ব্রাজ়িল-আর্জেন্টিনা নয়, ‘কালেমার পতাকা’য় ছেয়েছে বাংলাদেশ
এই সময়, ঢাকা: রাজধানী ঢাকার বেশ কয়েকটি এলাকার রাস্তা ও ফ্লাইওভারে আরবি লেখা সংবলিত সাদা-কালো পতাকা উড়ছে গত কয়েক দিন ধরে। শুধু ঢাকা নয়, নারায়ণগঞ্জ, ফেনী, কক্সবাজার, রাজশাহী, চট্টগ্রাম-সহ বিভিন্ন শহরের রাস্তা, ফ্লাইওভার এবং জনবহুল এলাকায় সাদা-কালো পতাকা উড়ছে। বহু জায়গায় এই ধরনের পতাকা হাতে নিয়ে যুবকদের বাইক মিছিল ও শোভযাত্রাও করতে দেখা গিয়েছে। এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চললেও, এসব পতাকা কারা টাঙিয়েছে বা এর উদ্দেশ্য কী, সে বিষয়ে পুলিশের কাছে কোনও তথ্য নেই। এ নিয়ে তারা কোনও মন্তব্য করতেও চাইছে না। বিএনপি-র তরফেও কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
বিভিন্ন রাস্তায় টাঙানো এ পতাকাগুলি দুই ধরনের। একটিতে সাদা জমির মাঝে কালো রঙে আরবি হরফে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ লেখা। অন্যটিতে কালো রঙের উপর সাদা আরবি হরফে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ লেখা। এই পতাকাগুলিকে ‘কালেমার পতাকা’ বলে প্রচার করা হচ্ছে। অনেকের মতে, সাদার উপর কালো রঙে লেখা পতাকার সঙ্গে মিল রয়েছে আফগানিস্তানের তালিবানের দাপ্তরিক পতাকার। একই ক্যালিগ্রাফি ও নকশায় বানানো পতাকা উড়ছে বাংলাদেশেও। আবার কালো জমির উপর সাদা রঙে আরবি হরফে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ লেখা পতাকা আল কায়েদার। আন্তর্জাতিক এই সংগঠনের বিভিন্ন শাখা সংগঠনও এমন পতাকা ব্যবহার করে। ব্যবহার করে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীরও। আবার একটি মহল দাবি করছে, প্যালেস্তিনীয় জঙ্গি সংগঠন হামাস এই পতাকা উড়িয়ে বাংলাদেশে তাদের উপস্থিতির প্রমাণ দিচ্ছে।
বিশ্বকাপ ফুটবলের মরসুমে বাংলাদেশ জুড়ে ইসলামি পতাকা ওড়ানোর ঢল নামার সঙ্গে বাংলাদেশে জঙ্গি সংগঠন গড়ার অন্যতম কারিগর কট্টরপন্থী মৌলানা মুফতি হারুন ইজহারের সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছে। তাঁর নামে একটি ফেসবুক পেজ থেকে লাইভ বক্তৃতায় মুফতি বাংলাদেশ জুড়ে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা ঝোলানোর কড়া নিন্দা করে বলেন, ‘বাংলাদেশে পতাকা টাঙাতে হলে ইসলামি পতাকা টাঙাও। ইসলামি মূল্যবোধের প্রচার ও প্রসার ঘটাও।’ তিনি ডাক দেওয়ার পরই কট্টরপন্থী বিভিন্ন ইসলামি সংগঠনের পক্ষে অন্য দেশের পতাকা খুলে তার বদলে কয়েক রকমের ইসলামি পতাকা টাঙানো শুরু হয়েছে। ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিয়ে এই পতাকা বিক্রিও করা হচ্ছে। নতুন একটি স্টাইলে আবার বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাকে কোনাকুনি চিরে সেখানে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ লেখা হয়েছে। অনেকে অভিযোগ তুলেছেন, এটা জাতীয় পতাকার অবমাননা। তবে পুলিশ কাউকে বাধা না দিয়ে মাঝে মাঝে পতাকাগুলি সরিয়ে ফেলছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আবার বাতিস্তম্ভ ভরে যাচ্ছে তথাকথিত এই কালেমার পতাকায়। ঢাকার বাইরে বহু জায়গায় এই পতাকা নিয়ে মিছিল করতে দেখা গিয়েছে ‘তৌহিদি জনতা’ নামধারীদের।
এই পতাকা টাঙানোর সঙ্গে যুক্ত এক তরুণ আলেম ফেসবুকে লিখেছেন, ‘কালিমা নিয়ে প্রশ্ন নয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও কালিমা বা আয়াত খচিত পতাকা ব্যবহার করে। প্রশ্ন হচ্ছে, কালিমা-সহ পতাকার নির্দিষ্ট ডিজাইন নিয়ে, যা বাইরের কোনও কোনও গোষ্ঠীর পতাকার সঙ্গে মিলে যায় এবং এটা নিয়ে বিপজ্জনক অপপ্রচারের আশঙ্কা তৈরি হয়।’ আর এক জন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘কালেমার পতাকা একটি রাজনৈতিক সিম্বল মাত্র, তাতে ‘ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার চেয়ে পতাকাধারীদের রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার আহ্বানই বেশি।’
সোশ্যাল মিডিয়ায় কালেমা লেখা পতাকা ওড়ানোর ছবির নীচে একজন লিখেছেন- ‘এক রাতের মধ্যে সারাদেশে কালেমার পতাকা উত্তোলন মনে করিয়ে দেয় বিএনপি-জামাতের শাসনকালে একদিনে সারাদেশে সিরিজ বোমা হামলার কথা। তেমন কিছুই কি ঘটতে যাচ্ছে আবার?’ তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ‘বিএনপি-জামায়াত আমলে সিরিজ বোমা হামলাসহ একের পর এক ঘটনা, যেমন বাংলা ভাই, একুশে অগস্ট, তত্ত্বাবধায়ক সরকারে ম্যানিপুলেশন ডেকে এনেছিল ১/১১ কে। মানুষ স্বাগত জানিয়েছিল সেটিকে। ফলাফল হিসাবে ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকে নিজেদের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছে বিএনপিকে। মনে রাখতে হবে, মৌলবাদ কোনও সিঁদুরে মেঘ নয়, তীব্র ঘন কালো মেঘ, যা জাতির ভাগ্যাকাশে অন্ধকার নামিয়ে আনে।’