ইউসিসি: বঙ্গ সংস্করণে কি অসম-মডেল
সুগত বন্দ্যোপাধ্যায়
বাংলায় বিধানসভা ভোটের প্রচারে এসে নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহরা বারবার আশ্বাস দিয়েছেন রাজ্যে বিজেপি সরকার তৈরি হলে পাশ করানো হবে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউনিফর্ম সিভিল কোড (ইউসিসি)। একাধিক নির্বাচনী সভা থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জনতার উদ্দেশে প্রশ্ন করতে দেখা গিয়েছিল, ‘কোনও নাগরিক চারটে বিয়ে করতে পারবেন, আর কোনও নাগরিক একটা বিয়ে করবেন, এটা কি মা–বোনেরা চান?’
সব ধর্মের মানুষের জন্য যাতে একই ধরনের দেওয়ানি বিধি কার্যকর হয়, বাংলায় সেই ব্যবস্থা চালু করার আশ্বাসও দিয়েছিলেন মোদী–শাহরা। সেই আশ্বাস পূরণ করতে আগামিকাল, সোমবারই রাজ্য বিধানসভায় ইউসিসি সংক্রান্ত বিল পেশ করতে পারে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় এই বিল পাশ হলে দেশের চতুর্থ রাজ্য হিসেবে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর হবে। নিয়ম অনুযায়ী, রাজ্য বিধানসভায় এই বিল পাশ করিয়ে তা রাজ্যপালের মাধ্যমে পাঠাতে হবে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের জন্য। রাষ্ট্রপতি তাতে সিলমোহর দিলে তবেই তা আইনে পরিণত হবে।
ইতিমধ্যে বিজেপি শাসিত উত্তরাখণ্ড দেশের প্রথম রাজ্য হিসেবে ২০২৪–এ এই আইন কার্যকর করে ফেলেছে। আর এক পদ্ম–শাসিত রাজ্য গুজরাট বিধানসভাতেও এ বছরই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর হয়েছে। আর এক বিজেপি শাসিত রাজ্য গোয়ায় ১৮৬৭–এর পর্তুগিজ় দেওয়ানি বিধিই কার্যকর রয়েছে, যা অভিন্ন দেওয়ানি বিধির সমতুল। এর বাইরে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার সরকার অসম বিধানসভায় এই সংক্রান্ত বিল কিছুদিন আগে পেশ করেছে। এখনও তা অবশ্য পাশ হয়নি। পশ্চিমবঙ্গ আইন দপ্তর সূত্রের খবর, এ রাজ্যে ইউসিসি সংক্রান্ত বিল তৈরির ক্ষেত্রে অসমের বিলটিকেই মডেল হিসেবে ধরে নিয়ে কাজ চলছে।
রাজ্যের প্রস্তাবিত বিল পাশ হলে বাংলায় হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান–সহ সব ধর্মের মানুষ চলে আসবেন একই দেওয়ানি বিধির আওতায়। সূত্রের দাবি, এই আইনে ধর্ম–বর্ণ নির্বিশেষে রাজ্যের সমস্ত নাগরিকের ক্ষেত্রেই বহু–বিবাহ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আইন অমান্য করলে জেল ও জরিমানার মতো কড়া শাস্তির বিধান থাকছে। বিয়ের পরে বাধ্যতামূলক ভাবে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তা রেজিস্ট্রি করতেই হবে। বিলে আরও থাকতে পারে— নিকট আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে বৈধ বলে ধরা হবে না। মুসলিম সমাজে যা প্রচলিত রয়েছে। সূত্রের দাবি, নতুন বিলে খুড়তুতো, মামাতো, মাসতুতো, পিসতুতো ভাই-বোনের মতো সম্পর্কের মধ্যে বিয়ে করা যাবে না। অসম সরকারের পেশ করা বিলে এ রকম ৩৭টি ক্যাটিগরির নিকট আত্মীয়ের সম্পর্কের মধ্যে বিয়ে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে তাদের বিলে সেখানকার জনজাতিভুক্তদের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। এ রাজ্যে কী হবে, তা বিল চূড়ান্ত না–হওয়া পর্যন্ত স্পষ্ট নয়।
তবে রাজ্যের আইন দপ্তর সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, বিবাহ বিচ্ছেদ বা ডিভোর্সের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন করানো বাধ্যতামূলক হবে নতুন বিলে। সাব–রেজিস্ট্রারের কাছে তা নথিভুক্ত করাতে হবে। সেটা না করলেও জরিমানা বা শাস্তির প্রস্তাব বিবেচনা করা হচ্ছে। অসম সরকার তাদের ইউসিসি বিলে এই সময়সীমা ৬০ দিন পর্যন্ত ধার্য করেছে। শুধু বিয়ে নয়, কেউ লিভ–ইন সম্পর্কে থাকলে, সেটাও উভয় পক্ষকে এক মাসের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন করাতে হবে বাধ্যতামূলক ভাবে। এক্ষেত্রেও বিধি অমান্যে জেল ও জরিমানার প্রস্তাব থাকছে।
আইন দপ্তরের এক আধিকারিক জানান, শুধু বিয়ে, ডিভোর্স বা লিভ–ইন নয়, সম্পত্তির উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রেও নতুন বিলে অভিন্ন এবং লিঙ্গ-নিরপেক্ষ বিধির কথা বলা থাকতে পারে। রাজ্যের প্রস্তাবিত ইউসিসি বিলে সম্পত্তির উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ছেলে–মেয়ে বা স্বামী–স্ত্রী নন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বাবা-মা বেঁচে থাকলে তাঁকেও সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচনার সুযোগ থাকতে পারে। মুসলিমদের ক্ষেত্রে সন্তানের সম্পত্তিতে মা–বাবার অধিকার ছিল না। ইউসিসি চালু হলে ধর্ম–বর্ণ নির্বিশেষে সেই অধিকার রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হবে।
সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ও রাজ্য মানবাধিকার কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারপার্সন অশোক গঙ্গোপাধ্যায় শনিবার বলেন, ‘আমাদের দেশে যেমন অভিন্ন ফৌজদারি বিধি চালু আছে, তেমনই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর জন্য আইন তৈরির কথা আগেই বলেছে সর্বোচ্চ আদালত। এতে সামাজিক বৈষম্য দূর হবে, সাম্য আসবে এবং সাংবিধানিক নির্দেশ পালিত হবে।’