এই জুন ১০০ বছরের মধ্যে শুষ্কতম, কৃষি নিয়ে চিন্তা
এই সময়: গত বছর, ২০২৫–এ নির্দিষ্ট সময়ের কিছুটা আগেই দেশে বর্ষা ঢুকে পড়ায় দেশে খরিফ শস্যের চাষে গতি এসেছিল। আর ২০২৬–এ বর্ষার মরশুম শুরুই হয়েছে গোটা দেশে ৩৭ শতাংশ ঘাটতি দিয়ে। গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ–সহ দেশের যে ৯টি রাজ্য খরিফ চাষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেই রাজ্যগুলোর সব ক’টাতেই ভয়াবহ ঘাটতি বৃষ্টির। জুন শেষ হতে আর একদিন বাকি। তবে ইতিমধ্যেই ২০২৬–এর জুনকে গত ১০০ বছরে দেশের শুষ্কতম জুন বলে চিহ্নিত করছেন আবহবিদরা।
জুনের ভারত গড়ে ১২০ মিলিমিটার বৃষ্টি পায়। কিন্তু এ বছর ২৭ জুন পর্যন্ত দেশে বৃষ্টির পরিমাণ মাত্র ৭৫.৬ মিলিমিটার, শতাংশের হিসেবে ঘাটতি ৩৭ শতাংশ।
এ বছরের পরিস্থিতি ২০২৫–এর তুলনায় একেবারে উল্টো। এ বছর কেরালায় বর্ষার বাতাস ঢুকেছিল নির্ধারিত ১ জুনের পরিবর্তে ৪ জুন। কিন্তু তার পরে মৌসুমি বায়ুর উত্তরমুখী অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর ও দুর্বল হয়ে পড়ে। তারই মারাত্মক প্রভাব পড়তে চলেছে খরিফ শস্যের উৎপাদনে। খরিফ শস্য অর্থাৎ যে ফসল বর্ষায় (জুন–জুলাইয়ে) বপন করা হয় এবং শরতে (সেপ্টেম্বর–অক্টোবর) কাটা হয়।
খরিফ শস্যের তালিকায় রয়েছে ধান, ভুট্টা, জোয়ার ও বাজরা, তুলো, সয়াবিন, চিনেবাদাম এবং বিভিন্ন রকমের ডাল। কিন্তু যে সব রাজ্যে এ ধরনের শস্যের চাষ হয়, সেই রাজ্যগুলোর অবস্থা এ বছর অত্যন্ত সঙ্গীন। এর মধ্যে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ (১০ শতাংশ), ওডিশা (৪৭ শতাংশ), অন্ধ্রপ্রদেশ (১৫ শতাংশ), তেলঙ্গানা (৩২ শতাংশ), তামিলনাড়ু (২৯ শতাংশ), কেরালা (৩১ শতাংশ), মহারাষ্ট্র (৬৪ শতাংশ) অসম ও মেঘালয় (৪৮ শতাংশ) এবং কর্নাটকে (৩৮ শতাংশ) বৃষ্টির ঘাটতি রয়েছে।
আবহবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, দেশের প্রায় অর্ধেক কৃষিজমি এখনও সরাসরি বর্ষার জলের উপর নির্ভরশীল। তাই, বর্ষার শুরুতেই বৃষ্টির ঘাটতি মানে অশনি সঙ্কেত। জুনে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না–হলে বীজ বপনে দেরি হবে, যার পরিণামে ফসলের প্রাথমিক বৃদ্ধি ব্যাহত হবে এবং কৃষকদের জুলাই মাসের বৃষ্টির উপর নির্ভর করতে হবে। এ বছর প্রশান্ত মহাসাগরের জলতল স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটাই বেশি উত্তপ্ত অবস্থায় রয়েছে। এর ফলে ‘সুপার এল নিনিও’ পরিস্থিতি হতে চলেছে বলে সতর্কতা জারি করেছেন আবহবিদরা। এ রকম পরিস্থিতিতে ভারতীয় উপমহাদেশ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটাই কম বৃষ্টি পায়। সুতরাং, জুলাইয়ে দেশ আদৌ কতটা বৃষ্টি পাবে, তা নিয়ে স্বভাবতই সংশয় তৈরি হয়েছে।
আবহবিদদের হিসেব বলছে, এ বছর জুনে দেশের মধ্যে বৃষ্টিপাতের সব চেয়ে বড় ঘাটতি দেখা গিয়েছে পশ্চিম ও মধ্য ভারতে। মহারাষ্ট্রের কোঙ্কন-গোয়া অঞ্চলে বৃষ্টির ঘাটতি ৬১ শতাংশ, মধ্য মহারাষ্ট্রে ৬৮ শতাংশ এবং মারাঠওয়াড়ায় ৬৪ শতাংশ ঘাটতি।
কম বৃষ্টির জেরে কতটা ধাক্কা খেতে পারে অর্থনীতি?
বিশেষজ্ঞদের অনেকের দাবি, স্বাভাবিকের তুলনায় ১০ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত দেশের মূল্যবৃদ্ধির সূচককে ১ পার্সেন্টেজ পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। জুনের ২৭ তারিখ পর্যন্ত ৩৭ শতাংশ ঘাটতি তাই ক্রমশ চাপ বাড়াচ্ছে অর্থনীতির উপর। যদিও রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক মহলের দাবি, দেশের ৩০০ বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ২৯ লক্ষ কোটি টাকা) কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির গরিষ্ঠ অংশই আর সিজ়নাল মনসুনের উপরে নির্ভরশীল নয়।
কারণ, শস্য মজুতের ভাঁড়ারে এখন প্রয়োজনের তুলনায় অনেকটাই বেশি সঞ্চয় করে রাখে কেন্দ্রীয় সরকার। ফলে, এখনই চিন্তার কিছু নেই। যদিও বিশেষজ্ঞদের অন্য অংশের অভিমত, মজুত কখনও কম বৃষ্টির অভাব মেটাতে সক্ষম নয়। বর্তমানে যা পরিস্থিতি, তাতে আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে দেশে মূল্যবৃদ্ধির পারদ ৫.৫ শতাংশ ছুঁতে পারে। যেই আশঙ্কা সমূলে বিনাশ করতে ইতিমধ্যেই কৃষি মন্ত্রক ১১১টি অতি-সংবেদনশীল জেলা–সহ দেশের মোট ৩১৫টি জেলাকে চিহ্নিত করে বিকল্প উপায়ে চাষের কথা ভাবছে।