মাত্র ১৮-তেই বিদায়! তারায় দুনিয়ায় অষ্টাদশী ‘মোগলি গার্ল’, জানেন তাঁর পরিচয়?
‘জঙ্গল জঙ্গল বাত চলি হ্যায়, পাতা চলা হ্যায় ইয়ে…’, গানটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে দূরদর্শনের জনপ্রিয় কার্টুন মোগলি। তাঁর জীবনের শুরুটা ছিল একদম মোগলির মতোই। রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর ‘দ্য জঙ্গল বুক’-এর বাস্তব রূপ ছিল এই মেয়ে। বনের কোলেই তাঁর বেড়ে ওঠা। আট বছর বয়সে প্রথম মানুষের স্পর্শ পায় সে। মেলে নতুন নাম, নতুন ঠিকানা। তবু ‘মোগলি গার্ল’-এর নাড়ির টান জুড়ে ছিল জঙ্গলেই। ২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশের জঙ্গলে উদ্ধার হওয়া ‘মোগলি গার্ল’-এর জীবনাবসান হয় গত ১৫ জুন। মানুষের মাঝে এক দশক কাটতে না কাটতেই চিরবিদায় নিলেন অষ্টাদশী তরুণী।
কে ছিলেন ‘মোগলি গার্ল’?
মানুষের জগতে ঠাঁই পাওয়ার পরে তাঁর নাম হয়েছিল এহসাস, কিন্তু সবাই তাঁকে এক ডাকে চেনে ‘মোগলি গার্ল’ হিসেবেই। এই নামের পিছনে রয়েছে একটি গল্প। যে গল্প হুবহু উঠে এসেছিল রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর লেখা ‘দ্য জঙ্গল বুক’-এর পাতা থেকে। গল্পের বাচ্চা ছেলেটির মতোই এই মেয়েটিরও বেড়ে ওঠা জঙ্গলে। তাই তাঁর নাম দেওয়া হয় ‘মোগলি গার্ল’।
‘মোগলি গার্ল’-এর উদ্ধারের গল্প
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে প্রথম খবরের শিরোনামে আসেন ‘মোগলি গার্ল’। স্থানীয় গ্রামবাসীরা কাটরানিয়াঘাট অরণ্যে কাঠ কাটতে গিয়ে দেখেন একটি বাচ্চা মেয়ে হনুমানের দলের সঙ্গে ঘুরছে। সম্পূর্ণ নগ্ন, বড় বড় চুল, অনেকটা পশুর মতোই দেখতে লাগছিল মেয়েটিকে। সেও ওই হনুমানের দলের সঙ্গে ওদের মতো আচরণ করছে। গভীর অরণ্যে এ রকম অবস্থায় একটি বাচ্চা মেয়েকে দেখে সবাই অবাক হয়ে যান। হনুমানগুলোর কাছ থেকে তাঁরা মেয়েটিকে সরিয়ে আনার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। তেড়ে আসে হনুমানগুলো। আর ওই মেয়েটিও পশুগুলোকে যেন আরও আঁকড়ে ধরে। পরে তাঁরা পুলিশে খবর দেয়।
এর পরে জঙ্গল জুড়ে চলে অভিযান। মাসখানেক খোঁজাখুঁজির পরে ফের হনুমানের দলের সঙ্গে দেখা যায় মেয়েটিকে। বনকর্মীদের সহায়তায় মেয়েটিকে উদ্ধার করা হয়। এক পুলিশকর্মী জানান, মেয়েটিকে আনার সময়ে হনুমানের দল বহু দূর পর্যন্ত গাড়িটি ধাওয়া করে এসেছিল।
উদ্ধার থেকে পুনর্বাসনের দীর্ঘ পথ
উদ্ধারের সময়ে মেয়েটির আচরণ ছিল অস্বাভাবিক— চার হাত-পায়ে চলাফেরা করতেন, মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকতেন, পোশাক পরতে চাইতেন না এবং চিৎকার বা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দিতেন। তখন তাঁর বয়স ছিল আট বছর।
উদ্ধারের পরে প্রথমে বাহরাইচের শিশু কল্যাণ কমিটি তাঁর নাম দেয় ‘পূজা’। পরে তাঁর নতুন নাম রাখা হয় ‘এহসাস’। লখনউয়ের মোহন রোড এলাকার একটি সরকারি শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করা হয়।
বছরের পর বছর চিকিৎসা, থেরাপি এবং পরিচর্যার মাধ্যমে ধীরে ধীরে তাঁর আচরণে পরিবর্তন আসে। আওয়াজ করা ছেড়ে ভাঙা ভাঙা শব্দ বলতে শেখেন এহসাস। শেখেন পোশাক পরতেও। হোমের কেয়ার গিভারদের স্নেহ ও যত্নে মানুষের মতো সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হতে ওঠে শুরু করেন। তবু জঙ্গলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পরে কোথাও যেন একটা ক্ষত রয়েই গিয়েছিল।
চিকিৎসকেরা জানান, এহসাসকে স্বাভাবিক জীবনে অভ্যস্ত করানোর চেষ্টা হলেও মস্তিষ্কের বিকাশ সীমিত ছিল। এ ছাড়াও ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা। মৃগীরোগজনিত সমস্যাও ছিল তাঁর। মাঝে মাঝেই সে কারণে অসুস্থ হয়ে পড়তেন তিনি। চলতি বছর জুন মাসের শুরুতে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরে কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও ১৫ জুন তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে তাঁকে আবার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা এহসাসকে মৃত ঘোষণা করেন।
বনের ক্রোড়েই বেড়ে ওঠা এহসাস দশক কাটিয়েও তথাকথিত সভ্য মানুষের একজন হয়েও হননি। তাই সহজাত জঙ্গলিপনা ভুলে সভ্যতার সঙ্গে দীর্ঘসংগ্রামে মাত্র ১৮-তেও ক্লান্ত হয়ে বিদায় নিলেন। শুধু ‘দ্য জঙ্গল বুক’-এর মতোই চিরন্তন হয়ে গেল ‘মোগলি গার্ল’-এর জীবনের গল্প।