অন্তরের বসবাস
আহ্! বারান্দায় রেলিং-এ ডান দিকে বুকে খোঁচা খেলো পারমিতা। সরু গুণার তার দিয়ে টবগুলোকে ব্যালেন্সে রাখার জন্য পারমিতাই শক্ত করে বেঁধেছিল। বুকে আলতো করে হাত দিল সুধা। হ্যাঁ— ব্যথা করছে। কেমন নরম তুলতুলে হয়ে গেছে, না? কোনও শক্তি নেই। অলস। দায়সারা। ঘামে ভিজে গেছে পারমিতার ব্লাউজ। বারান্দার বসার চেয়ারে হেলান দিল সুধা। একটা দীর্ঘশ্বাস। ফিঙে পাখিটা এখনও পোকামাকড়ের সন্ধানে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। পারমিতা মনে করার চেষ্টা করে শেষ কবে গৌতম তার শরীর স্পর্শ করেছিল। গৌতম নিশ্চয়ই টের পায়, তেজহীন অনুন্নত এক মাংসপিন্ডের। তাই হয়তো আজকাল গৌতম শরীর থেকে অনেক দূরে বসবাস করে। আলাদা করে যে শরীরের খিদে আছে, সেই ভাবনাটাই তো হাপিস হয়ে গেছে। আচ্ছা, এই ফিঙে পাখির বয়স কত? মানে, সেই কতক্ষণ ধরে খাবার খেয়েই যাচ্ছে। ও কি পুরুষ ফিঙে? খাওয়া-দাওয়া সেরে একটা ফুরফুরে মেজাজে ফিরে যাবে হয়তো। বাসায় সঙ্গিনীর পাশে বসে খানিক কথাবার্তা বলবে। সারাদিনের উড়ে বেড়ানো, ঘুরে বেড়ানো। সারাদিনে কত ধরনের পোকা কীটপতঙ্গ সে দখল করতে পেরেছে অথবা পারেনি। এইসব গল্পগুজব করতে করতে কি তারা আদর করবে পরস্পরকে? সেই সঙ্গিনী ফিঙের বয়স কত! পাখিদের কোথায় কোথায় শারীরিক বা মানসিক আকর্ষণ থাকে অথবা কম হতে থাকে! নিজের ভাবনায় নিজেই মুচকি হেসে নিল পারমিতা।
উল্টো দিকের ঘরের আলো বন্ধ হলো। বোধহয় খাওয়া-দাওয়ার পর্ব চলছে। আজ হাঁসের ডিমের কষা করেছে পারমিতা। সঙ্গে পাতলা মুসুর ডাল আর ভাত। এত তাড়াতাড়ি খায় না গৌতম। ফলে আর কিছুক্ষণ পর রান্নাঘরে গেলেও চলবে।
চোখ বন্ধ করে বসে আছে পারমিতা। মেয়ে টুকটুকির ফোনে সম্বিত ফিরল। কিছু কথা আদান-প্রদানের পর পারমিতা টুকটুকিকে বলে বসলো, ‘হ্যাঁ রে, এখন তোর ব্রা-র সাইজ কত?’ কথাটা বলে পারমিতা নিজেই বিব্রত হয়ে সঙ্গে সঙ্গে কেটে দিল ফোন। টুকটুকি তৎক্ষণাৎ আবার ফোন করল। না, পারমিতা ফোন ধরেনি। যদিও মা এবং মেয়েদের মধ্যে এমন সব বিষয়ে কথাবার্তা হয়। টুকটুকির সঙ্গে পারমিতার যে কখনও এইসব নিয়ে কথা হয়নি, তাও নয়। কিন্তু এখন এই মুহূর্তে এই সময় এতদিন পর এমন প্রসঙ্গ পারমিতাকে একইসঙ্গে কষ্ট দিলো এবং লজ্জায় ফেললো। মোবাইল সুইচ অফ করে দিলো পারমিতা। মৃদুমন্দ হাওয়া একটু জোরালো হচ্ছে। রাতের দিকে খানিক ঝড়বৃষ্টি হলেও হতে পারে। বিদ্যুৎ না চমকালেও আকাশে মেঘের জড়াজড়ি বেশ দেখা যাচ্ছে। উল্টো দিকের দোতলা বাড়ির আলো আবার জ্বলে উঠলো। না, কোনও ভাবেই পারমিতা আর সেদিকে দেখবে না। বসার জায়গা খানিকটা পরিবর্তন করে নিল পারমিতা। এবার গলি রাস্তার বাঁ দিক।