চার্জ গঠন করেও চিকিৎসককে নির্দোষ ঘোষণা করল কাউন্সিল, তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন
এই সময়: অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে এক চিকিৎসককে নির্দোষ বলে ঘোষণা করল পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিল। মাস আড়াই আগে যে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় গাফিলতির দায়ে মেডিক্যাল কাউন্সিল চার্জ গঠন করেছিল, শেষমেশ তারা নিজেরাই অভিযোগ খারিজ করে সেই চিকিৎসককে নির্দোষ বলে ঘোষণা করল। অ্যাপেন্ডিসাইটিসে আক্রান্ত এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হওয়া বহুচর্চিত একটি মামলার এই সিদ্ধান্ত ঘিরে নতুন করে চিকিৎসায় গাফিলতি সংক্রান্ত তদন্ত ও কাউন্সিলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
মেডিক্যাল কাউন্সিল সূত্রে জানা গিয়েছে, বিশিষ্ট গ্যাস্ট্রো–সার্জেন সরফরাজ় বেগের বিরুদ্ধে আনা চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ মেলেনি। ফলে, তাঁর বিরুদ্ধে পেশাগত অসদাচরণ বা প্রফেশনাল মিসকনডাক্টের অভিযোগও ধোপে টেকেনি বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছয় মেডিক্যাল কাউন্সিল। তাদের এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় গত বুধবার, ২০ মে। এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে চিকিৎসক মহলে স্বস্তির সুর শোনা গেলেও রোগীস্বার্থ অধিকার কর্মীদের একাংশের বক্তব্য, প্রাথমিক ভাবে গাফিলতির ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও পরে কেন অভিযোগ খারিজ হলো, সেই বিষয়ে সবিস্তার ব্যাখ্যা সামনে আসা দরকার।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪–এর ফেব্রুয়ারিতে। ক্যামাক স্ট্রিটের ৪২ বছর বয়সি আমন চোপড়া পেটে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে ভর্তি হন মিন্টো পার্ক লাগোয়া একটি বেসরকারি হাসপাতালে। প্রাথমিক পরীক্ষার পরে তাঁর অ্যাপেন্ডিসাইটিস ধরা পড়ে। চিকিৎসক সরফরাজ় দ্রুত অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন। নির্বিঘ্নে অস্ত্রোপচারও হয়। কিন্তু তার পরে পরিবারের তরফে অভিযোগ তোলা হয় যে, অস্ত্রোপচারের ফলে রোগীর শারীরিক অবস্থার উন্নতি না–হয়ে বরং খারাপ হতে থাকে। পরে একই হাসপাতালে দ্বিতীয় বার অস্ত্রোপচারও করতে হয়। তাতেও অবস্থার উন্নতি না–হওয়ায় তাঁকে এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সে করে হায়দরাবাদের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।
আমনের মৃত্যুর পরে তাঁর স্ত্রী সিমরন চোপড়া পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিলে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ দায়ের করেন চিকিৎসক সরফরাজ়ের বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়েছিল, চিকিৎসা পদ্ধতি ও অস্ত্রোপচার-পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় নিশ্চিত ভাবে ত্রুটি ছিল। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্ত শুরু করে মেডিক্যাল কাউন্সিল। প্রাথমিক অনুসন্ধানের পরে, এ বছরের ৩ এপ্রিল কাউন্সিল চার্জ গঠন করে ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। সেই সময়ে ঘটনাটি চিকিৎসক মহলে যথেষ্ট আলোড়নও ফেলেছিল। তার পরে, ৭ মে অভিযোগকারিণী ও অভিযুক্ত চিকিৎসক— দু’পক্ষকেই কাউন্সিলের শুনানিতে ডাকা হয়। শুনানির সময়ে চিকিৎসক তাঁর বিরুদ্ধে আনা প্রতিটি অভিযোগের পাল্টা ব্যাখ্যা দেন বলে জানা গিয়েছে।
তার পরে সকল নথি, চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য ও ব্যাখ্যা–পর্যালোচনার পরে কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত— অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট ভিত্তি নেই। রায় ঘোষণার পরে চিকিৎসক মহলের একাংশের বক্তব্য, কোনও রোগীর জটিলতা বা মৃত্যু ঘটলেই সেটা চিকিৎসায় গাফিলতির পরিণাম নয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানে অস্ত্রোপচার-পরবর্তী নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে কারণ বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, চিকিৎসারও বিভিন্ন বাস্তব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ওই ঘটনায় কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে অভিযোগকারী পরিবার কিংবা অভিযুক্ত চিকিৎসকের তরফে কোনও প্রতিক্রিয়া এখনও পর্যন্ত সামনে আসেনি।