এখন কেমন আছে মধ্যবিত্তের বিষয়-আশয়?
দীর্ঘ সময় ধরে জনপরিসরে ভারতীয় অর্থনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে মধ্যবিত্ত। নব্বইয়ের দশকের অর্থনৈতিক সংস্কারের পরবর্তী সময় থেকে দেশের বিকাশের গল্পের মেরুদণ্ড হলো মধ্যবিত্ত সমাজ। ক্রয়ক্ষমতার কারণে এদের হাতে সেই জাদুদণ্ড আছে যা অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আজকের ভারতে যখন দেশের অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, তখন মধ্যবিত্ত সমাজ কি নিজেই সঙ্কটে! সাম্প্রতিক তথ্য-পরিসংখ্যান সেই প্রশ্নগুলিকেই সামনে আনছে।
সরকার বা নীতি-প্রণেতা, মধ্যবিত্তদের উপর তাদের কতখানি আস্থা তা বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ২০২৫ সালের বাজেটের শেষ পর্বে। খানিক বিরতি নিয়ে অর্থমন্ত্রীর ঘোষণা, ১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয়ের মানুষদের কোনও আয়কর লাগবে না। উল্লাসে ফেটে পড়ল সংসদ, সেই উল্লাস যেন শত গুণ হয়ে ধ্বনিত হলো সরকারি, কর্পোরেট অফিস ও বাণিজ্য মহলে। এই ঘোষণার সময় অর্থমন্ত্রীর একটা কথা নজর এড়ায়নি। তিনি বললেন তাদের সরকার ‘মধ্যবিত্তদের উপর বিশ্বাস রাখছে’। এই বিশ্বাসের মানে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় অর্থনীতি সম্বন্ধে সাধারণ ধারণা থাকা মানুষজনদের। মোদ্দা কথাটা হলো, ১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয় করা মানুষদের যে কর সাশ্রয় হবে, তা মধ্যবিত্তরা বাজারে খরচ করবে। এই টাকা বাজারে এলে চাহিদা বৃদ্ধি হবে, পণ্যের বিক্রি বাড়বে, শিল্পজাত দ্রব্যের উৎপাদন বাড়বে, শেয়ার বাজারে বিশেষ করে এসআইপি-তে মানুষ লগ্নি করবে। মধ্যবিত্ত যদি সরকারের বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে পারে, তবে ভারতের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
উপর্যুপরি বাজেটে এটা পরিষ্কার যে মধ্যবিত্তের আয়করের বোঝা কমিয়ে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির দাওয়াই মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে মোদী সরকার। এই বাধ্যতা নতুন কথা নয়। নব্বইয়ের দশকে নয়া অর্থনৈতিক মডেল চালু হওয়ার পর থেকে নয়া উদারবাদী অর্থনৈতিক ভরকেন্দ্রে আছে এই মধ্যবিত্তদের কথা। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য বেতন কমিশনের সুপারিশ, পরিষেবা ক্ষেত্রের বৃদ্ধি এ দেশে এক নব্য মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্ম দিয়েছে যারা কর্পোরেট জগতের ভাষায় ‘কনজ়িউমার’। ভোগ্যপণ্য থেকে মোটর গাড়ি, ফ্ল্যাট থেকে শেয়ার বাজার— এদের ভরসা করেই পসরার যাবতীয় আয়োজন। মোট জনসংখ্যার ঠিক কতটা এই শ্রেণি, এই শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতার উপর ভরসা করেই এক সুবিশাল দেশের অর্থনীতি টিঁকে থাকতে পারে কি না, তা নিয়েও বিতর্ক প্রচুর। তবে অস্বীকার করার কোনও কারণ নেই যে সরকার প্রথম থেকেই মধ্যবিত্তকে তাদের ‘গ্রোথ ইঞ্জিন’ ভেবেছে এবং দেশি ও বিদেশি লগ্নিকারীদের কাছে এই মধ্যবিত্তদের সোনার খনি রূপে বিবৃত করেছেন।
এখন এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি কাকে বলে এবং তাদের সংখ্যা নিয়ে একটা প্রাথমিক আলোচনা জরুরি। অর্গানাইজ়েশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট (ওইসিডি) বলছে, যারা দিনে ১০ থেকে ১০০ মার্কিন ডলার আয় করে তাদের মধ্যবিত্ত হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। আবার পিপল রিসার্চ অন ইন্ডিয়া’জ় কনজ়িউমার ইকোনমি-র (প্রাইস) সংজ্ঞা অনুসারে, ভারতে যে ব্যক্তির বাৎসরিক আয় ৫ লক্ষ থেকে ৩০ লক্ষ টাকার মধ্যে, তারা মধ্যবিত্ত। এই ব্যক্তিরা সেই সামাজিক-সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর মধ্যে পড়ে যাদের জীবনে এক ধরনের আর্থিক স্থিতি আছে, কোনও আকস্মিক আর্থিক বিপর্যয়ে তারা চট করে দারিদ্র্যে তলিয়ে যায় না। সেন্ট্রাল বোর্ড অব ডায়রেক্ট ট্যাক্সেস-এর (সিবিডিটি) পরিসংখ্যান বলছে ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে ৮ কোটির কাছাকাছি মানুষ আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছে। তাদের মধ্যে ৪ কোটির সামান্য বেশি মানুষের আয় ছিল বছরে ৫ লক্ষ টাকার সামান্য বেশি। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে আরও ২.৩৫ কোটি লোক সে বছরে আয় কর দিয়েছে কিন্তু এখনও রিটার্ন দাখিল করেনি। যদি ধরা যায় তাদের প্রত্যেকের বার্ষিক আয় ৫ লক্ষ টাকার বেশি, তা হলেও সংখ্যাটা হয় ৬.৩৫ কোটি। একটু বাড়িয়ে বর্তমান অবস্থায় সংখ্যাটা ১০ কোটি ধরা যাক, যাদের বছরে আয় ৫ লক্ষ টাকার বেশি। কেউ যদি বার্ষিক আয়ের সীমারেখা ৪ লক্ষের মধ্যে নামিয়ে আনে, তা হলেও সংখ্যাটা ১৪-১৫ কোটির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
প্রশ্ন হলো, এই ‘গ্রোথ ইঞ্জিন’ বাঁচিয়ে রাখার জন্য অক্সিজেন কেন দিতে হচ্ছে! সহজ উত্তর, মধ্যবিত্ত তাদের ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত হারাচ্ছে। এই বিষয়ে কর্পোরেট দুনিয়ায় প্রথম বিপদ সংকেত দেন নেসলে ইন্ডিয়া-র চেয়ারম্যান সুরেশ নারায়ণ। তিনি প্রথম দেখান যে ফুড অ্যান্ড বেভারিজ সেক্টরে সাধারণ ভাবে দুই অঙ্কের বৃদ্ধি দেখা গেলেও ২০২৪ অর্থবর্ষের তিনটি ত্রৈমাসিকে তা মারাত্মক ভাবে কমে ১.৫-২ শতাংশ হয়েছে। এর পর ব্রিটানিয়া, এশিয়ান পেন্টস, ডাবর, পার্লে সহ একাধিক কোম্পানি মধ্যবিত্তের সঙ্কট নিয়ে ভারতীয় মিডিয়ায় ঝড় তোলে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শহরে চাহিদা হ্রাস কারণ চাকুরিজীবী মধ্যবিত্ত মূলত শহরে বাস করে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সমীক্ষা ক্রেতাদের কেনার ধরনে এমন কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করে যা কর্পোরেট জগতকে আরও চিন্তায় ফেলে দেয়। দেখা যায় পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মধ্যবিত্ত পছন্দের কর্পোরেট ব্র্যান্ডের বদলে সস্তা ও স্থানীয় ব্র্যান্ডের দিকে ঝুঁকছে। এই চাহিদা কমার বিষয়টা শুধু এফএমসিজি (ফাস্ট মুভিং কনজ়িউমার গুডস) সেক্টরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, সব ক্ষেত্রেই থাবা বসাচ্ছে।
মধ্যবিত্তদের আর্থিক সঙ্কটের কারণ একাধিক এবং সমস্যার ধরন বহুমাত্রিক। প্রথম সমস্যা, যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি না পাওয়া এবং প্রকৃত মূল্যে মাইনের বৃদ্ধি না হওয়া। ভারতে বিভিন্ন শাখায় প্রতি বছর ৮০ লক্ষ জন গ্র্যাজুয়েট হয়। কিন্তু আজকের কাজের বাজারে তাদের চাকরির সুযোগ ক্রমশ কমছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই মুহূর্তে দেশের গ্র্যাজুয়েটদের বেকারির হার ২৯.১ শতাংশ যা নিরক্ষর বা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পাশদের থেকে ৯ গুণ বেশি। আইআইটি-গুলো থেকে যারা পাশ করে বেরোচ্ছে তাদের মধ্যে ৮-২১.৫ হাজার জন চাকরি পাচ্ছে না। বম্বে আইআইটি-তে এ বছর ক্যাম্পাসিংয়ের সময় ন্যূনতম বার্ষিক প্যাকেজ কমেছে। তার থেকেও চিন্তার খবর হলো, সংস্থাগুলো মনে করছে যে গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে ৫৭ শতাংশ যে ডিগ্রি অর্জন করেছে, কাজের বাজারে তার কোনও মূল্য নেই। নতুন চাকরি যেমন হচ্ছে না তেমনই মুদ্রাস্ফীতির তুলনায় মাইনে বৃদ্ধি যথাযথ নয়। এক দশক আগে মধ্যবিত্তের গড় আয় ছিল ১০.২৩ লক্ষ টাকা যা আজকের দিনে ১০.৬৯ লক্ষ টাকা। মুদ্রাস্ফীতির নিরিখে এই বৃদ্ধি ঋণাত্মক।
আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে তথ্যপ্রযুক্তি সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজের বাজারে বিশ্বজুড়ে কোপ পড়ছে। ভারতও তার থেকে মুক্ত নয়। আইটি কর্মসংস্থান নিয়ে কাজ করা ‘ব্রেকপয়েন্ট’-এর তথ্যানুসারে ভারতে গ্র্যাজুয়েটদের সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান জোগায় তথ্যপ্রযুক্তি-শিল্প। সেখানে এই মুহূর্তে প্রায় ৮৫ লক্ষ কর্মী রয়েছে। কিন্তু এআই আসার পরে শুধু ২০২৪-২৫ আর্থিক বর্ষে কাজ হারিয়েছেন ১ লক্ষ মানুষ। নীতি আয়োগ আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আগামী দিনে এই ক্ষেত্রে কর্মী সংখ্যা ৮০ লক্ষ থেকে কমে ৬০ লক্ষ হবে। আইটি সঙ্কটের বিষয়টি বহু আলোচিত কিন্তু বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে জানা গেছে যে ব্যাঙ্ক, বিমা সহ আর্থিক সংস্থা, মিডিয়া, বিনোদন শিল্প, হোটেল ইন্ডাস্ট্রির মত জায়গা যেখানে মধ্যবিত্তরা এত দিন পর্যন্ত ভালো মাইনের চাকরি করে এসেছে, সে সব জায়গাতেও কর্মী ছাঁটাই শুরু হয়েছে। সরকারি সমীক্ষা অনুসারে কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স জব এখন আছে ২৫ লক্ষ, যা আগামী দিনে কমে ১৮ লক্ষ হওয়ার আশঙ্কা।
মোদ্দা কথাটা হলো, মধ্যবিত্তের আয় সেই হারে বাড়ছে না, যে হারে খরচ বাড়ছে। আজ এক সাধারণ ভেজ থালির বার্ষিক বৃদ্ধি ১১ শতাংশ, গড়পড়তা চিকিৎসা খরচ বৃদ্ধি ১৪ শতাংশ, পরিবহণ খরচ ১৫ শতাংশ, শিক্ষাখাতে ১৭-১৮ শতাংশ। এই অবস্থায় সব দিক সামলাতে মধ্যবিত্ত ধার করছে। দেখা যাচ্ছে ৬৭ শতাংশ মধ্যবিত্ত পরিবারে ৩০ বছর হওয়ার আগেই ব্যক্তিগত ঋণের প্রয়োজন পড়ছে। আজ মধ্যবিত্তের বার্ষিক আয়ের ৪০ শতাংশ চলে যাচ্ছে ঋণের কিস্তি মেটাতে। আর এই ঋণ কিন্তু কোনও আর্থিক সম্পদ কিনতে খরচ হচ্ছে না, ব্যয় হচ্ছে চিকিৎসা, শিক্ষা খাতে বা স্মার্টফোনের মত গ্যাজেট কিনতে। ২০২৫ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে দেখা যায় গৃহস্থের ঋণ জিডিপি-র ২৩.৯ শতাংশ যা বিগত বছরে ওই সময়ে ছিল ২৩.১ শতাংশ। ফলে সঞ্চয়েও ঘাটতি। আজ ভারতে সঞ্চয়ের হার জিডিপি-র মাত্র ৫.৩ শতাংশ যা এক বিপদসংকেত। মধ্যবিত্ত ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে জিনিস কেনার পর সব সময় টাকা শোধ করতে পারছে না। ক্রেডিট কার্ডে অনাদায়ী টাকার পরিমাণ ২০২৪ সালে ছিল ৬ হাজার ৭৪২ কোটি টাকা।
‘গ্রোথ ইঞ্জিন’ যদি সঙ্কটে থাকে, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়তে বাধ্য। কেন্দ্রীয় সরকারের গৃহস্থালির খরচ সংক্রান্ত তথ্য (হাউসহোল্ড কনজ়ামশন এক্সপেন্ডিচার সার্ভে) অনুযায়ী মধ্যবিত্তের আয়ের গড়পড়তা ৬৫ শতাংশ খরচ হয় খাবার, বাড়িভাড়া, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো অতি-প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোতে, ফলে মধ্যবিত্তের হাতে খরচ করার মতো অতিরিক্ত টাকা থাকছে না। আর তার প্রভাবে অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমছে। তার পরোক্ষ ফল শ্রমজীবী মানুষের উপর পড়ছে।
বিশ্বায়নের সূচনা পর্বে বলা হয়েছিল এই মধ্যবিত্তরা এক উজ্জ্বল জীবনের স্বপ্ন দেখে যা তারা এত দিন পায়নি। এই কথা আসলে জেমস অ্যাডামস-এর ‘আমেরিকান ড্রিমস’-এর ভারতীয়করণ। ১৯৩৯ সালে অ্যাডামস বলেছিলেন: ‘দ্য আমেরিকান ড্রিম ইজ় দ্যাট ড্রিম অফ আ ল্যান্ড ইন হুইচ লাইফ শুড বি বেটার অ্যান্ড রিচার অ্যান্ড ফুলার ফর এভরিওয়ান উইথ অপরচুনিটি ফর ইচ অ্যাকর্ডিং টু এবিলিটি অর অ্যাচিভমেন্ট’। তিন দশকে সেই স্বপ্নের পেছনে দৌড়ানো মধ্যবিত্ত আজ এক দেওয়ালের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। মাইনে না বাড়লে, কাজের সুযোগ না বাড়লে, কাজ চলে গেলে হাতে টাকার জোগান আসবে না। ফলত চাহিদা বাড়বে না, উৎপাদন বাড়বে না। নির্মলা সীতারামন আয়করে ছাড় দিয়ে এই দেওয়াল ভাঙার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। ইতিহাস বলছে, মধ্যবিত্তের টিকে থাকার প্রয়োজনীয় শর্তগুলো না থাকলে এই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হওয়াটাই বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি।
লেখক সমাজকর্মী ও শিক্ষক