মশারির খুঁট থেকে অপরাধীর কোমর, বাঙালির জীবনে দড়ির মাপ কত জানেন?
দড়ির ইতিহাসে তাই কেবল বাঁধন নেই, রয়েছে ভারসাম্যের প্রশ্নও। হাটে, বাজারে কিংবা মেলায় যেমন দড়ির খেলা চলে, এ যেন সেই রকমই। উঁচু খুঁটির উপরে বাঁধা সরু দড়ির উপরে মাথায় হাঁড়ি, কলসি নিয়ে ব্যালান্সের খেলা দেখায় কোনও কিশোর বা কিশোরী। লোকে অবাক হয়, পয়সা দেয়। আর তার জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে সরু সুতোর মতোই বিছানো থাকে শুধু দড়িটুকু। বিচার আর প্রতিহিংসার মাঝেও তাই। ব্যবধান একটা দড়ির। একই সঙ্গে ব্যবধান মানুষের সঙ্গে মানুষের মতো আচরণেরও। এমনটাই মনে করেন মানবাধিকারকর্মী সুজাত ভদ্র। বললেন, ‘আগে অনেক কিছুই হয়েছে। কিন্তু সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে আমাদের মানিয়ে চলতে হবে। তাই বন্দির অধিকার রক্ষা করাটাও আমাদের কর্তব্য।’ তাঁর স্পষ্ট কথা, ‘পুলিশ কোনও বন্দির সঙ্গেই অবমাননাকর আচরণ করতে পারে না।’
ধৃত তৃণমূল নেতাদের কোমরে দড়ি বেঁধে পুলিশ যে ভাবে তাঁদের প্রকাশ্যে ঘোরাচ্ছে, তাতে মানবাধিকার অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছিলেন কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য অধীর চৌধুরী। তাঁর বক্তব্য, ‘তৃণমূলের বিরুদ্ধে আমাদের অনেক অভিযোগ আছে। কেউ অনিয়ম করলে, আইন অনুযায়ী আদালতে তার বিচার হবে। কিন্তু আইন, সংবিধান না-মেনে কোমরে দড়ি বেঁধে রাস্তায় ঘোরানো আসলে ক্ষমতার আস্ফালন। এটা তালিবানি ব্যবস্থা নয়! সংবিধান প্রত্যেককে মর্যাদার অধিকার দিয়েছে।’ অধীরের এই মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্যের মন্ত্রী আনন্দময় বর্মণ বলেন, ‘আইন আইনের পথে চলবে। আইনি পথেই দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। প্রকাশ্য লাঞ্ছনা সমর্থনযোগ্য নয়। আশা করি, আইনের রক্ষকেরা আইনের দিক মাথায় রেখেই পদক্ষেপ করবেন।’
বরানগরের বিধায়ক সজল ঘোষ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আইনের চোখে কোনও নেতা-দাদার ব্যাপার নেই। যে অপরাধ করবে, আইনের চোখে সে অপরাধী। এ রকম ক্রিমিনালকে কোমরে দড়ি বেঁধে ঘোরালে পুলিশের প্রতি আস্থা বাড়ে সমাজের। পাশাপাশি ক্রিমিনালদেরও মর্যাল ডাউন হয়।’ অর্থাৎ, শুধু আচরণ নয়, এ যেন আসলে এক ধরনের চেতাবনি। বুঝিয়ে দেওয়া, কত ধানে কত চাল। সমাজতত্ত্ববিদ শাশ্বতী ঘোষের কথায়, ‘জনতা বলুন কিংবা পুলিশ, বলতে চাইছে, মনে রেখো, তোমাকে একদিন হাফপ্যান্ট আর গেঞ্জি পরিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে ঘুরিয়েছিলাম। বেশি বেড়ো না।’ তবে ‘অভিযুক্ত’-ভেদে দড়ির আচরণ পাল্টে যায় বলেও মনে করেন তিনি। কোনও সময়ে সে নববধূর মতো লাজুক। সামনে আসতেই চায় না। হাসতে হাসতে শাশ্বতী বললেন, ‘স্বরূপ বিশ্বাসকে দেখুন। তাঁকে কিন্তু দড়ি পরানো হয়নি। প্যারেড করায়নি। কিন্তু জাহাঙ্গির খানকে করিয়েছে। ব্যাপারটা বুঝলেন?’
গভীর বিষয় বটে। ‘আমার হাত বান্ধিবি, পা বান্ধিবি, মন বান্ধিবি কেমনে?/আমার চোখ বান্ধিবি, মুখ বান্ধিবি পরাণ বান্ধিবি কেমনে?’ কার যে হাত বাঁধার চেষ্টা হচ্ছে, আর কার পরাণ, সাধারণ মানুষের পক্ষে সত্যিই বোঝা দায়। তবে সমাজতত্ত্ববিদ প্রশান্ত রায়ের যুক্তি সহজ, সরল। তাঁর কথায়, ‘দড়িতে কারও ক্ষতি হয় না। আবার এটা কেটে বেরোনোও সহজ নয়। আসলে এর একটা ট্র্যাডিশনাল অ্যাসপেক্ট আছে।’ এক সময়ের অভিযুক্তের কোমরে দড়ি পরানো প্রথার কথাও মনে করাচ্ছেন তিনি, ‘আসল কথাটা হলো, লজ্জা দেওয়া। লজ্জা পাওয়ানো। যাতে সে শুধরে যায়। ভবিষ্যতে আর এই কাজ না করে।’ কিন্তু অপমান কি সত্যিই মানুষকে শুধরে দেয়? কে জানে!