দিল্লিতেও ঝড় তৃণমূলের ঘরে? বিদ্রোহী সাংসদরা ‘নিভৃতে’, বাতিল পুর–বৈঠকও
এই সময়, কলকাতা ও নয়াদিল্লি: কলকাতায় পরিষদীয় দলে ভাঙন স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে আগেই। এমনকী, রবিবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লি রওনা হওয়ার ঘণ্টা কয়েক আগে কলকাতা পুরসভার অধিকাংশ তৃণমূল কাউন্সিলার পর্যন্ত সাড়া দেননি কালীঘাটে দলীয় অফিসে নেতৃত্বের ডাকা বৈঠকে। প্রবল অভ্যন্তরীণ ঝড়ে কলকাতায় জোড়াফুলে যখন একরকম ছারখার, ঠিক সেই সময়েই দিল্লি পাড়ি দিয়েছেন তৃণমূলনেত্রী।
৪ মে বাংলার বিধানসভা ভোটের রেজ়াল্ট বেরনোর পরে এই প্রথমবার তাঁর দিল্লি সফরের কারণ হিসেবে সরকারি ভাবে তৃণমূলের তরফে দেখানো হচ্ছে, জাতীয় স্তরে ‘ইন্ডিয়া’ শিবিরের বৈঠকে যোগদানকে। কিন্তু ‘ইন্ডিয়া’ নয়, গোটা দেশের রাজনৈতিক পণ্ডিতদের নজর এখন তৃণমূলের দিকেই। কলকাতায় জোড়াফুলের পরিষদীয় দলে যে ভাঙন–নাট্যের সূত্রপাত, তার যবনিকা পতন কি দিল্লিতে সংসদীয় দলে বিভাজনের মধ্যে দিয়েই শেষ হবে— এ নিয়ে চূড়ান্ত জল্পনা রাজধানীর অন্দরমহলে।
ঠিক যে ভাবে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার অধ্যক্ষের কাছে গিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়করা বিরোধী দলনেতা বেছে নিয়েছেন, দিল্লিতে লোকসভা ও রাজ্যসভাতে জোড়াফুলের বেসুরো সাংসদরাও সেই একই রণকৌশল নিতে চলেছেন বলে গত ক’দিন ধরেই গুঞ্জন রয়েছে। সেই প্রক্রিয়া আজ–কালের মধ্যেই ঘটে যাবে কি না, সে দিকেও নজর রয়েছে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের। এই জল্পনায় ইন্ধন জুগিয়েছে এ দিনের ঘটনাপরম্পরাও।
‘ইন্ডিয়া’র বৈঠকে যোগদানের উদ্দেশ্যে শনিবারই দিল্লি পৌঁছেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এ দিন দিল্লি গিয়েছেন তৃণমূলনেত্রী। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ, গত ১৫ বছরে শুধু মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নন, তার আগে ২০০৪–এ মমতা যখন সাধারণ সাংসদ হিসেবেও দিল্লি গিয়েছেন, তখনকার তুলনায় তাঁর এ দিনের বডি ল্যাঙ্গোয়েজ সম্পূর্ণ ভিন্ন। কলকাতা থেকে দিল্লি আসার আগে বিমানবন্দরে অথবা রাজধানীতে পৌঁছেও সাংবাদিকদের মুখোমুখি হননি তৃণমূলনেত্রী।
এ দিন তাঁর সঙ্গে দিল্লিতে আসেন তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ দোলা সেন। দিল্লিতে নেমেই মমতা চলে যান সাউথ অ্যাভিনিউয়ের বাসভবনে। অন্য সময়ে তৃণমূলনেত্রী ও দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক দিল্লিতে থাকলে তাঁদের ঘিরে যেমন ভিড় থাকে দলীয় সাংসদদের, এ বার সেই ছবি ছিল অধরা। মমতার সঙ্গে এ দিন সাউথ অ্যাভিনিউয়ে দেখা করতে যান লোকসভার দুই সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও কীর্তি আজ়াদ। ছিলেন অভিষেক ও রাজ্যসভায় জোড়াফুলের দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন। ফলে দৃশ্যতই রাজধানীতে তৃণমূলনেত্রী এ দিন যেন অনেকটা নিঃসঙ্গ।
তা হলে তৃণমূলের বেশিরভাগ সাংসদ এখন কোথায়?
সূত্রের দাবি, দিল্লির একটি পাঁচতারা হোটেলে শনিবার রাতে একজোট হয়েছিলেন তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর বেশ কয়েকজন সাংসদ। গত এক সপ্তাহে দিল্লিতে থাকা সাংসদরা কে কোথায় আছেন, তা জানতে মমতা–ঘনিষ্ঠ জোড়াফুলের কয়েকজন শীর্ষনেতা ফোন করে খোঁজ নিচ্ছিলেন কলকাতা থেকে। এমনকী কয়েকজনের অবস্থান জানতে তাঁরা ভিডিয়ো কলও করেছেন বলে সূত্রের দাবি। এ দিন তেমন বেশ কয়েকজন সাংসদের মোবাইল হয় সুইচড অফ ছিল অথবা ফোন–মেসেজ করলেও তা নিরুত্তর থেকে গিয়েছে।
সূত্রের খবর, রবিবার তৃণমূলনেত্রীর দিল্লিতে পা রাখার আগে এই বিদ্রোহী সাংসদদের অনেকে পাঁচতারা হোটেল ছেড়ে দিল্লির উপকণ্ঠে একটি ফার্ম হাউসে উঠেছেন। এ দিনই আবার কলকাতা থেকে কয়েকজন তৃণমূল সাংসদ আলাদা ভাবে দিল্লিতে পৌঁছন। তবে দিল্লি বিমানবন্দরে নামার পরে তাঁরা কেউ নিজেদের গাড়ি ব্যবহার করেননি, নিজেদের বাসভবনেও ওঠেননি।
ওই ফার্ম হাউসেই অন্য বিক্ষুব্ধ সাংসদদের সঙ্গে তাঁরা এ দিন রাতে একপ্রস্ত বৈঠক করেছেন বলে খবর। এই আবহে দিল্লিতে খোদ তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতিতেই জোড়াফুলে সরকারি ভাবে ভাঙন ধরে যায় কি না, সেই সম্ভাবনা জোরালো হয়ে উঠছে। তাৎপর্যপূর্ণ হলো, ‘আয়ুষ্মান ভারত প্রধানমন্ত্রী জন অরোগ্য যোজনা’য় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আনুষ্ঠানিক যোগদান উপলক্ষে আজ, সোমবার দিল্লিতেই থাকার কথা বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীরও। আবার আজই ‘ইন্ডিয়া’ শিবিরের বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে দিল্লিতে। তার আগে সব মিলিয়ে যেন চূড়ান্ত নাটকের মঞ্চ তৈরি রবিবাসরীয় রাজধানীতে।
এ দিন দিল্লি পৌঁছনোর আগে কলকাতায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রবীণ তৃণমূল সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়ের একটি বক্তব্যকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাঁর ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, ‘ভাঙন যখন শুরু হয়, তখন সেটা সর্বগ্রাসী হয়৷ আগুন যখন লাগে, তখন সেই আগুন সর্বগ্রাসী হয়৷ সুতরাং ভাঙন টের পাওয়ার আগে সেতু বাঁধতে হয়৷ বোল্ডার ফেলতে হয়৷ আগুন লাগার আগে প্রতিষেধক ব্যবস্থা নিতে হয়৷ যারা পারে না, তারা পুড়ে মরে, বা ডুবে মরে৷’ আগুন কোথায় লেগেছে, স্পষ্ট করেননি বর্ষীয়ান রাজনীতিক। তবে তাঁর মন্তব্য তৃণমূলের ভাঙনের আবহে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলে মনে করছেন অনেকেই।
জোড়াফুলে ভাঙন প্রসঙ্গে ২৪ ঘণ্টা আগেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি মন্তব্য করেছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। বিজেপির তৃণমূলীকরণের ‘দরজা বন্ধ’ বলেও শমীকের বক্তব্য ছিল, ‘তৃণমূল ভাঙার ছিল, তাই ভাঙছে। এবড়ো–খেবড়ো ভাবে ভাঙছে। ভাঙার একটা বিজ্ঞান আছে, ভাঙা শিখতে হয়, অপরূপ ভাবে ভাঙা, গড়ার থেকেও যা মূল্যবান কখনও কখনও।’
তা হলে অভ্যন্তরীণ ঘূর্ণিঝড়েই ভেঙে ছারখার হবে জোড়াফুল? এ দিন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের ইঙ্গিতপূর্ণ জবাব, ‘দিল্লিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লাড্ডু আর জুটবে বলে মনে হয় না৷ তৃণমূল কংগ্রেস আদর্শের উপরে ভিত্তি করে তৈরি হয়নি৷ তৃণমূলনেত্রীর বানানো দুর্গ আসতে আসতে ধসে পড়ছে৷ তৃণমূল বিধায়কদের মন খারাপ হয়েছে বলেই তাঁরা আলাদা দল তৈরি করেছেন৷ বিধায়কদের মন খারাপ হলে সাংসদদেরও মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক৷’
বিজেপি নেতৃত্ব এই পরিস্থিতিতে কী করছেন? সুকান্তর কথায়, ‘এই মুহূর্তে আমি আমার রেডার বা সিগন্যাল টাওয়ার অফ রেখেছি৷ কারও সিগন্যালই আমি এই মুহূর্তে নিচ্ছি না৷ সামনেই সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন৷ অনেক কিছুই হতে পারে৷ অপেক্ষা করুন৷’ এ দিন দিল্লিতে তৃণমূলনেত্রীর সঙ্গে দেখা করে কীর্তি আজ়াদ যা বলেছেন, তাতেও যেন আসন্ন ভাঙনের ইঙ্গিত স্পষ্ট। তিনি এ দিন বলেন, ‘যারা বিশ্বাসঘাতক, তারা গদ্দারি করবেই৷ যে গদ্দাররা যেতে চাইছে যাক, তাদের নিয়ে কথা বলতে চাই না৷ আমি দিদির সঙ্গেই আছি৷’
ঝড়ের ইঙ্গিত মিলেছে কলকাতায় ছোট লালবাড়ির তৃণমূল কাউন্সিলারদের নিয়ে বৈঠক বানচাল হয়ে যাওয়ার মধ্যেও। খোদ তৃণমূলনেত্রীই কলকাতা পুরসভার দলীয় কাউন্সিলারদের নিয়ে বৈঠক ডেকেছিলেন এ দিন কালীঘাটে। তার জন্য শনিবার রাতেই পুরসভার চেয়ারপার্সন মালা রায় কাউন্সিলারদের ফোন করেছিলেন। তবে এ দিন অধিকাংশ কাউন্সিলারই বৈঠকে হাজির থাকবেন না বলে জানিয়ে দেন বলে সূত্রের দাবি। যেমন— কাউন্সিলার দেবলীনা বিশ্বাস সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, ‘মালা রায় শনিবার আমাকে ফোন করেছিলেন। তৃণমূল ভবনে রবিবার বিকেল ৪টেয় মিটিং হবে, সেখানে যাওয়ার জন্য বলেছিলেন। আমি শুনেছি, কিন্তু কোনও উত্তর দিইনি। আমি মানসিক ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তৃণমূলের কোনও মিটিংয়ে যাব না।’
যদিও জোড়াফুলের সব কাউন্সিলার এই বৈঠকের আমন্ত্রণ পাননি বলেই সূত্রের খবর। পোড়খাওয়া কাউন্সিলার তারক সিং দিন কয়েক আগেই সরাসরি বিদ্রোহ করে মেয়র পারিষদের পদ ছাড়েন। রবিবার তিনি বলেন, ‘আমাকে কেউ ডাকেনি। আমাকে ডাকবে কেন? আমি তো ওঁর (মমতা) নেতৃত্ব মানি না। আমি এই নেতৃত্বের পরিবর্তন চাই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মালা রায়কে দিয়ে এই বৈঠক ডেকেছিলেন বলে শুনেছি।’
তৃণমূল সূত্রের খবর, শনিবার বিকেলের পর থেকেই মালা রায় এই বৈঠকের কথা জানিয়ে ফোন করা শুরু করেছিলেন। কলকাতা পুরসভায় গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে ইস্তফা দেওয়া এক কাউন্সিলারের কথায়, ‘মালা রায়ের সঙ্গে যেহেতু কাউন্সিলারদের সম্পর্ক ভালো, সেই কারণে ওঁকে দিয়ে ফোন করানো হয়েছিল। মালাদি ফোন করেছেন দেখেই অনেকে ফোন ধরেছিলেন। তবু যদি শেষ পর্যন্ত মিটিং হতো, তা হলে ৩০–৪০ জন কাউন্সিলার যেতেন কি না সন্দেহ।’ বৈঠক কেন বাতিল হলো, তা নিয়ে মালার কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
মমতা দিল্লি যাওয়ার পথে কলকাতা বিমানবন্দরে এ নিয়ে কোনও মন্তব্য করেননি। কলকাতা পুরসভায় এখন জোড়াফুলের ১৩৪ জন কাউন্সিলার রয়েছেন। কিন্তু গত সপ্তাহে ওয়াই চ্যানেলে মমতার ধর্নায় এঁদের বড় অংশই গরহাজির ছিলেন। তারক সিং, দেবলীনা বিশ্বাস, অরূপ চক্রবর্তী, সুশান্ত ঘোষের মতো একদল কাউন্সিলার বেসুরো হয়েছেন ইতিমধ্যেই। এরইমধ্যে কলকাতার মেয়র পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন ফিরহাদ হাকিম। তাঁর অনুপস্থিতিতে নতুন মেয়রের নাম চূড়ান্ত করার জন্যই কালীঘাটে বৈঠক ডাকা হয়েছিল বলে কাউন্সিলারদের অনেকে মনে করছেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্সিলার গরহাজির হবেন আঁচ করে তড়িঘড়ি বৈঠক বাতিল করা হয়েছে বলে সূত্রের খবর।
শুধু পুরসভায় মুখ বদল নয়, ক’দিন আগে দলের সাংগঠনিক যে রদবদল করেছেন মমতা–অভিষেকরা, তাতে যে সাংসদদের একাংশও ক্ষুব্ধ, তা এ দিন স্পষ্ট সুখেন্দুশেখরের কথায়। দলের সদ্য ঘোষিত কার্যসমিতি নিয়ে রবিবার বর্ষীয়ান সাংসদের কটাক্ষ, ‘আমাদের দলে তো এখন সবাই ন্যাশনাল লিডার৷ আমি তো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র৷ আমি তো নেশনের সংজ্ঞাটাই ভুলে যাচ্ছি৷ নেশন মানে কী, আর ন্যাশনাল মানে কী! চারদিকে এখন সব ন্যাশনাল লিডার দেখতে পাচ্ছি!’
এই অবস্থায় ন্যাশনাল ক্যাপিটালে নাটকের যবনিকা পতন আজ–কালের মধ্যেই হয় কি না, সেটাই এখন দেখার।