প্রাইভেটে পড়ানো বন্ধ, বিপাকে দশম ও দ্বাদশের পড়ুয়ারাই বেশি
সূর্যকান্ত কুমার, কালনা
স্কুলে কর্মরত শিক্ষক–শিক্ষিকারা প্রাইভেট টিউশন করতে পারবেন না বলে নির্দেশিকা জারি করেছে রাজ্যের স্কুল শিক্ষা দপ্তর। তার পরেই অনেক শিক্ষক–শিক্ষিকা বাড়িতে পড়ানো বন্ধ করে দিয়েছেন। কিন্তু মাঝপথে এ ভাবে টিউশন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছে বহু ছাত্রছাত্রী, বিশেষ করে যারা আগামী বছর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক দেবে।
অভিভাবক ও ছাত্রছাত্রীদের বক্তব্য, কোনও শিক্ষক বা শিক্ষিকা ভালো বোঝালে তাঁর কাছে পড়ার সুযোগ কেন মিলবে না! গ্রামীণ এলাকায় ভালো কোচিং সেন্টারের সংখ্যা কম। সেগুলিতে পড়ার মতো আর্থিক সামর্থও অনেকেরই নেই। অভিভাবকদের আরও বক্তব্য, তা হলে সরকারি চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিসও বন্ধ করা উচিত। যে শিক্ষার অধিকার আইনে (আরটিই) স্কুলের শিক্ষক–শিক্ষিকাদের প্রাইভেটে পড়ানো বন্ধ করা হয়েছে, সেই আইন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রযোজ্য হলেও নবম থেকে দ্বাদশের ছাত্রছাত্রীদের প্রাইভেট টিউশনে কেন আপত্তি তোলা হচ্ছে, সেই প্রশ্নও উঠে এসেছে।
এই নির্দেশিকা বামফ্রন্ট সরকার ও তৃণমূল সরকারের আমলেও জারি করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত কঠোর ভাবে তা প্রয়োগ করা হয়নি। রাজ্যে পালাবদলের পরে গত ৪ জুন রাজ্যের স্কুল শিক্ষা দপ্তরের ডেপুটি ডিরেক্টর (প্রশাসন) ফের এই নির্দেশিকা জারি করেছেন। শিক্ষকরা জানাচ্ছেন, এ বার প্রশাসনের দিক থেকে অত্যন্ত কড়া মনোভাব দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি পূর্ব বর্ধমান জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শকের অফিসে এক বৈঠকে প্রধান শিক্ষকদের বলা হয়েছে, এই বিষয়ে কোনও শিক্ষকের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ যেন না–করতে হয়।
বিদ্যালয় পরিদর্শকদের সঙ্গে শিক্ষকদের যে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ আছে, সেখানেও সম্প্রতি স্কুল শিক্ষা দপ্তরের নির্দেশিকা তুলে ধরে এ নিয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগের দুই সরকারের আমলে একই নির্দেশিকাকে সে ভাবে গুরুত্ব না–দিলেও রাজ্য প্রশাসনের এই মনোভাব বুঝে প্রাইভেট টিউশনে যুক্ত শিক্ষিকা–শিক্ষিকারা স্কুলের বাইরে পড়ানো বন্ধ করে দিয়েছেন। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁদের কাছে যারা প্রাইভেটে পড়ত, সেই ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনায় একটা ছন্দপতন ঘটে গিয়েছে।
সমস্যায় বেশি পড়েছে দ্বাদশ ও দশমের পড়ুয়ারা। বোর্ডের পরীক্ষার যখন আর এক বছরও বাকি নেই, তখন আচমকা প্রাইভেটে পড়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে বলে তারা মনে করছে। সেই পড়ুয়াদের অনেকের সঙ্গেই কথায় উঠে এল, এত অল্প সময়ের মধ্যে ভালো পড়ানোর মতো প্রাইভেট টিউটর কোথায় পাওয়া যাবে, তা ভেবে তারা দিশাহারা হয়ে পড়েছে।
শুধু স্কুলের পড়ানো ভালো রেজ়াল্টের জন্য যথেষ্ট নয় বলেও তাদের দাবি। অভিভাবকদের কাছ থেকে শোনা গেল দুই ধরনের মতামত। এক, নবম থেকে দ্বাদশের ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রে এই বছরের জন্য নিয়ম শিথিল করা হোক। দুই, নিজের স্কুলের বদলে অন্য স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোর অনুমতি দেওয়া হোক।
এই বিষয়ে প্রশ্নের উত্তরে অ্যাডভ্যান্সড সোসাইটি ফর হেড মাস্টার্স অ্যান্ড হেড মিস্ট্রেসেস অ্যাসোসিয়েসন–এর কালনা মহকুমার সভাপতি শ্রীমন্ত ঘোষ বলেছেন, ‘স্কুলে ভালো করে পড়াতে বলব শিক্ষকদের।’ পড়ুয়াদের উদ্দেশে তাঁর পরামর্শ, ‘ছাত্রছাত্রীদের স্কুলে বেশি বেশি প্রশ্ন করে উত্তর জেনে নিতে হবে।’ তাঁর আরও বক্তব্য, ‘বিভিন্ন এলাকায় অনেক মেধাবী ছেলেমেয়ে রয়েছে, যারা শিক্ষকতার চাকরি পায়নি। প্রয়োজনে তাদের কাছে পড়া যেতে পারে।’
শিক্ষারত্ন পুরস্কারে সম্মানিত জীববিজ্ঞানের প্রাক্তন শিক্ষক তাপসকুমার কার্ফার মতে, ‘স্কুলে পরীক্ষার দিন কমিয়ে কার্যকরী পঠন দিবস বাড়াতে হবে। তা হলেই ছাত্রছাত্রীরা টিউশনমুখী হবে না।’ কালনার একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক মৃণাল মুখোপাধ্যায় বলেছেন, ‘সরকারের নির্দেশিকা পালন করতে হবে। তবে অন্য স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো যাবে কি না, সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা হলে ভালো হয়।’