পরিবর্তনের পথে বোলপুর, রোড ট্রিপে শান্তিনিকেতন - 24 Ghanta Bangla News
Home

পরিবর্তনের পথে বোলপুর, রোড ট্রিপে শান্তিনিকেতন

Spread the love

পার্থময় চট্টোপাধ্যায়

আজ চলেছি বর্ধমান। একজনের ডাকে, সঙ্গে কিছু প্রয়োজনীয় কাজও রয়েছে। রাস্তা মোটামুটি জানা থাকলেও পুরোটা আর চেনা নেই। কারণ প্রতিদিনই জাতীয় সড়ক ১৯-এর চেহারা বদলাচ্ছে। কোথাও নতুন ফ্লাইওভার খুলছে, কোথাও নতুন সংযোগপথ তৈরি হচ্ছে, আবার কোথাও রাস্তার গতিপথই পাল্টে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে উন্নয়নের এক চলমান ছবি।

সকাল সাতটায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে ঠিক ন’টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম আমার বহুদিনের পরিচিত হিন্দুস্থান ধাবায়। এই ধাবার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক স্মৃতি। একসময় এখানে খাটিয়ায় বসে খাওয়াদাওয়া করেছি। তখন ২ নম্বর জাতীয় সড়কের নাম ছিল দিল্লি রোড বা জি টি রোড। কলকাতা থেকে গুড়াপের এই ধাবায় পৌঁছতে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় লেগে যেত। রাস্তা ছিল সরু, বেহাল এবং যানজটে ভরা।

আজ সেই ছবিটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। স্বর্ণ চতুর্ভুজ প্রকল্পের পর শুধু বাংলায় নয়, গোটা দেশের জাতীয় সড়কগুলির ধারে অসংখ্য ধাবা গড়ে উঠেছে। তবে এখনকার ধাবাগুলি শুধু নামেই ধাবা। খাবার, পরিষেবা, সাজসজ্জা—সবই আধুনিক রেস্তোরাঁর সমতুল্য। পাপ্পু ধাবা, বাল্লে বাল্লে ধাবা, হিন্দুস্থান ধাবা, আজাদ হিন্দ ধাবা কিংবা বচ্চন ধাবা—সবই এখন পথচলতি মানুষের কাছে এক একটি জনপ্রিয় গন্তব্য।

ব্রেকফাস্ট সেরে আবার পথ ধরলাম। সাড়ে দশটার মধ্যে বর্ধমান পৌঁছে গেলাম। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই কাজ মিটে গেল। তারপর গন্তব্য বোলপুর।

গত রাতে বর্ধমান থেকে ফোন আসার পরই ছেলে ঠিক করে ফেলেছিল, সেও যাবে। পরিকল্পনা হলো—বর্ধমানের কাজ শেষ করে সবাই মিলে একরাত বোলপুরে কাটানো হবে। বোলপুর-শান্তিনিকেতন যাওয়ার সুযোগ আমি সহজে হাতছাড়া করি না। তাই বাড়ি থেকে বড় গাড়ি নিয়েই বেরিয়েছিলাম, সঙ্গে একদিনের প্রয়োজনীয় লাগেজ।

উষ্ণায়নের দাপট এখন সারা দেশ জুড়ে। কলকাতা বা বোলপুর তার বাইরে থাকবে কেন?

তবে বোলপুর আমার কাছে নিছক একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়। এটি আমার অনুভূতির জায়গা, মুক্তির জায়গা, মন ও শরীরকে নতুন করে সতেজ করে তোলার জায়গা। শেষবার এসেছিলাম ফেব্রুয়ারিতে। নীল-সাদা আকাশের নিচে শীতের বোলপুর দেখেছিলাম। অনুভব করেছিলাম ফাগুনের আগমনী বার্তা, প্রকৃতির গায়ে গেরুয়া রঙের ছোঁয়া।

road trip to bolpur santiniketan

আমি বোলপুরকে দেখেছি লাল মাটির পথে, দেখেছি শরতের নীল আকাশের তলে, আর আজ দেখছি গেরুয়া ধুলোর আবরণে ঢাকা এক গ্রীষ্মের বোলপুরকে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেমন দেশ বদলাচ্ছে, তেমনই বদলাচ্ছে বোলপুরও। মাত্র চার মাসের ব্যবধানে অনেক কিছুই যেন নতুন মনে হচ্ছে।

শহরে ঢোকার মুখে যে টোল দিতে হতো, সেই টোলগুমটি আর নেই। খোয়াইয়ের পথে যেতে যেতে চোখে পড়ল না পার্কিং ফি আদায় করা সেই চেনা মুখগুলোকে। এখন যেখানে জায়গা পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই গাড়ি রাখা যাচ্ছে। আগের মতো নির্দিষ্ট মাঠে গাড়ি রাখার বাধ্যবাধকতা আর নেই।

আরও ভালো লাগল দেখে যে সোনাঝুরির বাগানে এখন আর গাড়ি ঢুকতে দেওয়া হয় না। শনিবার মানেই সোনাঝুরি হাটের ব্যস্ততা। একসময় ব্যবসায়ীরা যত্রতত্র গাড়ি ঢুকিয়ে মালপত্র নামাতেন। এখন সেই ব্যবস্থা বন্ধ হয়েছে। রাস্তার ধারে গাড়ি রেখে মাল ওঠানামা করতে হচ্ছে। ফলে আকাশমণি গাছগুলো অন্তত গাড়ির চাকার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে না।

তবু কোথায় যেন একটা প্রাণহীনতার ছাপ রয়ে গেছে।

কঙ্কালীতলায় আজ ভিড় তুলনামূলক কম। হয়তো প্রচণ্ড গরমের জন্য। সাধারণত শনিবারে এখানে অনেক বেশি মানুষের সমাগম হয়। মন্দির চত্বর যথেষ্ট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। তবে আগের সেই উৎসবমুখর পরিবেশ যেন কিছুটা ম্লান। হয়তো প্রকৃতির এই কঠিন সময় মানুষের পদচারণাও কমিয়ে দিয়েছে।

সৃজন গ্রামের বাইরে কিছুটা ভিড় চোখে পড়ল। বিশ্বভারতীর গেটের কাছে কয়েকজন দাঁড়িয়ে ভিতরে উঁকি মারছেন। আজও সাধারণ মানুষের জন্য বাঙালির প্রাণের প্রতিষ্ঠান অনেকটাই দূরবর্তী। অথচ এই প্রতিষ্ঠানকেই কেন্দ্র করে বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ শান্তিনিকেতনে ছুটে আসেন।

কোপাই নদীর ধারে নতুন হাট বসেছে। শীতকালে সেখানে কিছুটা ভিড় হয়, কিন্তু এই গরমে যেন সেও একা বসে নদীর ঢেউ গুনছে।

সায়রবিথীর নৌকাগুলো যাত্রীহীন অবস্থায় ধীরে ধীরে দুলছে। একটু দূরে ভিস্ব বাংলা হাটও যেন নিদ্রামগ্ন। ভিড় নেই, কোলাহল নেই, কিন্তু সৌন্দর্য এখনো অমলিন।

গোয়ালপাড়ার একটি হোটেলে রাত কাটিয়ে আজ আবার ফিরব ব্যস্ত কলকাতায়।

সকালটা অপূর্ব। মেঘলা আকাশ, তার সঙ্গে শীতল বাতাস। সোনাঝুরির শান্ত পরিবেশে কোথাও লুকিয়ে বসে একটি কোকিল ডাকছে। বাবুই পাখির বাসা দুলছে হাওয়ায়। দূরে শঙ্খচিলের ডাক ভেসে আসছে।

আর কোথাও একজন বাউল গাইছে—

“তোমায় হৃদমাঝারে রাখব, ছেড়ে দেব না…”

এই সবকিছু পেছনে ফেলে এবার ফিরতে হবে ঘরে।

গাড়ি এগিয়ে চলেছে ইলামবাজারের দিকে। তারপর পানাগড়, দার্জিলিং মোড় পেরিয়ে আবার সেই চিরচেনা কলকাতা।

পেছনে পড়ে থাকবে বোলপুর।

তবু বোলপুর কি কখনও সত্যিই পিছনে পড়ে থাকে?

সে তো থেকে যায় মনের মধ্যে—লাল মাটির ধুলো হয়ে, কোকিলের ডাক হয়ে, কিংবা কোনো এক বাউলের অসমাপ্ত গানের সুর হয়ে।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *