‘আমার অনেক পার্টনার…’, মিলিন্দ সোমানের সঙ্গে বিচ্ছেদ নিয়ে অকপট সাহানা গোস্বামী
সম্পর্কের ছকটা যুগ যুগ ধরে প্রায় একই রকম— দু’জন মানুষের দেখা হওয়া, প্রেম, তার পর একে অপরের প্রতি একনিষ্ঠ থেকে সংসার গড়ে তোলা। কিন্তু একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে সম্পর্কের এই একমাত্রিক ধারণা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন ওঠে। একনিষ্ঠতাই কি সমাজের চোখে ভালো সম্পর্কের একমাত্র চাবিকাঠি? সম্প্রতি বলিউড অভিনেত্রী সাহানা গোস্বামীর একটি সাক্ষাৎকার নতুন করে এই বিষয়টি উস্কে দিয়েছে। সেখানে অভিনেত্রী নিজের ‘ওপেন রিলেশনশিপ’ বা উম্মুক্ত সম্পর্ক নিয়ে খোলামেলা ভাবে আলোচনা করেছেন।
মডেল-অভিনেতা মিলিন্দ সোমানের প্রাক্তন প্রেমিকা সাহানা প্রথাগত সম্পর্ক বা মোনোগ্যামাস সম্পর্কের বাইরে গিয়ে নিজের জীবনযাপনের কথা তুলে ধরেছেন। কোনও একজন নির্দিষ্ট ‘প্রাইমারি পার্টনার’ খোঁজার বদলে, তিনি তাঁর জীবনের একাধিক গভীর সম্পর্কের কথা স্বীকার করেছেন। তবে এখানে সবচেয়ে বড় এবং শিক্ষামূলক বিষয় হলো, এই সম্পর্কের বৃত্তে থাকা প্রতিটি মানুষই কিন্তু একে অপরের অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। অভিনেত্রীর কথায়, ‘এই মুহূর্তে আমার জীবনে এমন কোনও একজন নির্দিষ্ট সঙ্গী নেই। বরং আমার জীবনে এমন অনেকেই আছেন যাঁদের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। আমার কাছে কোনও সম্পর্কই তুচ্ছ নয়।’ সাহানার এই মন্তব্য নেটদুনিয়ায় ‘এথিক্যাল নন-মোনোগ্যামি’ (Ethical Non-Monogamy) বা ‘সম্মতিসূচক বহুগামিতা’ শব্দবন্ধটিকে আবার চর্চায় নিয়ে এসেছে।
বহুগামিতা আর সম্মতিসূচক বহুগামিতা, তফাৎটা কোথায়?
বেশির ভাগ মানুষের ধারণা, ওপেন রিলেশনশিপ মানেই এক ধরণের ‘চিটিং’ বা প্রতারণা। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, আসলে বিষয়টা উল্টো। এথিক্যাল নন-মোনোগ্যামির মূল ভিত্তিটাই হলো চূড়ান্ত সততা এবং স্বচ্ছতা। যেখানে পরকীয়া বা প্রতারণায় থাকে চরম গোপনীয়তা ও মিথ্যে, সেখানে এই জীবনযাত্রায় জড়িয়ে থাকা প্রতিটি মানুষের পারস্পরিক সম্মতি এবং স্পষ্ট ধারণা থাকে।
সাহানা এই সততার দিকটিতেই বারবার জোর দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁর জীবনে কোনও ‘লুকোছাপা’ নেই। এই ধরণের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে গেলে যথেষ্ট উদার এবং প্রাপ্তমনস্ক হওয়া প্রয়োজন। একে অপরের সঙ্গে মন খুলে কথা বলার অভ্যাসের প্রয়োজন হয়। সম্পর্ক থেকে হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়া বা ‘গোস্টিং’ করার বিষয়টিকে সম্পূর্ণ খারিজ করে দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি লোকেদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বা উধাও হয়ে যাই না।’
মনোবিদরা বলছেন, ‘এথিক্যাল নন-মোনোগ্যামি’ হলো অনেকটা ছাতার মতো। এই বিষয়টার মধ্যে আবার অনেকগুলি সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম পর্যায় (যেমন: ওপেন রিলেশনশিপ, পলিআমরি, রিলেশনশিপ অ্যানার্কি) রয়েছে। ধরন আলাদা হলেও এদের মূল ভিত্তি কিন্তু এক— আন্তরিকতা, নিজেদের মধ্যে তৈরি করা স্পষ্ট সীমারেখা বা বাউন্ডারি, এবং উল্টোদিকের মানুষটার স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা।
বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে এই মানসিকতা ক্রমশ বাড়ছে। বিয়ে, প্রেম বা লিভ-ইন সম্পর্কের চেনা সামাজিক প্রত্যাশাগুলোকে ছাপিয়ে তাঁরা নিজেদের মতো করে ভালো থাকার রসদ খুঁজছেন। ডেটিং অ্যাপের রমরমা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মুক্ত হাওয়া এই আলোচনাকে সাধারণ মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুম পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে। তবে এই নতুন ধারণাকে সমাজ কতটা মেনে নিতে পারছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়। সমালোচকদের মতে, মানুষের সহজাত ঈর্ষা, নিরাপত্তাহীনতা এবং মানসিক জটিলতার কারণে এই ধরণের বহুমাত্রিক সম্পর্ক দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। অন্যদিকে, এই জীবনযাত্রায় বিশ্বাসীরা মনে করেন, ঈর্ষা বা নিরাপত্তাহীনতা তো একগামী (monogamous) সম্পর্কেও থাকে। আসল বিষয়টি হলো পার্টনারদের মধ্যে বোঝাপড়া কতটা মজবুত।
সাহানা গোস্বামীর এই গোটা দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে একটাই শব্দ— ‘স্বাধীনতা’। তাঁর কথায়, ‘আমি সবসময় বিশ্বাস করি ভালোবাসার কোনও বাঁধন থাকা উচিত নয়।’ সাহানার এই অকপট স্বীকারোক্তি হয়তো রাতারাতি সমাজের মানসিকতা বদলে দেবে না, কিন্তু এ কথা অনস্বীকার্য যে ভালোবাসা, দায়বদ্ধতা এবং পার্টনারশিপের সংজ্ঞাটা এখন আর একটি নির্দিষ্ট ফ্রেমে আটকে নেই। যুগ পাল্টাচ্ছে, আর তার সঙ্গে পাল্টে যাচ্ছে সম্পর্কের চেনা ব্যাকরণও।