে, E20-তে আখ ব্যবহার করায় এতে চিনি থাকে। সেই কারণে গাড়ির ফুয়েল ক্যাপের কাছে পিঁপড়ে বা মৌমাছি ভিড় করছে। ভারত পেট্রোলিয়াম (BPCL) জানিয়েছে, এই দাবির কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। জ্বালানিতে ব্যবহৃত ইথানল এমন প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়, যেখানে কোনও চিনি অবশিষ্ট থাকে না। বরং এতে এমন রাসায়নিক উপাদান থাকে, যা পোকামাকড়-কে দূরে রাখে।
ই২০-তে পেট্রোলের গন্ধই প্রধান থাকে এবং E20 থেকে সাধারণ পেট্রোলের তুলনায় কম বাষ্প তৈরি হয়। ফলে পিঁপড়ে বা মৌমাছি আকৃষ্ট হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
এছাড়া E20 ব্যবহারের ফলে গাড়ির ফুয়েল ট্যাঙ্কে জল ঢুকে যায়- এমন দাবিও ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রক। আধুনিক গাড়ি এবং পেট্রোল পাম্পে জল প্রবেশ রোধে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে।
সুপ্রিম কোর্টে মামলা-
সরকার স্পষ্ট করেছে, সুপ্রিম কোর্টে চলা মামলাটি E20 প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে ছিল না। সেখানে ইথানল ক্রয় সংক্রান্ত চুক্তির কিছু আইনি দিক নিয়ে শুনানি হচ্ছিল। E20 প্রকল্পকে সরকার “পরীক্ষামূলক” বলেছে-এমন দাবি সম্পূর্ণ ভুল এবং বিভ্রান্তিকর। সরকারের বক্তব্য, ভবিষ্যতে E20-এর চেয়েও বেশি ইথানল মিশ্রণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও গাড়ি নির্মাতা সংস্থার সঙ্গে পরামর্শের পরেই হবে।