সওয়া কোটিতে শুরু! পেয়ালায় শরাব ঢালা ‘সাকি’ নিলামে
কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়
ছবি বিক্রি হবে অন্তত ২ কোটি টাকায়। নিলামে ‘বেস প্রাইস’ রাখা হয়েছে এক কোটি ২৫ লক্ষ টাকা। অর্থাৎ, ছবির ডাক–ই শুরু হবে ওই টাকায়।
কীসের ছবি? কার আঁকা ছবি? হালকা অন্ধকার ব্যাকগ্রাউন্ডে একটি মাত্র চরিত্র। এক তরুণী পানপাত্রে সুরা ঢালছেন। ছবিটির নাম ‘সাকি’। ১৯৩০–’৩১ নাগাদ প্রখ্যাত বাঙালি শিল্পী হেমেন্দ্রনাথ মজুমদারের আঁকা এই ছবিই জুনের ২২ বা ২৩ তারিখে মুম্বইয়ের নামকরা নিলামঘর ‘অষ্টগুরু’–র নিলামে উঠতে চলেছে। নিলামে এই ছবির কোড— ‘লট নম্বর ফাইভ’। দৈর্ঘ্যে ২০ ইঞ্চি এবং প্রস্থে ১৪.৭ ইঞ্চির ছবিটি বোর্ডের উপর তেলরং ব্যবহার করে আঁকা হয়েছিল।
‘অষ্টগুরু’ অকশন হাউজ়ের আশা, ছবিটি অন্তত ২ কোটি টাকায় বিক্রি হতে চলেছে। অতীতে ভারতের কোনও নিলামঘরে হেমেন মজুমদারের ছবি এর চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হওয়ার নজির রয়েছে মাত্র দু’বার। ১৯২৮–এ আঁকা একটি অনামী (আনটাইটেল্ড) ছবি মুম্বইয়েরই একটি নিলামে বিক্রি হয়েছিল ৫ কোটি ৪ লক্ষ টাকায়। ‘রাধা ও কৃষ্ণ’ নামের একটি ছবি বিক্রি হয়েছিল ৩ কোটি ৭০ লক্ষ টাকায়।
‘সাকি’ নিয়ে রীতিমতো সাড়া পড়ে গিয়েছে শিল্পরসিকদের মধ্যে। শিল্প–ইতিহাসবিদ ও হেমেন্দ্রনাথ মজুমদারের পরিবারের সদস্য অনুরাধা ঘোষ ছবিটি প্রসঙ্গে ‘এই সময়’–কে বললেন, ‘১৯৩০–এর দশকের একেবারে শুরুর দিকে কাশ্মীরের মহারাজার আমন্ত্রণে শিল্পী সেখানে কয়েক মাস কাটিয়েছিলেন। সেই সময়েই ছবিটি আঁকা।’ অনুরাধার কথায়, ‘হেমেন্দ্রনাথ মজুমদার বেশি পরিচিত ছিলেন হেমেন মজুমদার নামেই। তাঁর আঁকা ‘সিক্তবসনা সুন্দরী’ সিরিজ়ের ছবিগুলো সেই সময়েই এক ধরনের বিদ্রোহের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। ওই বিদ্রোহ ছিল অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে তৈরি হওয়া ‘নিও বেঙ্গল স্কুল’–এর বিরুদ্ধে।’
অনুরাধার সংযোজন, ‘১৯১৯–এ হেমেন মজুমদার, অতুল বসু, যামিনী রায়ের মতো শিল্পীরা ‘ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অফ আর্ট’ প্রতিষ্ঠা করেন। হেমেন মজুমদারের আঁকা ছবিতে আলো–ছায়ার ব্যবহার, কাপড়ের ভাঁজ ও অঙ্কনশৈলীতে ইউরোপীয় শিল্পীদের প্রভাব খুব বেশি।’ স্নানের পরে ভিজে কাপড় পরা বাংলার মহিলাদের যে ছবি উনি এঁকেছিলেন, তাতে তুলির টান, রংয়ের ব্যবহার এবং ছবির ‘টোনাল এফেক্ট’ আজও মুগ্ধ করে।
অন্য এক শিল্প–ইতিহাসবিদ সুশোভন অধিকারীর বক্তব্য, ‘এই সাকি ছবিতে আলোছায়ার ব্যবহার যে অসামান্য মুনশিয়ানার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তা এক কথায় অনবদ্য। যাঁরা ছবির বিষয়ে খবর রাখেন, তাঁরা বুঝবেন, এই ছবিতে ডাচ স্বর্ণযুগের বিখ্যাত শিল্পী রেমব্রান্টের প্রভাব কতটা গভীর।’ সুশোভন বলেন, ‘স্বদেশি আন্দোলন ও তার প্রভাব যখন তুঙ্গে, সেই সময়ে ইউরোপীয় ভাবধারায় ছবি আঁকা শুরু করে হেমেন মজুমদার সমালোচিত হন। কিন্তু ওঁর স্টাইল শেষ পর্যন্ত ব্রাত্য হয়নি। আগে নিলামে অন্যান্য ছবি বিপুল টাকায় বিক্রি হওয়া, এ বার সাকি–র বেস প্রাইস সওয়া কোটি টাকা হওয়া বোঝাচ্ছে ওঁর ঘরানার গ্রহণযোগ্যতা কতটা।’ এই ছবি এক সময়ে দিল্লির ব্যবসায়ী শোভা সিংয়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল। পরে হাত ঘুরে ছবিটি তাদের কাছে পৌঁছয়।