‘আমাকে বাঁচান স্যর, আমি পড়তে চাই’, বান্ধবীর হাত দিয়ে শিক্ষকদের চিরকুট পাঠিয়ে বিয়ে বন্ধ করালো মালদার কিশোরী
এই সময়, মালদা: ঋত্বিক ঘটকের কালজয়ী সিনেমা ‘মেঘে ঢাকা তারা’-র শেষ দৃশ্যে নীতা (সুপ্রিয়া দেবী) চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘দাদা আমি বাঁচতে চাই’। সেই সময়কার মারণ রোগ টিউবারকিউলোসিস (টিবি)-এ মৃত্যু হয় রিলের নায়িকার। টিবি শারীরিক ব্যাধি হলেও বাস্তবে এমন একটি সামাজিক রোগ অনেক গভীরে ছড়িয়ে আছে, যার কাগুজে নাম-চাইল্ড ম্যারেজ। হাজারো সচেতনতার পরেও এই ব্যাধি কিছুতেই দূর করা যাচ্ছে না।
ঘটনাচক্রে এই রোগেরই শিকার হতে যাচ্ছিল ১৬ বছরের একটি তরতাজা প্রাণ। কিন্তু সে হেরে যাওয়ার পাত্রী নয়। ‘শি ওয়ান্টস টু লিভ।’ শুরু হলো লড়াই। একদিন গোপনে দশম শ্রেণির ওই ছাত্রী তার স্কুলের শিক্ষককে পাঠিয়ে দিল চিরকুট। তাতে লেখা- ‘আমাকে বাঁচান স্যর, ওরা জোর করে আমার বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। আমি পড়তে চাই।’ রিলের নীতা না-বাঁচলেও বাস্তবের ওই কিশোরী কিন্তু সামাজিক ব্যধির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে উঠল। তার এই লড়াই অন্য কিশোরীদের কাছেও যেন প্রেরণা।
মালদার হবিবপুর থানার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী একটি গ্রামে বাড়ি ওই কিশোরীর। বাবা দীর্ঘদিন আগেই মারা গিয়েছেন। মেয়েটির পরিবার চাষবাসের সঙ্গে যুক্ত। বাড়িতে বয়স্ক মা, দাদা, দিদি এবং বেশ কয়েক জন আত্মীয় রয়েছেন। স্থানীয় একটি স্কুলে পড়াশোনা করছে সে। কিশোরী জানিয়েছে, কোনওরকম আলোচনা না-করেই আচমকা এক দিনমজুরের সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক করে দেয় পরিবার। মেয়েটির মাথায় যেন বাজ পড়ে।
সে বারবার বলতে থাকে, ‘আমি এখন বিয়ে করব না। আমি পড়ব।’ অভিযোগ, কেউ তার কথায় কর্ণপাত করেননি। শেষে বিয়ে করবে না বলে বাড়িতেই ‘বিদ্রোহ’ ঘোষণা করে সে। তার ফলও ভুগতে হয়। বন্ধ হয়ে যায় স্কুলে যাওয়া। সহপাঠীদের সঙ্গে দেখা করাতেও ‘নিষেধাজ্ঞা’ জারি হয়।
প্রায় এক সপ্তাহ গৃহবন্দি ছিল মেয়েটি। এরই মাঝে জানা যায় আগামী শুক্রবার তার বিয়ে। এ বার কোনও উপায় না দেখে এই ‘জাঁতাকল’ থেকে বেরনোর উপায় খুঁজতে থাকে ওই কিশোরী। অবশেষে সুযোগ আসে রবিবার। বন্ধু এক সপ্তাহ ধরে স্কুলে না-আসায় তার খোঁজ নিতে বাড়িতে আসে এক বান্ধবী। তার হাতেই ওই চিরকুট ধরিয়ে দেয় সে। এরপরে বন্ধুর কথামতো গোপনে সেই চিরকুট পৌঁছে দেয় স্কুলের শিক্ষকদের কাছে। বিষয়টি জানাজানি হতেই নড়েচড়ে বসেন স্কুল কর্তৃপক্ষ। ওইদিনই পাঁচ জন শিক্ষক ওই ছাত্রীর বাড়িতে গিয়ে বিয়ের প্রস্তুতি বন্ধ করে দেন।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক জয়দেব লাহিড়ী বলেন, ‘ওই ছাত্রী যদি চিরকুটটা না-পাঠাতে পারত, তা হলে আমরা হয়তো বিষয়টি জানতেও পারতাম না। আমাদের শিক্ষকরা ছাত্রীর মা এবং পরিবারের অন্যদের স্পষ্ট জানিয়ে এসেছেন, বাল্যবিবাহ আইনত অপরাধ। এতে কঠোর সাজা হতে পারে। ছাত্রীর বিয়ে দেওয়া যাবে না।’ তাঁর সংযোজন, ‘বেশ কিছুক্ষণ বোঝানোর পরে নিজেদের ভুল বুঝতে পারে ছাত্রীর পরিবার। বিষয়টি পুলিশকেও জানানো হয়েছে। সোমবার ওই ছাত্রী আগের মতোই স্কুলে এসে ক্লাস করেছে।’
নিজের বিয়ে বন্ধ করে সে এখন গোটা গ্রামের ‘নয়নের মণি’। কিশোরীর কথায়, ‘আমি স্কুলের স্যরদের মতো শিক্ষক হতে চাই। গ্রামের গরিব ঘরের ছেলেমেয়েদের পড়াতে চাই। আমি আবার স্কুলে যেতে পারছি। বড় একটা আতঙ্ক থেকে মুক্তি পেলাম।’ তার এই লড়াইকে কুর্নিশ জানিয়েছেন হবিবপুরের বিধায়ক এবং রাজ্যের প্রতিমন্ত্রী জোয়েল মুর্মু। তাঁর কথায়, ‘ছাত্রীরা নিজেরাই সচেতন হয়েছে, এটা খুবই ভালো কথা। আমি ওই ছাত্রী এবং স্কুল কর্তৃপক্ষকে সাধুবাদ জানাচ্ছি।’