বাজায় ছেড়ে প্রাণের মায়া, বাজায় তেড়ে প্রাণপণ - 24 Ghanta Bangla News
Home

বাজায় ছেড়ে প্রাণের মায়া, বাজায় তেড়ে প্রাণপণ

Spread the love

‘হর্ন প্লিজ়’— একদা ব্রিটিশ-শাসিত দেশে এই দু’টি ইংরেজি শব্দ এখনও জ্বলজ্বল করে আসমুদ্র হিমাচল বাস কিংবা ট্রাকের পেছনে। হিন্দি বলয়ে কোথাও কোথাও প্রতিশব্দ হিসেবে লেখা হয় ‘আওয়াজ় দো’। পিছনের গাড়ি খামখা কী কারণে সামনের গাড়িকে হর্ন বাজিয়ে ‘ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট’ পাঠাবে, সেটা যদিও যান-সুরক্ষার ক্ষেত্রে এক জটিল চিহ্ন-সংকেতের প্রশ্ন। রাস্তার পিছনের গাড়ি সামনের গাড়িকে ওভারটেক করতে হলে হর্ন বাজাতে হবে, এমন বিধি পৃথিবীর কোনও দেশেই বলবৎ নেই। নেই ভারতের ট্র্যাফিক রুলেও। এতদ্‌সত্ত্বেও চালকদের কারণে-অকারণে হর্ন বাজানোর এক বিচিত্র সংস্কৃতি গ্রাস করছে গোটা দেশকেই।

দূষণ ভীষণ

নগরায়নের দাপটে দ্রুত বেড়ে চলেছে শহরের ভৌগোলিক এলাকা। বাড়ছে জনঘনত্ব, বাড়ছে যানবাহনের ঘনত্ব অথচ সেই আন্দাজে শহরের পথঘাট বেড়ে উঠছে না। অপরিকল্পিত পুরনো শহরের সীমিত রাস্তার পরিসরে জুড়ে বাড়ছে যানজটের দাপট। আর সেই দাপটের দোসর হিসেবে হাজির হচ্ছে শহর- শহরতলি জুড়ে শব্দ দূষণের বিপদ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাপকাঠিতে ৫৫ ডেসিবেল শব্দসীমার ঢের উপর দিয়ে বয়ে চলেছে শব্দতরঙ্গের বিপদ, দেশের প্রায় সব শহরেই। শব্দদূষণের নিরিখে প্রতিবেশী দেশের রাজধানী ঢাকার পরেই এ দেশের মোরাদাবাদ, পৃথিবীতে দু’নম্বর। দেশের রাজধানী দিল্লি থেকে শুরু করে রাজ্যের রাজধানী কলকাতা, উভয়ই বায়ুদূষণের মতোই শব্দদূষণের ক্ষেত্রেও বিপদের মাত্রা অতিক্রম করেছে। আর এমন শব্দের দূষণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ছে চালক থেকে পথচারী, সব পক্ষের নানা শারীরিক রোগব্যাধি। কমছে তাদের শোনার ক্ষমতা, বাড়ছে ঘুমের বিপদ, বাড়ছে স্ট্রেস লেভেল।

বিপন্ন দৃষ্টিহীন

এই দূষণে আরও বেশি মাত্রায় ঝুঁকির শিকার হচ্ছে শহরের দৃষ্টিহীন মানুষেরা। দৃষ্টিহীন মানুষজন রাস্তায় যানবাহনের অস্তিত্ব টের পায় প্রতিটি যানের স্বতন্ত্র শব্দ থেকেই। রাজপথের ভিন্ন ভিন্ন যানবাহনের বিভিন্ন দূরত্বের, বিভিন্ন মাত্রার ধ্বনি-প্রতিধ্বনির সংশ্লেষণ-বিশ্লেষণ থেকেই তাদের মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ জানান দেয় পথ-চলা বিভিন্ন যানবাহনের উপস্থিতি। ‘শব্দভেদী বাণ’-এর প্রযুক্তির মতোই দৃষ্টিহীন মানুষেরা আন্দাজ করেন যানবাহনের উপস্থিতি, সচেতন থাকে তাদের সুরক্ষা নিয়ে। কিন্তু রাজপথের সেই ভিন্ন ভিন্ন যানের চেনা আওয়াজগুলো যখন ঢেকে যায় ভয়াবহ হর্নের শব্দের আড়ালে, তাদের মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের সক্ষমতা কমে, দৃষ্টিহীন মানুষেরা পড়ে সঙ্কটে। কমবেশি একটানা শব্দের আওয়াজে বহু ক্ষেত্রেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন তুলনায় বয়স্ক মানুষেরাও।

বিধিসম্মত সতর্কীকরণ?

গাড়ির হর্ন সতর্কীকরণের যন্ত্র। অর্থাৎ জরুরি ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা এড়াতেই সাধারণ ভাবে হর্ন ব্যবহার করার কথা। অথচ কারণে অকারণে হর্ন বাজিয়ে ছুটে চলাটা আজ এক সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত। পথে-ঘাটে চালক এবং পথচারী, উভয়ের বোধবুদ্ধির উপর নির্ভর করে হর্নের আওয়াজের ওঠানামা। ট্র্যাফিক আইন মেনে চালকেরা গাড়ি চালালে কিংবা পথচারী চলাফেরা করলে হর্নের ন্যূনতম প্রয়োজন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে এ দেশে উভয় পক্ষই নিয়মের ধার ধারে না বলেই হর্নের দাপট বেড়ে চলেছে। কাজেই হর্নের দাপট কমানোর প্রাথমিক শর্ত পথে-ঘাটে শৃঙ্খলা ও অনুশাসন। বিশেষত শহরের যানসংখ্যা যখন অফিস-টাইমের ভিড়ে রাস্তার ধারণ-ক্ষমতাকে ছাপিয়ে যায়, সেই রাস্তায় চালকদের হর্নের দাপটও বাড়তে থাকে ধৈর্যচ্যুতির কারণে। গতিহীনতার কবলে পড়া শহরে নাকাল চালকের হর্ন ক্রমাগত বাজতে থাকে তার সামনের বাধা সরিয়ে, ভিড় ঠেলে এগিয়ে যেতে।

বিশেষত যে সব রাস্তায় দ্রুতগতি, মধ্যগতি এবং ধীরগতির যানবাহন একসঙ্গে ছুটে চলে, সেখানে হর্নের দাপট তুলনায় বেশি। শহরতলির সরু রাস্তায় রিক্সা, ট্রাক, চার-চাকার গাড়ি কিংবা অটো রিক্সা একসঙ্গে চললে হর্নের যে ‘হ য ব র ল’ আওয়াজ তৈরি হয়, সেটা সাধারণত জাতীয় কিংবা জেলা সড়কে মেলে না। দেখা যাচ্ছে, শহরের চার রাস্তার ব্যস্ত মোড়গুলিতে হর্নের দাপট প্রবল। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় শহরের মোড়ে কারণে-অকারণে হর্ন বাজানোর সংখ্যা ঘণ্টায় ৭৩৬ ছাড়িয়েছে। এই হর্ন বাজানোর আর একটা বড় কারণ, রাস্তার মোড়গুলিতে পথচারীদের পথে নেমে রাস্তা পারাপার করার অভ্যাস। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে কলকাতা শহরের অধিকাংশ সিগনাল মোটর-কেন্দ্রিক। যার অর্থ, সিগনালের পেছনে রাস্তায় জমে থাকা গাড়িগুলি পার করানোর তাগিদেই সেই সিগনালের সময়সীমা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। রাস্তার মোড়ে জমে থাকা মানুষ পারাপারের সময় সেই ব্যবস্থায় গৌণ। ফলে গাড়ি চলার নির্ধারিত সময়ে অনেক ক্ষেত্রে মানুষ নেমে আসে রাজপথে। আর চালক বনাম পথচারীর সংঘাতের পরিস্থিতিতে হর্ন বেজে ওঠে বারে বারে।

গণপরিবহণ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার কারণে বিভিন্ন শহরেই রাস্তায় বাড়ছে মোটরসাইকেলের সংখ্যা। কলকাতা থেকে দিল্লি, সর্বত্রই সর্বোচ্চ ব্যবহৃত যান হয়ে উঠেছে দু’চাকার মোটরসাইকেল। শহরের ভিড় রাস্তায় যানবাহনের ফাঁকফোকর গলে বেরিয়ে, সময় বাঁচানোর তাগিদে সবচেয়ে বেশি হর্ন বাজায় এই দ্বিচক্রযানের চালক-বাহিনী। বিশেষত শহরে ই–কমার্স ব্যবসায় মোটরবাইক এবং স্কুটি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে পেটের দায়ে ছোটার প্রতিযোগিতা। ভিড় রাস্তায় যাত্রাপথে অন্যকে ঠেলে সরিয়ে এগিয়ে যেতে বাড়ছে হর্নের দাপট। ইতিমধ্যে এক বেসরকারি সমীক্ষায় প্রকাশিত যে শহরের রাস্তায় মোটরবাইক চালকদের ঘণ্টায় গড়পরতা হর্ন বাজে ১৩০ বারের বেশি, যা বাস, ট্রাক কিংবা অটো-রিক্সার চেয়ে ঢের বেশি।

অবরুদ্ধ শহর

কলকাতার মতো অপরিকল্পিত শহরে বড় রাস্তার গা ঘেঁষেই তৈরি হচ্ছে বহুতলের কাঠামো, দোকান-বাজার, শপিং মল, সব কিছুই। ওই সমস্ত বাড়িঘর তৈরির ক্ষেত্রে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে বাহারি কাচের পর্দা, কংক্রিট কিংবা ধাতব আস্তরণ। মূল রাস্তার দু’পাশে তৈরি সারি সারি এমন কাঠামো থাকায় গাড়ির হর্নের আওয়াজ ওই কাঠামোগুলিতে প্রতিফলিত হয়ে শব্দের তীব্রতা বাড়িয়ে তুলছে। রাস্তার দু’পাশে শব্দ ছড়িয়ে পড়ার জন্য প্রয়োজন ফাঁকা এলাকা। কিন্তু ওই অবরুদ্ধ বাড়ির দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে সেই ধ্বনি-প্রতিধ্বনি ঘুরপাক খাচ্ছে সেই রাস্তার আশেপাশে। সেই শব্দদূষণে রাস্তার ধারে অবস্থিত বাড়িঘর, দোকান-বাজারের মানুষজনও আক্রান্ত হয়। সাম্প্রতিক কালে শহর জুড়ে উড়ালপুল তৈরি হয়েছে শহরের ব্যস্ত মোড়গুলিতে যানজট কমাতে। শহরের মোড়ে উড়ালপুলগুলির নীচে কিংবা মেট্রো রেলের ভায়াডাক্ট-এর নীচের অংশে যানবাহনের অবরুদ্ধ শব্দের ধাক্কা বাড়ছে। অর্থাৎ, নতুন-নতুন নির্মাণ কাঠামো এক দিকে যেমন যানজট কমাতে সাহায্য করছে, তেমনই আবার শব্দদূষণের নতুন বিপদের ভরকেন্দ্র হয়ে উঠছে। এই সব ক্ষেত্রে শব্দ-শোষণের উপযোগী নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করলে শব্দদূষণ খানিকটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

শহরের বাণিজ্যকেন্দ্রের ব্যস্ত রাস্তাতেই হর্নের দাপট তুলনায় বেশি। বিশেষত যে সব জায়গায় ফুটপাথ বেদখল হয়ে গেছে বাণিজ্যের দাপটে, সেখানে পথচারী ফুটপাথ ছেড়ে রাজপথে নেমে এলেই শুরু হয় চালক-পথচারী সংঘাত। বাড়তে থাকে হর্নের ডেসিবেল। যানজটের রাস্তায় ধীরগতির বাস-ট্রাকের নিচু গিয়ারে গাড়ি চললে ইঞ্জিনের আওয়াজও বেড়ে চলে হর্নের সঙ্গে। পাশাপাশি রাস্তায় ধীরগতির কারণে বেড়ে চলে ইঞ্জিনের তেল-পোড়া বায়ুদূষণের বিপদ। শব্দ ও বায়ুদূষণের জোড়া ফলায় বিদ্ধ হতে থাকে শহর।

বেলাগাম অপরাধ

শব্দদূষণের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে সেই মানুষেরাই যারা জীবিকার প্রয়োজনে রাজপথ লাগোয়া অঞ্চল জুড়ে দিনের অধিকাংশ সময় কাটাতে বাধ্য হয়। সেই নিরিখে শহরের হকার থেকে শুরু করে ট্র্যাফিক পুলিশ, এই শব্দদূষণের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। সবচেয়ে বড় কথা, যত্রতত্র রাস্তায় হর্ন বাজানো যে আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ সেটা বেশির ভাগ চালক ধর্তব্যেই আনে না! বিশেষ করে শহরের হাসপাতাল কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিকটস্থ অঞ্চলকে ‘সাইলেন্স জ়োন’ হিসাবে পুলিশ চিহ্নিত করলেও বহু চালক সেই অনুশাসনের ধার ধারে না। সাম্প্রতিক কালে কলকাতায় এমন এলাকায় এক মাসে ছ’শোর বেশি কেস রুজু করতে হয়েছে পুলিশকে আইন-ভঙ্গকারী চালকদের বিরুদ্ধে। এর থেকে স্পষ্ট হয় কতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন এই শহুরে চালকের দল। ওই চালকদের চরিত্র বিশ্লেষণ করেও দেখা যাচ্ছে যে মানসিক চাপে থাকা মানুষেরাই অনেক বেশি হর্ন বাজায়। এ ছাড়াও পথে-ঘাটে গতিমোহের রোগগ্রস্ত মানুষজন জোরে হর্ন বাজিয়ে চলে, নিজের অস্তিত্ব জাহির করতে।

অন্ধজনে দেহ আলো

হর্নের এই বিপদ থেকে শহরকে বাঁচাতে হলে প্রয়োজন দ্বিমুখী কৌশল। এক দিকে ট্র্যাফিক আইন বলবৎ করতে হবে যাতে রাজপথে চালক-পথচারী সংঘাত কমানো যায় কিংবা দু’টি গাড়ির মধ্যে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতায় রাশ টানা যায়। পাশাপাশি হর্নের দৈনিক সর্বাধিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করার কথা ভাবা যেতে পারে প্রযুক্তিনির্ভর উপায়ে। পাশাপাশি প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ। পথচারী হিসেবে মানুষকে বুঝতে হবে নিরাপত্তার স্বার্থে নিয়ম মেনে পথ চলা প্রয়োজন। প্রয়োজন রাজপথে সুনির্দিষ্ট স্থানে ওঠা-নামার অভ্যাস গড়ে তোলা। অন্যথায় সেই আইন-ভাঙা মানুষেরাই রাস্তায় হর্নের দূষণের বিপদের ডাকার পাশাপাশি নিজের জীবনে দুর্ঘটনার বিপদ ডেকে আনতে পারে যে কোনও মুহূর্তে!

লেখক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণবিদ্যার শিক্ষক

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *