পর্ব ৩: গাণ্ডীবের ওজন- আধুনিক পেশাজীবীরা কীভাবে ‘বার্নআউট’ এড়াতে পারে? - 24 Ghanta Bangla News
Home

পর্ব ৩: গাণ্ডীবের ওজন- আধুনিক পেশাজীবীরা কীভাবে ‘বার্নআউট’ এড়াতে পারে?

Spread the love

মহাভারতের কুরুক্ষেত্র থেকে আধুনিক কর্পোরেট জীবনের দূরত্বটা আসলে এক লহমায় মুছে যায়, যখন আমরা অর্জুনের অস্ত্র, গাণ্ডীবের দিকে তাকাই।

মহাভারত-কথা অনুযায়ী, এই অলৌকিক ধনুক স্বয়ং ব্রহ্মার তৈরি। অগ্নিদেবের আশীর্বাদ হয়ে আসে অর্জুনের হাতে। গাণ্ডীব সাধারণ কোনও ধনুক ছিল না। অপরাজেয় ক্ষমতার প্রতীক ওই ধনুক। পরম প্রতিষ্ঠা দানকারী। আর এক অন্তহীন গুরুভার। তাই মধ্যম পাণ্ডবকে আজীবন সেই গাণ্ডীবের মান রেখে চলতে হয়েছে। তাঁর প্রতিজ্ঞাই ছিল, যে এই ধনুকের অবমাননা করবে, তাকেই তিনি বধ করবেন।

ঠিক এই জায়গাতেই নিজের সঙ্গে অর্জুনের মিল খুঁজে পাবেন আধুনিক পেশাজীবী। তাঁদেরও রয়েছে একান্ত গাণ্ডীব — বহু কষ্টে অর্জিত ডিগ্রি, জ্ঞান-অভিজ্ঞতা, সমাজে একটা সুদৃঢ় প্রতিষ্ঠার আকাঙ্খা আর প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশার নির্মম চাপ। প্রজেক্ট, ডেডলাইন আর পারফরম্যান্সের ইঁদুরদৌড় সামলাতে সামলাতে আধুনিক মানুষও যেন এক গাণ্ডীবধারী অর্জুন। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, এ ভাবে কতদিন? স্নায়ু টানটান করে, চারপাশের হাজারো প্রত্যাশার তীর সামলে, কতদিন লড়ে যাওয়া যায়?

পথের ক্লান্তি

সহজ উত্তর, বেশিদিন যায় না। এক দিন না এক দিন ‘সিস্টেম ক্র্যাশ’ করবেই। ভিতরের রক্তমাংসের মানুষটা ক্লান্ত হতে হতে একটা সময় স্রেফ ভেঙে পড়ে। তখন অবশ মগজ আর অবসন্ন মন ব্যাকুল হয়ে গাইতে থাকে, “পথের ক্লান্তি ভুলে স্নেহভরা কোলে তব/ মা গো, বলো কবে শীতল হবো/ কতদূর আর কতদূর…”। এই চরম ক্লান্তির মুহূর্ত এসেছিল সেই অপরাজেয় মহারথীর জীবনেও, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ঠিক আগে। সমস্ত অহংকার, জেদ আর কর্তব্য ভুলে ত্যাগ করেন প্রিয়সাথী গাণ্ডীবকে। রথের পিছনের আসনে বসে পড়েন নিঃস্বের মতো। জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধের মুখে হাল ছেড়ে দেন বিষাদ-হতাশায়।

গ্রাফিক্স: রুশিতা বোস দত্ত

অর্জুনের এই অবসন্ন অবস্থাকেই গীতাকার বলেছেন ‘অর্জুন-বিষাদ’। অধুনা মনোবিজ্ঞান যার নাম দিয়েছে ‘বার্নআউট’ বা চরম মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি। আর কর্মসংস্কৃতির দিক থেকে আরও এক কদম এগিয়ে, জাপানিরা একে চিহ্নিত করেছে ‘কারোশি’ বা অতিরিক্ত কাজের চাপে অবধারিত মৃত্যু হিসেবে। কুরুক্ষেত্রের দিন আজ নেই। আছে অধুনা পেশা-প্রতিবেশ। অর্জুনের চিত্ররথ নেই। আছে অত্যাধুনিক অফিস ডেস্ক। কিন্তু বিষাদের সেই চেনা অন্ধকার আজও রয়ে গিয়েছে।

মহাভারতের মহানায়ক সব্যসাচী অর্জুনের পথরেখা ধরে এগোলে, আজকের কর্পোরেট ‘বিষাদ’ (‘বার্নআউট’) থেকে মুক্তির কিছু স্মার্ট এবং কার্যকর দাওয়াই পাওয়া যাবে।

১. ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ যত্রতত্র নয় (অ্যাটেনশন অ্যালোকেশন)

রণক্ষেত্রে অর্জুন কিন্তু সাধারণ পদাতিক সৈন্যের বিরুদ্ধে ব্রহ্মাস্ত্র বা গাণ্ডীবের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করতেন না।

আপনিও প্রতিদিনের সব কাজ বা ফাইলকে সমান গুরুত্ব দিয়ে স্নায়ুর ওপর চাপ বাড়াবেন না। সবচেয়ে জরুরি (বা সর্বোচ্চ মাত্রার সৃজনশীল) কাজটা আগে করুন। বাকি কাজগুলো, যেমন প্রাত্যহিক-সাপ্তাহিক-মাসিক রিপোর্ট বা মিটিং (রিপিটেটিভ টাস্ক) যথাসম্ভব কম শক্তি খরচে সেরে নিন। পারলে অন্যকে দিয়েও করিয়ে নিতে পারেন। প্রতিষ্ঠানের অনুমতি থাকলে এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) এর সাহায্যও নিতে পারেন।

২. যুদ্ধবিরতির ‘নো-গো জোন’ (ডিজিটাল ডিটক্স)

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সূর্যাস্তের সময় শঙ্খধ্বনি বাজত, যুদ্ধ বন্ধ হতো।

মুশকিল হলো, আধুনিক পেশাজীবীর দিনে যেন কোনও সূর্যাস্ত নেই। সময়ের বাইরে কাজ চালিয়ে যাওয়া, ব্যক্তিগত সময়ে আচমকা মিটিং, অনেক সময় এমনকী গভীর রাতেও ইমেলের উত্তর দিতে হয়। চাপ বাড়তে থাকে। উপায়, ডিজিটাল ডিটক্স। অফিসের সময়ের পর ল্যাপটপ বা কাজের ফোন পুরোপুরি বন্ধ রাখুন। সম্ভব হলে, সপ্তাহে অন্তত একটা দিন সম্পূর্ণ ‘অফ-গ্রিড’ চলে যান। মগজ রিচার্জ করার সুযোগ না দিলে গাণ্ডীবের ছিলা ছিঁড়বেই।

গ্রাফিক্স: রুশিতা বোস দত্ত

৩. একজন ‘শ্রীকৃষ্ণ’ খুঁজুন (মেন্টরিং)

অর্জুন যখন বিষাদগ্রস্ত হয়ে রথের পেছনে বসে পড়েছিলেন, তিনি কিন্তু একা ছিলেন না। পাশে শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন। তৎকালীন আর্যাবর্তের সবচেয়ে কৌশলী ‘স্ট্র্যাটেজিস্ট’। সবার আগে চিনেছিলেন হস্তিনাপুরের বর্ষীয়ান অভিভাবক পিতামহ ভীষ্ম। যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞের অগ্রার্ঘ্য দেওয়ার মত দিয়েছিলেন। সেই কুশাগ্রবুদ্ধি রাজপুরুষ মন দিয়ে অনুজপ্রতিম শিষ্যের কথা শুনেছেন এবং পথ দেখিয়েছেন। (অর্জুনের অর্জনের প্রেক্ষাপটে লীলাচূড়ামণির কর্মকৌশলের একটা আভাস-রেখা সিরিজের শেষে আসবে, এখন এইটুকুই থাক)

আপনিও পেশাগত (বা ব্যক্তিগত) জীবনে এমন একজন ‘মেন্টর’ বা ‘থেরাপিস্ট’ রাখুন, যাঁর কাছে মনের সব ক্লান্তি খুলে বলা যায়। নীরবে, একা একা সব চাপ বয়ে বেড়ানো বার্নআউটের এক নম্বর অনুঘটক।

৪. কর্মব্যস্ত দিনের মাঝে ‘স্নেহভরা কোল’ তৈরি করুন (মাইক্রো-ব্রেক)

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া গানটি যেমন বলছে, ‘মা গো, বলো কবে শীতল হবো’, আপনার তপ্ত স্নায়ুরও ঠিক এই শীতলতার প্রয়োজন। অর্জুনের ক্ষেত্রে এটা ছিল শ্রীকৃষ্ণের সুমধুর সঙ্গ। সঙ্গে বাকি ভাইরা, আর আত্মীয়-শুভানুধ্যায়ীরা তো ছিলই।

আপনিও কাজের মাঝে ‘ব্রিদিং স্পেস’ বের করুন। পমোডোরো টেকনিক অনুসরণ করতে পারেন। ২৫ মিনিট অন্তর ৫ মিনিটের বিরতি। কাজের সময়সীমা (২৫ মিনিট) আপনার সুবিধেমতো বাড়িয়েও নিতে পারেন। তা ছাড়াও দিনে অন্তত ১৫-২০ মিনিট এমন কিছু করুন যার সঙ্গে কেরিয়ার বা আয়ের দূরতম সম্পর্ক নেই। স্রেফ গান শোনা, বই পড়া বা চুপচাপ হাঁটা হতে পারে ভালো অনুষঙ্গ।

৫. ‘হিরো সিনড্রোম’ ত্যাগ করুন (পারফেকশনিজমের ফাঁদ)

গাণ্ডীবের অবমাননাকারীকে হত্যা করার যে প্রতিজ্ঞা, সেটাই অর্জুনের মানসিক চাপের অন্যতম কারণ হয়েছিল।

কর্পোরেট দুনিয়ায় ‘আমি ছাড়া এই প্রজেক্ট ডুববে’ বা ‘আমাকে সব সময় সেরা হতে হবে’ – এই জেদটাই মানুষকে ‘কারোশি’র দিকে ঠেলে দেয়। ঠান্ডা মাথায় মেনে নিন যে, আপনি রক্তমাংসের মানুষ, কোনও এআই বা রোবট নন। প্রাতিষ্ঠানিক প্রত্যাশার কোনও শেষ নেই। তাই নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা বুদ্ধিমানের কাজ। আর প্রয়োজনে মুখের ওপর ‘না’ বলাটা শিখতেই হবে। তবে সেটা সুকৌশলে, স্মিতমুখে।

মোদ্দা কথাটা হচ্ছে…

অর্জুনের গাণ্ডীব আর আপনার ফোন-ল্যাপটপ-টাস্ক, পেশাগত লক্ষ্য বা জীবিকা অর্জনের মাধ্যম মাত্র, আপনার গোটা জীবন নয়। তাই পথক্লান্ত হয়ে রথের পিছনে বসাটা পরাজয় নয়, আসলে নতুন করে শক্তি সঞ্চয়ের বিরতি।

সর্বে ভবন্তু সুখিন।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *