‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই আকাশ তো বড়...’ - 24 Ghanta Bangla News
Home

‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই আকাশ তো বড়…’

Spread the love

অনিমেষ দত্ত

ছোট উদ্যোগ। ছোটদের উদ্যোগ। দু’টি শর্ট ফিল্ম। পরিসরও ছোট। কিন্তু সাতরঙা রামধনুর মতোই আলো ছড়াল সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত একদিনের ‘প্রাইড ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’। ১৫০ জ‍ন পড়ুয়া, শিক্ষক এবং সিনেপ্রেমী সাক্ষী থাকলেন একেবারে ভিন্ন স্বাদের দুই ফিকশন ছবির।

ভালোবাসা মানেই পুরুষ-নারীর প্রেম। গড়পড়তা সিনেমায় দেখানো এই ধারণাকে প্রশ্ন করে প্রথম ছবি ‘আই অ্যাম নট হার লাভার’ (তুমি তো তেমন প্রেমিক নও)। লেখক এবং পরিচালক দেবারতি গুপ্তর এই ছবি আসলে দুই মেয়ের গল্প। একজন কমবয়সী। অন্যজন মাঝবয়সী। তারা একটি পুরোনো ভাঙাবাড়িতে থাকে। গল্পের কথক কমবয়সী মেয়েটি সারাদিন মাঝবয়সী মহিলাকে পর্যবেক্ষণ করে। তবে তা কখনও ‘স্টক’ করার পর্যায়ে পৌঁছয় না। সে ওই মহিলাকে ভালোবাসতে চায়— কিন্তু সমাজ-প্রদত্ত প্রেমের ধারণাকে নস্যাৎ করে। সূঁচে সুতো পরানোর মতো সূক্ষ কাজের মধ্যে দিয়েও সেই ‘ডিজ়ায়ার টু লাভ’ ফুটে ওঠে চরিত্রের মধ্যে। কমবয়সী মেয়েটি আসলে নিঃসঙ্গতার মধ্যেই ভালোবাসা খুঁজে নেয়। কিন্তু সে কখনও স্বীকৃতি দাবি করে না। মাত্র ১৮ মিনিটের এই সিনেমা যেন ‘পোয়েট্রি ইন মোশন’।

Film Festival

দেবারতির ছবি গত ৪ জুন মুম্বইয়ে আয়োজিত ‘কশিস প্রাইড ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে’ প্রথম প্রদর্শিত হয়েছে। কমবয়সী মেয়েটির চরিত্রে অভিনয় করেছেন দ্যুতি পুরকাইত। মাঝবয়সী চরিত্রে দেবলীনা সেন চাড্ডা। দু’জনেই এককথায় অনবদ্য। নিজের সিনেমা প্রসঙ্গে দেবারতির ব্যাখ্যা, ‘আসলে আমাদের ভারতীয় ছবিতে পুরুষের চোখ দিয়ে নারীকে দেখার প্রবণতাই বেশি। আমি চেষ্টা করেছি, একজন নারীর চোখ দিয়ে নারীর মন এবং শরীরকে দেখতে। তাকে না ছুঁয়ে, না কথা বলে।’

দ্বিতীয় ছবি ‘ফাটল, দ্য ক্র্যাক’ আবার বৃহন্নলাদের অন্দরমহলের গল্প। সামাজিক অবক্ষয়, চারপাশের বদলে যাওয়া ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির হলকা এসে পড়েছে এই সম্প্রদায়ের মধ্যেও। একসঙ্গে খেতে বসে এক বৃহন্নলা প্রশ্ন তুলছে, ‘মাছের গাদা পিসটা আমাকে, আর ও মুসলিম বলে ওকে পেটি? এদের দেশ থেকেই তাড়িয়ে দেওয়া উচিত।’ সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে ‘গুরুমা’ বলে, ‘আমাদের মধ্যে আবার হিন্দু-মুসলিম এল কোথা থেকে?’ গুরুমা এই ‘ফাটল’ প্রত্যক্ষ করে। চরিত্ররা যে বাড়িতে থাকেন, সেটাতেও গুচ্ছের ফাটল। পরিচালক খুব সচেতন ভাবেই ঘরের ড্রেসিং টেবিলের আয়নাতেও সেই ‘ফাটল’ রেখে দেন। যা শেষ দৃশ্যে একটি চমৎকার রূপক হয়ে ওঠে। দর্শকদের মনে থেকে যায় এই দৃশ্যগুলো।

‘আই অ্যাম নট হার লাভার’ যেখানে খুব ধীরগতিতে দর্শকের মনের ভিতরে ঢুকে পড়ে, ‘ফাটল’ ছবিটি সেখানে সরাসরি ধাক্কা দেয় দর্শকদের মাথায়, মনে। ছবির পরিচালক শঙ্খজিৎ বিশ্বাস, সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে এডিটিংয়ের অধ্যাপক। তাঁর এডিটিং এমনকী, মাঝেমধ্যে সাদাকালো ফ্রেমের ব্যবহার একেবারে ‘ফিট টু ফ্রেম’। নিজের ছবি প্রসঙ্গে শঙ্খজিৎ বলছেন, ‘আমরা একটা অস্থির সময়ের মধ্যে বাস করছি। সর্বত্র জাতি-ধর্ম-বর্ণ— এ সবের ভিত্তিতে একটা ফাটল তৈরি হয়েছে এবং সেই ফাটল ক্রমশ চওড়া হচ্ছে। ছবির মাধ্যমে সেই ফাটলের একটা এগজ়ামিনেশন করার চেষ্টা করেছি।’

১৬ মিনিটের এই ছবিটিও সদ্য সমাপ্ত ‘কশিস প্রাইড ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে’ প্রদর্শিত হয়েছে। সেখানে জুরিদের স্পেশ্যাল মেনশনও পেয়েছে। সিনেমায় মুখ্য চরিত্রে যে পাঁচ জন অভিনয় করেছেন, তাঁরা নিজেরাও বৃহন্নলা। প্রত্যেকেই চমৎকার। দু’টি ছবির চিত্রনাট্য, সম্পাদনা, সিনেমাটোগ্রাফিও চোখে লেগে থাকার মতো। একবার নয়, বারবার দেখা যায়।

২০১৮ থেকে সংস্কৃত বিশ্ববিদালয়ে ‘প্রাইড মান্থ’ উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। এ বার ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে দুই পরিচালককে কাছে পেয়ে সরাসরি প্রশ্ন করেছেন পড়ুয়ারাও। সব মিলিয়ে নিঃশব্দে দর্শকমনে ভাবনার খোরাক জুগিয়ে শেষ হয়েছে এই ফেস্টিভ্যাল।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *