বিপজ্জনক বাড়ি নিয়ে পুরোনো ফাইল কি খুলবে পুরসভা?
রূপক মজুমদার, বর্ধমান
বর্ধমান পুরসভা এলাকার বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডেই বহু পুরোনো বাড়ি বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। ইতিমধ্যেই দু’তিনটি বাড়ি ভেঙেও পড়েছে। তবে সেগুলির কোনওটা রাতে বা ভোরের দিকে ভাঙায় বড় কোনও দুর্ঘটনা ঘটেনি। শেষপর্যন্ত বুধবার সকালে তেলমারুই পাড়ার একটি শতাব্দী প্রাচীন বাড়ি (স্থানীয়দের কাছে ‘লালবাড়ি’ নামে পরিচিত) ভেঙে পড়ার পরে তৎপর হয়েছে পুরসভা। বুধবারই ওই বাড়ির মালিককে বাড়ি ভেঙে ফেলার নোটিস ধরানো হয়েছে।
এর আগে ২০২১-এর ডিসেম্বরে বোর্ড অফ কাউন্সিলের বৈঠকে পুরসভা এমন বাড়িগুলি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। বিভিন্ন ওয়ার্ডের কাউন্সিলাররা বহু পুরোনো বিপজ্জনক বাড়ির কথা উল্লেখ করেছিলেন। কোথাও শরিকি বিবাদের জেরে, আবার কোথাও আর্থিক অভাবের কারণে মালিকরা বাড়ি সারাতে পারছেন না বলেও আলোচনা হয়। সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তালিকা তৈরি করে মালিকদের নোটিস দেওয়া হবে এবং জরুরি ভিত্তিতে মেরামতি বা ভেঙে ফেলার ব্যবস্থা হবে। কিন্তু বৈঠক শেষেই সব ফাইল চাপা পড়ে যায়।
পরে আলমগঞ্জ, নীলপুর ও সদরঘাট এলাকায় তিনটি পুরোনো বাড়ি ভাঙা হলেও, তা পুরসভা করেনি। শহরের এক প্রভাবশালী প্রোমোটার সেগুলি ভেঙে ফ্ল্যাট তৈরি করেন। বড়নীলপুরের বাসিন্দা অশোক সাহা এই প্রসঙ্গে ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ‘আপনারা সবাই জানেন খোকন দাসের সঙ্গে কোন প্রোমোটারের ঘনিষ্ঠতা বেশি ছিল। তাঁকে বরাত পাইয়ে দেওয়ার জন্যই আমাদের এলাকায় দু’টি পুরোনো বাড়ি, আলমগঞ্জে একটি ভেঙে ফ্ল্যাট তৈরির বরাত দেওয়া হয়েছিল।’
বর্তমানে বর্ধমান শহরের তেঁতুলতলা বাজারের কাছে একেবারে রাস্তার উপরে একটি বিশালাকার ভগ্নপ্রায় বাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন পলেস্তারা না-থাকা বাড়িটির চারদিক থেকে বটগাছ গজিয়ে উঠেছে, ভেঙে পড়ছে ইটও। সরু এই রাস্তার দু’ধারে রয়েছে অনেক দোকান। প্রতিদিন হাজার হাজার টোটো ও সাধারণ মানুষের যাতায়াত রয়েছে। এই ব্যস্ত রাস্তায় যে কোনও মুহূর্তে বাড়িটি ভেঙে পড়লে বড়সড় প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। এক টোটোচালক শেখ সাগর বলেন, ‘এই রাস্তায় যদি বাড়িটা ভেঙে পড়ে, দেখবেন কত লোক মারা পড়বে। কতদিন ধরে এই বাড়িটা এ ভাবেই রয়েছে। কেউ দেখে না। এখানে ফুটপাথে দেখুন আট-দশ জন ব্যবসা করেন। ওঁদের আগে ক্ষতি হবে।’
বর্ধমান জেলা সিটিজেন্স ফোরামের পক্ষ থেকে কয়েকদিন আগেই ওই বাড়ির গায়ে পোস্টার লাগিয়ে তা ভাঙার আবেদন জানানো হয়েছিল। বড়বাজার, ইছালাবাদ ও বড়নীলপুরেও এমন অনেক বাড়ি রয়েছে। এই বিষয়ে বর্ধমান উত্তর মহকুমার এক আধিকারিক বলেন, ‘এগুলো পুরসভার কাজ। ওরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে এগুলো করে থাকেন। আইনি জটিলতা দেখা দিলে প্রশাসন হস্তক্ষেপ করে। তেলমারুই পাড়ার ঘটনার জেরে এখন মানুষের জীবনের প্রশ্ন উঠেছে। আমরাও চুপ করে বসে থাকতে পারি না।’
একই সুর শোনা গেল বর্ধমান জেলা সিটিজেন্স ফোরামের পক্ষে জ্যোতিপ্রকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলায়। পুরসভার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘পুরসভার উদাসীনতার চরম পরিণতি আজকের তেলমারুই পাড়ার ঘটনা। তেঁতুলতলা বাজারের ওই দোতলা বিশালাকার বাড়িটা একটা মৃত্যুফাঁদ হয়ে আছে। যে কোনও মুহূর্তে ওটা ভেঙে পড়তে পারে। কত বড় বিপদ হতে পারে কেউ আন্দাজ করতে পারছে না। আমরা ওই বাড়ির গায়ে ফ্লেক্স টাঙিয়ে এসেছিলাম। কেউ ছিঁডে দিয়েছে। শরিকি বিবাদের জেরে বাড়িটার এই অবস্থা বলে জানতে পেরেছি আমরা।
অবশেষে চারদিকের চাপে পড়ে নড়েচড়ে বসেছে পুর প্রশাসন। বর্ধমান পুরসভার পুরপ্রধান পরেশচন্দ্র সরকার আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘শুধু তেঁতুলতলা বাজারের বাড়িটাই নয়। এর পাশাপাশি শহরের বাকি যত বিপজ্জনক বাড়ি রয়েছে সেইগুলোকেও নোটিস দেওয়ার কাজ আমরা আজ (বৃহস্পতিবার) থেকেই শুরু করেছি। ৩৫টি ওয়ার্ডেই আমাদের টিম সার্ভে করে আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে রিপোর্ট দেবে। তার পরেই আমরা নোটিস ধরাব বাড়ির মালিকদের।’