ইতিহাস ভোলানোর চেষ্টা! ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’-এ নমোর নিশানায় বিরোধীরা
এই সময়: দেশভাগের সময়ে পুরো বাংলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টার কথা জানা সত্ত্বেও কংগ্রেস চুপ করে বসেছিল— ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালনের অনুষ্ঠানে এমনই অভিযোগ তুললেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বিজেপি বাংলায় ক্ষমতায় আসার পরে ২০ জুন ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শনিবারই সেটা প্রথম বার সরকারি ভাবে পালিত হলো। সেই অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে নমোর অভিযোগ, দেশ বিভাজনের ষড়যন্ত্রকারীদের সামনে নতজানু হয়ে বসেছিল তৎকালীন কংগ্রেস। স্বাধীনতার পরে প্রথমে কংগ্রেস, তার পরে বামফন্ট এবং সব শেষে তৃণমূল সরকার সেই ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। মোদীর পাশাপাশি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও একই অভিযোগ তুলেছেন। পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করতে জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা তথা হিন্দু মহাসভার জনপ্রতিনিধি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অবদানের কথাও স্মরণ করেন দু’জনে। ভারত ভাগের ইতিহাস টানতে গিয়ে মোদী ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ এবং নোয়াখালির দাঙ্গার প্রসঙ্গও তোলেন। মোদীর মতে, এত যন্ত্রণার পরেও বাঙালি তার অস্মিতাকে ভোলেনি। পরিবর্তনের সরকার সেই বাঙালি অস্মিতাকে সম্মান করে।
দেশভাগের প্রসঙ্গ তুলে মোদী বলেন, ‘১৯৪৬–এ কলকাতায় হিংসা, নোয়াখালির হিংসায় কত নির্দোষ বাঙালি মারা গিয়েছেন! বাংলা রক্তপাত সহ্য করেছে। নিজের পরিজনকে হারিয়েছেন অনেকে। মাতৃভূমিকে টুকরো হতে দেখেছেন। কিন্তু বাংলা নিজের অস্মিতা এবং পরিচয়কে নষ্ট হতে দেয়নি।’ তাঁর সংযোজন, ‘যখন পুরো বাংলাকে ভারত থেকে পৃথক করার পরিকল্পনা চলছিল, তখন পশ্চিমবঙ্গকে পৃথক রাজ্য তৈরি করে ওই পরিকল্পনা সফল হতে দেওয়া হয়নি। আমরা পশ্চিমবঙ্গ দিবসকে শুধু একটা তারিখ হিসেবে স্মরণ করছি না। পুরো ইতিহাসকে স্মরণ করছি।’
এর পরেই কংগ্রেসকে নিশানা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যখন পুরো বাংলাকে পাকিস্তানের অংশ করার চেষ্টা হচ্ছিল, তখন কংগ্রেস ষড়যন্ত্রকারীদের সামনে হাঁটু মুড়ে বসেছিল। বিভাজনের সময়ে কংগ্রেস বাংলাকে অবহেলায় ফেলে রাখতে চেয়েছিল।’ স্বাধীনতার পরেও বাংলাকে অবহেলা করা হয়েছে— এই অভিযোগ তুলে মোদীর বক্তব্য, ‘দেশভাগের পরে অবশিষ্ট পশ্চিমবঙ্গকে নিয়েও তোষণের খেলা শুরু করে দিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো মহান সন্তানদের সঙ্গে যে মাটির যোগ রয়েছে, সেখানে বিদেশি বিচারধারা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রথমে কংগ্রেস, তার পরে বামেরা, তারও পরে তৃণমূল— দশকের পর দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের আড্ডা হয়ে উঠতে দিয়েছে। ফলে বাংলা এগোনোর বদলে আরও পিছিয়ে গেল।’
পশ্চিমবঙ্গ দিবস নিয়ে প্রচারের সুর এ দিন সকালে বাংলায় পা–রাখার আগেই সামাজিক মাধ্যমে পোস্টের মাধ্যমেই বেঁধে দিয়েছিলেন মোদী। ওই পোস্টে তিনি লেখেন, ‘রাজ্যের ইতিহাসে ২০ জুন দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই দিনটিতেই সুনিশ্চিত করা হয়েছিল যে, পশ্চিমবঙ্গ ভারতেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে থাকবে। আর এই অসাধ্য সাধনের নেপথ্যে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অমূল্য ও দূরদর্শী অবদান ছিল। কাকতালীয়ভাবে, ২০২৬ সালে আমরা তাঁর ১২৫তম জন্মজয়ন্তী পালন করছি, যা এই দিনটির গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।’
এ দিনের অনুষ্ঠান থেকে শুভেন্দু জানান, শ্যামাপ্রসাদের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কলকাতায় বসানো হবে তাঁর ১২৫ ফুটের মূর্তি। এই দিনটিতে পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন বিজেপি এর আগেও করেছে। কিন্তু তা বেসরকারি ভাবে। রাজ্যে পালাবদলের পরে সরকারি ভাবে ২০ জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালনের অনুষ্ঠানের মূল চমক ছিল প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি। পশ্চিমবঙ্গ দিবসের মঞ্চ থেকে শ্যামাপ্রসাদের ইতিহাস ও অবদান সবিস্তার বর্ণনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। আগামী ২৩ জুন ‘আত্মবলিদান দিবস’ এবং ৬ জুলাই তাঁর ১২৫তম জন্ম-জয়ন্তী সাড়ম্বরে পালন করার কথা ঘোষণা করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী জানান, হুগলির জিরাটে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের পৈতৃক ভিটে কিনে সেখানে একটি লাইব্রেরি এবং স্মৃতিসৌধ গড়ে তোলা হবে।
‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ কবে পালিত হবে, তা নিয়ে পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলেই বিতর্ক দানা বেঁধেছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ১ বৈশাখকে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসেবে পালন করত। তবে সরকার বদলের পর স্থির হয়েছে ২০ জুনই পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে পালিত হবে। উল্লেখ্য, ১৯৪৭–এর এই দিনেই পশ্চিমবঙ্গকে আলাদা করে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত পাশ হয়েছিল বাংলার প্রাদেশিক আইনসভায়। যদিও প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী বলেন, ‘বিজেপির তথ্য ভুল। প্রাদেশিক আইনসভায় সেদিন ৫৮-২১ ভোটে পশ্চিমবঙ্গ পৃথক রাজ্য এবং এপার বাংলার ভারতভুক্তির প্রস্তাব পাশ হয়েছিল। সেখানে ৫৮ জনের মধ্যে সিপিআই-এর তিন জন, নির্দল দু’জন আর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছাড়া বাকি জনপ্রতিনিধিরা ছিলেন কংগ্রেসের।’