পেনাল্টিটা খুবই খারাপ মেরেছিলাম, বলছেন মেসি
সব্যসাচী সরকার, ডালাস
সে বার টিমমেটরা হুড়মুড় করে তাঁর হোটেলের রুমে ঢুকে পড়েছিলেন মধ্যরাতে। িদ মারিয়া, দে পল, রোমেরো। বিশাল একটা কেক নিয়ে। প্রিয় লিওর গালে স্নেহচুম্বন এঁকে দিয়ে দি মারিয়া টিমমেটদের বলেছিলেন, ‘চলো, লিওর জন্য আর একটা ট্রফি জিতি।’
ঠিক দু’বছর আগের কথা। এই দেশেই তখন চলছিল কোপা আমেরিকা। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে চিলি ম্যাচের আগে মেসির জন্মদিন পালন করেছিল টিম। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ কভার করার জন্যে নিউ ইয়র্কে থাকায় সেই ম্যাচ দেখতে হাজির থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। দেখেছিলাম, ৮০ হাজারের স্টেডিয়াম কী ভাবে একসঙ্গে গাইছে, ‘ফেলিজ় কুমপ্লেয়ানিওস লিও!’ হ্যাপি বার্থডে-র স্প্যানিশ করলে যা হয়।
এ বারও ফুটবল ঈশ্বরের জন্মদিন বিশ্বকাপের মধ্যেই। থাকবেন কানসাস সিটির বেসক্যাম্পে টিমমেটদের সঙ্গে। আজই ৩৯-এ পা দিচ্ছেন তিনি। এখন প্রশ্ন, এই টিমে কে হবেন দি মারিয়া? টিমমেটদের ডেকে বলবেন, ‘দুটো ম্যাচে লিও টিমকে টেনে দিয়েছে। চলো, ওর শেষ বিশ্বকাপে ফেয়ারওয়েল হিসেবে কাপটা আমরা ওর হাতে তুলে দিই।’
অস্ট্রিয়া ম্যাচ শেষে ডালাসের মিডিয়া সেন্টারে আর্জেন্তিনার একঝাঁক সাংবাদিককে দেখছিলাম, দ্রুত কানসাস সিটি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নিতেই হবে। মেসির জন্মদিনের সেলিব্রেশন তো ওখানেই। শোনা যাচ্ছে, বেসক্যাম্পে মধ্যরাতে কেক কাটার পরে হবে বার-বি-কিউ, যাকে আর্জেন্তিনীয়রা বলেন ‘আসাদা।’ টিমের সবাই মিলে একসঙ্গে বসে করবেন ডিনার।
টিম নক আউটে উঠে গিয়েছে, তার উপরে মিক্সড জ়োনে দাঁড়িয়ে স্বয়ং ফুটবল ঈশ্বর বলে দিয়েছেন, ‘টিমের নক আউটে যাওয়াটা প্রথম লক্ষ্য ছিল। আমি যা চেয়েছিলাম, সেটাই হয়েছে।’ ক্যাপ্টেনের জন্মদিনের আগে স্বস্তিতে টিম।
দুটো ম্যাচে পাঁচ গোল, এই ৩৯ বছর বয়সেও মেসি প্রায় একার কাঁধে টানছেন টিমকে। অ্যাটাকিং থার্ডে তাঁর পায়ে বল পড়া মানেই আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে অপোনেন্ট ক্যাম্পে। তার পরেও অকপটে বলছেন, ‘পেনাল্টিটা খুবই খারাপ মেরেছিলাম। একেবারেই প্ল্যান অনুযায়ী হয়নি। আমাদের ভাগ্য ভালো, শেষ পর্যন্ত এই মিসটা বড় হয়ে ওঠেনি।’ টিমমেটদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ‘এই বিশ্বকাপে প্রতি ম্যাচে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হচ্ছে। অনেকগুলো টিম কাপ জিততে পারে। কোনও ম্যাচ সহজ হবে না।’ স্কালোনি বলছেন, ‘আমরা যখন ম্যাচে ভালো খেলছি না, তখন লিওর পায়ে বল পড়লেই সব বদলে যাচ্ছে। টিম সুইচ অন হচ্ছে। লিওকে নিয়ে টানা কথা বলে আমি কিছুটা ক্লান্ত। সবাই দেখছে, এই বয়সে কোন পর্যায়ে যেতে পারে টিমের প্রতি ওর কমিটমেন্ট। আমি নতুন কী বলব?’
লিও তো আছেনই, আসলে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার রোমেরার চোট যথেষ্ট চিন্তায় ফেলে দিয়েছে স্কালোনিকে। ওতামেন্ডি আছেন ঠিকই, কিন্তু রোমেরোর চোট গুরুতর হলে ডিফেন্স নিয়ে নক আউটে ভুগতে হবে। তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, এই ৩৯ বছর বয়সে সব গোল মেসিকে করতে হবে কেন? লাউতারো বা আলবারেস কেন গোল করবেন না? ডালাসে মাঠে ফেরত আর্জেন্তিনা সমর্থকেরা এই নিয়ে গলা তুলছেন। তিয়াগো আলমাদা গোল পাননি ঠিকই, কিন্তু অসম্ভব পরিশ্রমী হিসেবে চোখ টেনেছেন। মিডফিল্ডে ম্যাক অ্যালিস্টার, দে পল বা এন্সো ফের্নান্দেসকে নিয়ে তৈরি মাঝমাঠটাকে একটা দুর্দান্ত ইউনিট হিসেবে তৈরি করে দিয়েছেন স্কালোনি। যে কোনও সময়ে যাঁরা মেসিকে বক্সের কাছাকাছি জ়োনে বল বাড়াতে পারেন। বাকিটা ঈশ্বরের পায়ের জাদু। মিডফিল্ডের আসল পরীক্ষা অবশ্য নক আউটে।
মেসির জাদুটা কী রকম? ফ্রান্স-ইরাক ম্যাচের শেষে প্রেস মিটে ফ্রান্স অধিনায়ক ভয়ঙ্কর এমবাপের দিকে প্রশ্ন এল, ‘মেসি-আপনি-হাল্যান্ড-হ্যারি কেন সবাই গোল করছেন। একজনকে বাছতে হলে কাকে বাছবেন?’
চোরা গতি আর বুলডোজ়ারের মতো শটে এই বিশ্বকাপে চার গোল করা এমবাপেকে দেখা গেল, হেসে বললেন, ‘এদের মধ্যে একজনই সেরা। লিওনেল মেসি। কোনও কথা হবে না।’
পুরোনো মদের মতোই ভিন্টেজ মেসি মায়া কাজল পরিয়ে দিচ্ছেন প্রতি ম্যাচে, ফুটবল দুনিয়া তাঁকে নিয়ে বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে আছে। আজ জন্মদিনে কোটি কোটি ভক্তের শুভেচ্ছা আর ভালোবাসা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে পৌঁছে যাবে তাঁর কাছে। বেসক্যাম্পের বাইরে থাকবে অসংখ্য ভক্ত। কারণ, অস্ট্রিয়া ম্যাচ জিতেই লা আলবিসেলেস্তে ফিরে গিয়েছে কানসাস সিটির বেস ক্যাম্পে। ডালাস থেকে কানসাস সিটি মাত্র দেড় ঘণ্টার ফ্লাইট। পরের ম্যাচ শনিবার জর্ডনের বিরুদ্ধে, ডালাসেই। তার আগে টিম ফের উড়ে আসবে।
ফেয়ারওয়েল গিফ্ট! এই শব্দটা এখন আজের্ন্তিনীয়দের মুখে মুখে ঘুরছে। তাঁর টিমমেটরা মেসির জন্য দিতে পারবেন এই উপহার?