দখলমুক্ত করার অভিযান চলছেই, সব হারিয়ে অসহায় তরুণরা
সুশান্ত বণিক, আসানসোল
এ ভাবে যে কখনও সর্বস্ব খুইয়ে পথে দাঁড়াতে হবে, তা স্বপ্নেও ভাবেননি অশীতিপর তরুণ গঙ্গোপাধ্যায়। রাতারাতি মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। কী ভাবে এখন পরিবারের মুখে চার বেলার খাবার তুলে দেবেন?
একা তরুণ-ই নন। তাঁর মতো এ ভাবেই সব খুইয়েছেন অনেকেই। এঁরা ফুটপাথের হকার। কেউ ১০, কেউ বা ২০, অনেকে আবার তারও বেশি সময় ধরে পথের ধারে অস্থায়ী ছাউনি তৈরি করে ব্যবসা করেছেন। তাতেই জুড়িয়েছে পেটের খিদে। পড়াশোনা করেছে ছেলেমেয়ে। কিন্তু সম্প্রতি শিল্পাঞ্চলের একাধিক শহরকে দখলমুক্ত করার অভিযানে কোপ পড়েছে এঁদের উপরেই। উচ্ছেদ করার আগে কেউ পুনর্বাসন অথবা অন্ন সংস্থানের বিকল্প উপায় নিয়ে ভাবার প্রয়োজন অনুভব করেননি।
বার্নপুর বাড়ি ময়দান এলাকার হকার তরুণ বলছিলেন, ‘প্রায় ৩৭বছরের পুরোনো দোকান। ইস্কোর নোটিস পেয়ে তুলে নিয়েছি। তা না-হলে তো বুলডোজার চালিয়ে ভেঙে দেবে।’ জানালেন, পর্যাপ্ত পুঁজিও নেই যে, অন্য কোথাও গিয়ে নতুন করে ব্যবসা শুরু করবেন। বিকল্প ব্যবস্থা করে দেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন এলাকার বিধায়কের কাছে। তবে নিজেই মানছেন, তাতে খুব একটা লাভ হবে না।
বুলডোজার ধেয়ে আসছে দেখে দোকানের শেড খুলতে শুরু করেছিলেন বার্নপুরের আপার রোড এলাকার হকার অভিজিৎ রায়। ১৮ বছর ধরে এখানেই দোকান ছিল তাঁর। স্ত্রী, দুই ছেলেকে নিয়ে সংসার। তিনি একমাত্র উপার্জনক্ষম। অভিজিৎ বলছেন, ‘স্কুল থেকে ফেরার পথে বড় ছেলে দোকান দেখতে না-পেয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিল। জানতে চেয়েছে, লেখাপড়ার খরচের এ বার হবে কী ভাবে! উত্তর দিতে পারিনি।’ এই মুহূর্তে খোলা আকাশের নীচেই বসছেন পসরা সাজিয়ে।
বার্নপুর শহরের হকাররা জানাচ্ছেন, ২০১৬-য় তাঁদের সঙ্গে ইস্কো কর্তৃপক্ষের চুক্তি হয়েছিল, ৩২ ফুট মূল রাস্তার দু’প্রান্তের সাত ফুট ছেড়ে তাঁরা লোহার কাঠামো বানিয়ে বসতে পারেন। কর্তৃপক্ষ জল-বিদ্যুতের ব্যবস্থা করবেন। বিনিময়ে বছরে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিতে হবে। হকারদের দাবি, ‘চুক্তি মতো ব্যবসা করতে দেওয়া হোক।’ এলাকার বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পালকে হকাররা অনুরোধ করেছেন ইস্কো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার জন্য। বিধায়ক জানিয়েছেন, তিনি কথা বলবেন। ইস্কো কর্তৃপক্ষ অবশ্য অতীতের চুক্তি মানতে নারাজ। তাঁদের মতে, হকারদের ফুটপাথ খালি করতেই হবে।
আসানসোলের হটন রোড, রামধনি মোড়-সহ পার্শ্ববর্তী এলাকা ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। বুলডোজারের ধাক্কায় নিজের দোকান গুঁড়িয়ে যেতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন শিব গড়াই। তিনি বললেন, ‘রাজ্যে পরিবর্তনের এক মাসের মধ্যে ভাগ্যও যে পাল্টে যাবে, তা ভাবতেই পারিনি।’ বেঁচে থাকতে এখন ঠেলা চালিয়ে সামগ্রী বিক্রি করার কথা ভেবেছেন।
প্রসঙ্গত, ইতিপূর্বে আসানসোলের রবীন্দ্রভবন ও জিটি রোড লাগোয়া এলাকায় হকার উচ্ছেদ করেছিলেন পুর কর্তৃপক্ষ। উচ্ছেদ হওয়া প্রায় ৫০ জন হকারকে বিকল্প জমি দেওয়ার কথা বলা হলেও তাঁরা তা পাননি। নতুন বিধায়ক কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায় সাফ বলে দিয়েছেন, সরকারি জমি থেকে দখলদারদের তোলা হবেই। রাজ্য সরকারের তরফে বহু জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। আবেদন করলেই সবাই সেই সুবিধা পাবেন।