‘পাড়াতেই গান গাইতে পারিনি, ইন্দ্রনীল সেনকে বলিনি বলে’, বলছেন লগ্নজিতা | Lagnajita Chakraborty sang for two consecutive films
আরজি কর কাণ্ডে প্রতিবাদ করেছিলেন গায়িকা লগ্নজিতা চক্রবর্তী। তারপর তাঁর বাংলা জুড়ে গানের শো করা থমকে যায়। আপোস করতে নারাজ ছিলেন গায়িকা। এখন রাজ্যে সরকার বদল হয়েছে। তাতে কি পরিস্থিতি বদলেছে ? পরপর দুই নামী পরিচালকের জন্য প্লেব্যাক করলেন গায়িকা। এবার তাঁর গানের জীবন বইবে কোন খাতে? টিভি নাইন বাংলার প্রশ্নের উত্তরে মন খুললেন।
আপনার নতুন দু’ টি গান শোনা যাচ্ছে। ‘অভিমান’ ছবির জন্য সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের সুর করা, লেখা ‘আদর’ গানটি আপনি গেয়েছেন। কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ছবি ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’-তে অনুপম রায়ের সুরে গান রয়েছে। পরপর দু’ টি গান মুক্তি পেল। কতটা উচ্ছ্বসিত?
লগ্নজিতা: আমি এতটাই কম কাজ পেয়ে থাকি, করে থাকি সেটা নয়, মানে এতই কম কাজ পাই যে, কত ঘনঘন কাজ আসছে সেটা নিয়ে ভাবিই না। হঠাত্ করে এক সপ্তাহের মধ্যেই দু’টো গান আসছে, এটা কাকতালীয়। এগুলো না এলেও জীবনে খুশি থাকার চেষ্টা করতাম। এগুলো যে এসেছে, তাতে অবশ্যই আমি খুব খুশি।
বাংলার দুই নামী পরিচালক গান দু’টোর সঙ্গে জড়িত। সেটার আলাদা গুরুত্ব রয়েছে কিনা?
কৌশিকদার ছবির গানটা ছ’-সাত মাস আগে গেয়েছি। যখন অনুপমদাকে জিজ্ঞাসা করি, বলে কৌশিকদার ছবির গান। সত্যি খুব খুশি হয়েছিলাম। কারণ ১২ বছর ধরে কাজ করছি, আমি কোনওদিন কৌশিকদার ছবিতে একটা গান গাইতে পারিনি। বাংলা ছবির দুনিয়ায় প্রথম পাঁচ-ছ’ জন নামী পরিচালকদের মধ্যে কৌশিকদার নাম আসে। কৌশিকদার ছবিতে একটা গান গাইতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ১২ বছর লাগল। ঋজুদার গানটা গাওয়ার আগের দিন অবধি জানতাম না, এই গানটা আমি গাইব। ছবিতে মেল ভার্সন আছে। গানটা আগেই শুনেছিলাম, হাউজ পার্টিতে গেয়েছি, কিন্তু ঋজুদার প্রথম তৈরি করা গান গাওয়ার দায়িত্বটা মেয়েদের মধ্যে যে আমাকে দিয়েছে, এতে আমার কলারটা একটু উঁচু হয়েছে।
লগ্মজিতা এত কম গান পেয়েছেন কেন? তার জন্য কতটা খারাপ লেগেছে?
লগ্নজিতা: কোনও খারাপলাগা নেই। আমি তো সারাদিন আলসেমি করে বাড়িতে বসে থাকি। কম কাজ যে পেয়েছি, নিজের দোষেই পেয়েছি!
বাড়িতে বসে থাকার সঙ্গে গান পাওয়ার সম্পর্ক আছে টলিউডে? ভালো গান গাইলেও তো গান পাওয়ার কথা…
লগ্নজিতা: আমি কম গান গেয়েছি, তবে কিছু হিট পেয়েছি। ভালো শিল্পীরা যেহেতু একটা গানের জন্য উপযুক্ত শিল্পীকে খুঁজে বের করতে পারেন, তাই বাড়িতে বসেই, আমার কাছে এমন কিছু গান এসেছে, যেগুলোর মিউজিক্যাল ভ্যালু এত হাই যে গাওয়ার পরই গানটা হিট হয়েছে। ঋজুদার সঙ্গে যেমন ‘রাজকাহিনী’ ছবিতে আমি শেষ কাজ করেছি। এদিকে ব্যক্তিগত জীবনে আমাদের ঝগড়া, অভিমান, বন্ধুত্বের সম্পর্ক। এবার যে গানটা পেলাম, সে তো বাড়িতে বসেই পেলাম! আসলে ছুটোছুটিরও একটা মূল্য পাওয়া যায় আবার বাড়িকে বসে থাকারও একটা মূল্য পাওয়া যায়।
রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনকালে সঙ্গীত জগতে ভুরি-ভুরি দুর্নীতির অভিযোগ উঠে আসছে। কাটমানি প্রসঙ্গ আসছে। আপনার অভিজ্ঞতা কেমন? অন্যদের অভিযোগ শুনেই বা কী মনে হয়?
লগ্নজিতা: আমার এই বিষয়টা বোঝার সুযোগই ছিল না, কারণ প্রথম থেকেই তৃণমূল সরকারের ঘনিষ্ঠ নই। তাই কোনও সরকারি কমিটিতে প্রথম থেকেই ছিলাম না। তবে এর বাইরে যেসব অনুষ্ঠান হয়, তার অনেকগুলো ইন্দ্রনীল সেন দেখাশোনা করতেন। যেমন আমার বাপের বাড়ির আর শ্বশুরবাড়ির মাঝের রাস্তায় হতো পিঠেপুলি উত্সব। ওটা আমার ছোটবেলার সাইকেল চালানোর জায়গা। কিন্তু ১২ বছরে নিজের পাড়াতেই এই অনুষ্ঠানে কোনওদিন গান গাওয়ার ডাক পাইনি। আমি পরিচিতদের বলতাম, ‘আরে ভাই, আমি তো পাড়ার মেয়ে, আমাকে ডাকো।’ অন্য অনেক নামী শিল্পী গাইতে আসতেন। তখন আমাকে বলা হয়েছিল, এটার জন্য ইন্দ্রনীল সেনের সঙ্গে কথা বলতে হবে। আমি যেরকম আরজি কর কাণ্ডের পর যখন কাজ বন্ধ হয়ে গেল, তখনও কারও সঙ্গে ‘কথা’ বলিনি, তেমনই এটার জন্যও ইন্দ্রনীল সেনের সঙ্গে কথা বলিনি। আমার জন্য পিঠেপুলি উত্সবে গান গাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু অতটাও নয় যে ইন্দ্রনীল সেনকে বলে তারপর গান গাইতে হবে।
আরজি কর কাণ্ডের পর আপনার শো করা কমে গিয়েছিল…অন্য অনেকে একইভাবে প্রতিবাদ করেছিল, কিন্তু তাঁদের শো করতে দেখা গিয়েছে…
লগ্নজিতা: আমার শো করা কমে যায়নি, শো ছিলই না। অন্য যাঁরা প্রতিবাদ করেছিলেন, তাঁদের কিছুজনের চেয়ে আমার বিষয়টা এই কারণে আলাদা, তাঁরা তারপর তখনকার সরকারের কারও সঙ্গে কথা বলে একটা সমঝোতায় পৌঁছেছিলেন। কী কথা হয়েছিল তা জানি না, কারণ আমি সেই ঘরে ছিলাম না। আমার কাছেও একইভাবে সমঝোতা করে নেওয়ার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু আমি সেটা গ্রহণ করিনি। কারণ এটা নিয়ে কোনওভাবে কথা বলে সমঝোতা করার কথা আমি ভাবতে পারিনি।
এখন কী শো বেড়েছে?
লগ্নজিতা: সেটা বলতে পারব না। রাজ্যে সরকার বদলের পর একটাই শো করলাম। এই শো আগের বছরও করেছিলাম। এর সঙ্গে রাজ্যে সরকার বদলের কোনও সম্পর্ক নেই।
টলিউডের কিছু শিল্পী, গায়ক-গায়িকা থেকে নায়ক-নায়িকা যেভাবে নির্দিষ্ট শিবিরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে এই মুহূর্তে সমাজ মাধ্যমে ঘৃণার মুখে পড়ছেন, তাতে কি সমাগ্রিকভাবে ইন্ডাস্ট্রির ক্ষতি হল? শিল্পীরা কি রাজনীতির থেকে দূরে থাকলে ভালো হতো?
লগ্নজিতা: আমার মনে হয় না, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কোনও শিল্পীর যোগ থাকলে, তাঁকে মানুষ ঘৃণার চোখে দেখেন। আমার ব্যক্তিগতভাবে সিপিএম, তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপির কিছু মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। তাঁদের সঙ্গে যখন দেখা করি, তখন বিষয়টা গোপন করারও চেষ্টা করি না। আমার মনে হয়, মানুষের সমস্যা তখন হয়, যখন তাঁরা দেখেন, এই সম্পর্কগুলোকে ভাঙিয়ে শিল্পীরা তাঁদের স্বার্থসিদ্ধি করার চেষ্টা করছেন। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলছি, যাঁদেরই চিনি না কেন, তাঁদের থেকে আমি কোনওরকম ব্যক্তিগত সুবিধা নিইনি কোনওদিন। তাই রাজনীতির সঙ্গে কেউ জড়িয়ে থাকলে মানুষের সমস্যা হয় না। যখন তাঁরা দেখেন, শিল্পীরা নিজের জন্য কিছু পাওয়ার চেষ্টা করছেন, এমন কারও থেকে, যাঁদের নিয়ে মানুষের উষ্মা আছে, তখন তাঁরা ক্ষেপে যান। কারণ শিল্পীদের দর্শকই তৈরি করেন। মানুষ যদি কাল থেকে আমার গান না শোনেন, তখন আপনি আমার দশটা ইন্টারভিউ নিয়েও কিছু করতে পারবেন না। মানুষ ভাবেন, আমি একজন শিল্পীর গান এত ভালোবাসি, আর সে এরকম একটা কাজ করল? এটা ব্যক্তিগত আবেগের জায়গা থেকে হয়। দর্শকের আবেগ যাতে আঘাত না পায়, সেটা দেখার দায়িত্ব আমাদেরই।