কুসংস্কার-রক্ষণশীলতার বেড়া ভেঙে ইতিহাসের পাতায় লাক্ষাদ্বীপের নাইটিঙ্গেল হিদুম্বি
লাক্ষাদ্বীপ: সমাজের কুসংস্কার, ধর্মীয় রক্ষণশীলতা কিংবা (Hindumbi)নারীদের প্রতি প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি সব বাধা অতিক্রম করে নিজের জীবনকে মানুষের সেবায় উৎসর্গ করেছিলেন হিন্দুম্বি কৌরোম কাক্কাদা। আজ তাঁর বয়স ৮০ বছর। গত ৫৩ বছর ধরে অসংখ্য প্রসূতির নিরাপদ সন্তান জন্ম, জরুরি চিকিৎসা এবং জনস্বাস্থ্য সচেতনতার কাজে নিজেকে নিবেদন করেছেন তিনি। একসময় যাঁর নার্স হওয়াই সমাজের চোখে ছিল ‘অগ্রহণযোগ্য’, আজ তিনিই লক্ষদ্বীপের স্বাস্থ্য পরিষেবার এক জীবন্ত কিংবদন্তি।
হিন্দুম্বির স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে এক ভিন্ন সময়ের গল্প। তখন অনেকেই মনে করতেন, মুসলিম নারীদের নার্সিং পেশায় আসা উচিত নয়। সমাজের একাংশের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, মানুষের জীবন বাঁচানোর চেয়ে বড় দায়িত্ব আর কিছু হতে পারে না।
আরও দেখুনঃ মাটির নিচে মিলল ২০ লক্ষ টাকার হীরা! ভাগ্য বদলে গেল মহিলার
শুধু হাসপাতালের চার দেওয়ালের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি তিনি। লক্ষদ্বীপের প্রত্যন্ত দ্বীপগুলিতে ঘরে সন্তান প্রসবের সময় বহু নারীর মৃত্যু হত। চিকিৎসা সম্পর্কে সচেতনতার অভাব এবং হাসপাতালভীতি ছিল বড় সমস্যা। হিন্দুম্বি বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে চিকিৎসকের কাছে যেতে উৎসাহিত করতেন। টিকাকরণ, মাতৃস্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনা নিয়েও তিনি ব্যাপক প্রচার চালান। মাত্র দু’জন সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে পুরুষ ও মহিলাদের মধ্যে বন্ধ্যাকরণ সম্পর্কেও সচেতনতা গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর কথায়, “এটাকে আমি চাকরির অতিরিক্ত কাজ বলে মনে করিনি, বরং এটাও ছিল আমার দায়িত্বের অংশ।”
১৯৮৪ সালের একটি ঘটনা আজও তাঁর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়। আগাত্তি দ্বীপে এক গর্ভবতী মহিলার অবস্থা সংকটজনক হয়ে ওঠে। কভারাত্তি থেকে প্রায় ৭২ কিলোমিটার দূরে সেই দ্বীপে পৌঁছতে তাঁরা একটি ছোট মাছ ধরার নৌকায় রওনা দেন। সেখানে পৌঁছে দেখা যায়, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মহিলার জীবন সংকটে।
রক্তের ব্যবস্থা করার পর সমুদ্রপথেই এক ব্রিচ বেবির সফল প্রসবে চিকিৎসককে সহায়তা করেন হিন্দুম্বি। মা ও শিশু দু’জনেই সুস্থ ছিলেন। বহু বছর পরে সেই শিশুই বড় হয়ে এসে তাঁকে বলেছিল, “আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন? আমি সেই শিশু, যার জন্মে আপনি সাহায্য করেছিলেন।” সেই মুহূর্ত আজও তাঁকে আবেগাপ্লুত করে।
চিকিৎসা শিক্ষার জন্য তাঁকে চার বছর কোঝিকোড় মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেলে থাকতে হয়েছিল। সে সময় লক্ষদ্বীপে ফেরার মতো পর্যাপ্ত জাহাজ পরিষেবা ছিল না। ফলে পুরো চার বছরে একবারও নিজের বাড়ি ফিরতে পারেননি তিনি। তবুও লক্ষ্য থেকে সরে যাননি।
হিন্দুম্বির জীবনের আরেকটি অনুপ্রেরণার গল্প তাঁর সাইকেল। তখন গোটা লক্ষদ্বীপে হাতে গোনা কয়েকটি সাইকেল ছিল। একজন নারী সাইকেল চালাচ্ছেন বিষয়টি অনেকের কাছেই ছিল অস্বাভাবিক। আত্মীয়-স্বজন পর্যন্ত কটাক্ষ করে বলতেন, “ওটা কোনও মেয়ে নয়, ছেলের মতো সাইকেল চালাচ্ছে।” কিন্তু জরুরি রোগীর খবর পেলেই তিনি সাইকেলে চেপে ছুটে যেতেন। সমাজের বিদ্রূপ তাঁর পথ আটকাতে পারেনি।
তাঁর নামের পিছনেও রয়েছে স্বাধীনতার ইতিহাস। বাবা ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। তিনি মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে ১৯৩০ সালের ডান্ডি অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন এবং লক্ষদ্বীপে প্রথম জাতীয় পতাকা নিয়ে আসেন। দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই মেয়ের নাম রাখেন ‘হিন্দুম্বি’ অর্থাৎ ‘হিন্দুস্তানের কন্যা’।
আজ হিন্দুম্বির জীবন শুধু একজন নার্সের কর্মজীবনের গল্প নয়, এটি সাহস, মানবতা এবং সমাজ পরিবর্তনের এক অনন্য দলিল। সময় বদলেছে, সমাজও বদলেছে। আর সেই পরিবর্তনের অন্যতম নীরব কারিগর ছিলেন হিন্দুম্বি কৌরোম কাক্কাদা।
The post কুসংস্কার-রক্ষণশীলতার বেড়া ভেঙে ইতিহাসের পাতায় লাক্ষাদ্বীপের নাইটিঙ্গেল হিদুম্বি appeared first on Kolkata24x7.